হলুদ টিনটা দেখতে পেল ও। একটা তাকের ওপর রাখা আছে। হাত বাড়িয়ে টিনটা নিল মাহির। তারপর নাড়াল। কিন্তু শব্দ হল না কোনও। কী হল? বিস্কুট নেই? মাহির টিনটা খুলে ভেতরে হাত ঢোকাল। আঙুলের ডগায় বিস্কুটের গুঁড়ো লাগল। কিন্তু বিস্কুট নেই!
টিনের কৌটোটা বন্ধ করে আবার জায়গায় রেখে দিল ও। তারপর এদিক-ওদিক দেখল। নাঃ, কিছু নেই! অন্য সময় একটু মুড়ি থাকে, আজ সেটাও পেল না।
খিদে পেলে পাগল-পাগল লাগে মাহিরের। এখনও লাগছে। যেহেতু দুপুরে ঠিকমতো খায়নি, এখন যেন তাই দ্বিগুণ খিদে পেয়েছে।
রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে আবার ঘরে ফিরে এল মাহির। দেওয়ালে ঝোলানো কিটব্যাগটা নামাল। তারপর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা প্লাস্টিক বের করে আনল। এখানে সামান্য একটু টাকা ও সরিয়ে রাখে। মা এটাতে হাত দেয় না।
মাসের শেষ, বাড়িতে বিশেষ টাকাপয়সা নেই এখন। যা ছিল মা নিয়ে গেছে। টেবিলের ওপরে রাখা ওর মানিব্যাগে কিছু খুচরো পড়ে আছে।
কিটব্যাগের ভেতরে হাত দিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটটা বের করে আনল মাহির। হাতে তোয়ালে মোড়া পিস্তল ঠেকল। শরীরটা কেমন যেন করে উঠল! এটার কথা আজ ভুলেই গিয়েছিল। নাঃ, এটা আর রাখবে না। রিতুদার সঙ্গে যখন কাজ আর করবে না তখন এটা ফেরত দিয়ে দেবে। আর যাই হোক, গুন্ডা হবে না ও। দরকার হলে কুলিগিরি করে খাবে, কিন্তু ওই কাজ করতে পারবে না।
প্লাস্টিকের প্যাকেটে পাঁচশো টাকার মতো সরানো আছে। মা এটা জানে না। মাহির প্যাকেট থেকে একশো টাকা বের করল।
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েকটা পা গেলেই অশোকদার দোকান। রোল, চাউমিন, মাছের চপ বিকেল থেকেই বিক্রি হতে শুরু করে।
টাকাটা হাতে করে ভাবল মাহির। এক প্লেট এগ চাউ তিরিশ টাকা নেয়। সেটা কি খাওয়া ঠিক হবে? মায়ের আজ কত টাকা খরচ হবে কে জানে! হুট করে এখন খাবারের পেছনে এতটা টাকা খরচ করা ঠিক হবে না। কিন্তু পেটের মধ্যে একটা জ্যান্ত তিমি ঢুকে পড়েছে!
পাশে অবশ্য সতুয়ার দোকানও আছে। বিহারি ছেলে সতুয়া। সবাই ভুজিয়াওয়ালা বলে ওকে। ওর কাছ থেকে দশ টাকার মুড়িমাখা কিনে খেলেও হয়। যদিও মন চাইছে অশোকদার দোকানের রোল বা চাউ, কিন্তু ওই সেই ব্যাপার— যা ভাল লাগে, ইচ্ছে করে, তার সুদূরপ্রসারী ফল খারাপ হয়! পলির জিপিএস ওকে পথ দেখাচ্ছে আবার।
সতুয়ার দোকানেই যাবে ঠিক করল মাহির।
ও এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে ঘরের কোণে রাখা হাওয়াই চটিটা পরতে গেল। আর ঠিক তখনই পাল্লা ঠেলে ঘরে ঢুকে এল তুয়াদি।
এই সেরেছে! মাহির চোয়াল শক্ত করল। ও দ্রুত টাকাটা প্যান্টের পকেটে গুঁজে ফেলল। আর আসার সময় পেল না!
ও গম্ভীর হয়ে বলল, “মা নেই। ভাইকে নিয়ে গিয়েছে।”
“আমি জানি,” তুয়াদি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে পাল্লা দুটো ভেজিয়ে দিল।
কী বিপদ! আজ আবার! মাহিরের মুখটা তেতো হয়ে গেল নিমেষে। পেটের তিমিটাও যেন তুয়াদিকে দেখে ঝিমিয়ে পড়ল।
ও বলল, “আমার জ্বর তুয়াদি… আজ মানে…”
“শালা!” তুয়াদি নাইটির ওপরে চাপানো কার্ডিগানের হাতাটা গুটিয়ে এগিয়ে এল, “আমায় কী মনে হয় তোর! আমি সারাক্ষণ তোর সঙ্গে শোব বলে ঘুরি নাকি?”
ঘাবড়ে গেল মাহির, “না মানে… আমি তা বলিনি…”
তুয়াদি এগিয়ে এসে ভুরু কুঁচকে বলল, “তোকে আমার খুব ভাল লাগে। তাই সেক্স করতে চাই। না হলে সেক্স করার লোক কি আমার কম আছে! আমি তোর চেয়ে অনেক বড়। এটা বিদেশ হলে না হয় বিয়ে করতে বলতাম। কিন্তু এখানে তো আর তা হবে না। তাই… যাক গে!” তুয়াদি থামল। তারপর হাত বাড়িয়ে কপালটা ধরে দেখল। বলল, “বউদির কাছে শুনেছিলাম, তোর জ্বর। তাই এসেছি। জানি আজ ডায়ালিসিসের দিন। বুঝলি?”
মাহির দেখল তুয়াদিকে। এমন করে প্রেমের কথা বলল যেন দোকানে মাছ কিনতে গিয়েছে! ওর চোখে পড়ল তুয়াদির হাতটা। আঙুলগুলো খয়া-খয়া। হাতে অর্ধেক নেলপলিশ, গালে মেচেতা আসবে-আসবে করছে। নাইটির ওপর দিয়ে ভুঁড়ি বোঝা যাচ্ছে। দেখেই কেমন লাগল মাহিরের। ও কী করে এর সঙ্গে শোয়! নিজের অজান্তেই পলির পাশে তুয়াদিকে রেখে একটা তুলনা করে ফেলল মনে মনে! রেস্তরাঁয় পলির পাশ ঘেঁষে বসেছিল মাহির। কী সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিল! আর হাতের সঙ্গে হাতের ঘষা লাগছিল ওর। এমন লাগছিল মাহিরের, ভাল লাগার সঙ্গে যৌনতাও টের পাচ্ছিল ও! মনে হচ্ছিল, কোনওদিন কি ও পলিকে আদর করতে পারবে? তুয়াদি যখন জোর করে, যখন ওকে বিছানায় চেপে ধরে ওর ওপর বসে, মাহির চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে পলিকে কল্পনা করতে থাকে। না হলে ও জানে এই যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই রেহাই পাবে না!
“কী হল?” তুয়াদি তাকাল ওর দিকে, “এমন মুখ করছিস কেন?”
“কিছু না, আমি বেরোব,” মাহির ছোট কথায় কাজ সারতে চাইল।
তুয়াদি কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তোর কি আমাকে বেশ্যা মনে হয়! জানিস, আমি তোর সঙ্গে ছাড়া আর কারও সঙ্গে শুই না। আমায় দেখলেই অমন বিলা চোপা করে থাকিস কেন! শোন, তোকে আগে বলেছিলাম না, একটা ছোটখাটো সেলাইয়ের জায়গা দেখেছি আমি। কাজ আছে। জনাদশেক মেয়ের সঙ্গে কথাও বলেছি। আমি একা পারব না। তুই আমার সঙ্গে কাজ করতে পারিস। ফিফটি-ফিফটি পার্টনার। করবি?”
