মাহির এবার সুইচবোর্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে টিউবলাইটটা জ্বালাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশের নরম আলোর সুইচটা বন্ধ করে দিল। এই ডিমলাইটটা নতুন লাগিয়েছে ও। একটা জ্যোৎস্নার মতো আলো হয় জ্বালালে! ভাল লাগে মাহিরের।
মাঝে মাঝে জীবনকে বোঝে না মাহির। স্যার বলতেন, “বুঝবি, বাঁচতে-বাঁচতে শিখবি, শিখতে-শিখতে বুঝবি!” কিন্তু তাও বোঝে না মাহির। জীবনের মানে কী! এই পৃথিবীতে যা করতে ভাল লাগে মানুষের তা করা উচিত নয়! যেমন তেল-ঝালের খাবার খাওয়া, কাজ না করে আড্ডা দেওয়া, অবৈধভাবে কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। এই সব কিছুর মধ্যে যে একটা মজা আছে সেটা আসলে নিষিদ্ধ! কারণ, এতে নাকি পরে কষ্ট পেতে হবে। আর যা করতে ভাল লাগে না, যা করা কঠিন, যেমন পরিশ্রম, একাগ্রচিত্তে ফলের চিন্তা না করে কাজ করে যাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি, সেসব নাকি ভাল খুব! ভবিষ্যতে কোনও একদিন নাকি এর সুফল পাওয়া যাবে। এইসব ভাবলে আজকাল মাঝে মাঝে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যায় ওর। ঠিক ভুল সব গুলিয়ে যায়। কী করা উচিত সেটাও বুঝতে পারে না। আর তখনই পলির কথা ভাবে মাহির। পলি যেন ওর জীবনের মানেবই হয়ে গিয়েছে। পলির কথা ভাবলে ওর নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে যায়। ঠিক আর উচিতটা সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজের ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরটায় এল মাহির। মা যাওয়ার আগে বিছানা গুছিয়ে গিয়েছে। ভাই এসে শুয়ে পড়বে। এই দিনটায় শরীরের ওপর খুব ধকল যায়। ভাই জেগে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ।
ভাইয়ের বালিশটার দিকে তাকাল মাহির। কষ্ট হল দেখে। জড়পদার্থের মতো হয়ে গিয়েছে ভাই! ডাক্তাররা বলছেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার কিডনিটা রিপ্লেস করে দেওয়া দরকার। মায়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছে কিডনি। কিন্তু সেটা করতে গেলেও তো খরচ আছে। তা ছাড়া মায়ের ওপর যা ধকল যাবে, তাতে মা কি নিজে আর কাজ করতে পারবে? মাহিরের ওপরেই তো সব দায়িত্ব এসে জড়ো হবে। মাহির কী করবে তখন? এই ইলেভেন পাশ নিয়ে তো চাকরি পাবে না। খেলার দিকটাতেও আজকাল যায় না আর। ওই দিকেও যে অন্ধকার, সেটা বুঝে গেছে। তা হলে পড়ে রইল কে, রিতুদা? সেই রিতুদার কাছেই কি যেতে হবে শেষ পর্যন্ত? কী করবে ও?
গত পরশু মেজাজ খারাপ ছিল খুব। জ্বর-জ্বর লাগছিল বিকেল থেকে। কিছু ভাল লাগছিল না। তাই লালপাড়ার পাশের পেট্রোল পাম্পে গিয়ে বসেছিল ও।
পাম্পের কোণে একটা জায়গা আছে। সামান্য আবছা অন্ধকার। সেখানে নিমগাছের তলায় ভাঙা বেঞ্চে বসেছিল। টিটি ছিল সঙ্গে।
ওকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে টিটি বলেছিল, “তুই এমন বিলা হয়ে আছিস কেন রে?”
মাহির প্রথমে উত্তর দেয়নি। টিটি জোরাজুরি করায় বলেছিল, “আমার আজকাল কিছু ভাল লাগে না জানিস! কিচ্ছু ভাল লাগে না। মনে হয়, কী করছি এই জীবনটা নিয়ে? কেন এসব করছি? শালা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি একদম। খেলাটাও ভেস্তে গেল। রিতুদা হারামি শালা, ফার্স্ট ডিভিশনে নাকি চান্স দেবে! তোর কথা শোনাও ভুল হয়েছে! শালা, কী করি! এত কনফিউজ়ড লাগে! জীবনে কী করব, আমি বুঝি না!”
টিটি শুনে হেসেছিল নিজের মনে। তারপর পকেট থেকে একটা গাঁজাভরা সিগারেট বের করে নাকের কাছে ধরে শুঁকেছিল। তারপর দেশলাই বের করে বলেছিল, “প্রেমে পড়েছিস মনে হচ্ছে! পলির?”
ধরা পড়ে গিয়ে সামান্য তুত্লে ছিল মাহির। বলেছিল, “না… মানে… আসলে…”
“ব্যস ব্যস! বুঝে গেছি! শালা তোদের এই প্রেম জিনিসটা বেকার। দেখ, তোর মতো মালকেও কীসব আন্টুবান্টু বকাচ্ছে! শালা, ঘোড়া রোগ পুষিস না। আমাদের প্রেম করতে নেই। খুব হিট উঠলে লাগিয়ে আসবি আসল জায়গা থেকে। এসব প্রেম মারাস না। পলিকে দেখেছিস! ফাইভ স্টার হোটেল টাইপ। শোন, ও হল ঘি! তোর কুত্তার পেটে হজম হবে না!”
“বাজে কথা বলিস না,” মাহির রেগে গেছিল, “আমায় রেস্তরাঁয় বন্ধুদের কাছে নিয়ে গিয়েছে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বারো হাজার টাকার মোবাইল কিনে দিয়েছে! এমনি-এমনি! ওর মনে কিছু নেই বলছিস! জানিস, আমার হাত ধরে কথা বলে!”
টিটি হাতের সিগারেটটা না ধরিয়ে দেশলাইটা রেখে দিয়েছিল পকেটে। হয়তো মনে পড়ে গেছিল, ওরা পেট্রোল পাম্পের পাশে বসে আছে। টিটি এরপর তাকিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল, “ভালই আছিস। আসলে কী জানিস, তোর পেট এখন ভরতি। তাই এসব নিয়ে ভাবছিস। অস্তিত্ব নিয়ে ন্যাকড়াপনা করছিস! জীবনে ওসব না ভেবে কাজ কর, কাজ। দেখবি, ওসব মাথায় আসবে না। কাজে ডুবে থাকলে আর কিছু মনে হবে না। শালা, আমায় খিস্তি করছে! মনে আছে, একদিন আমার এঁটো রোল কেমন খেয়েছিলিস! খিদের কথা ভুলে যাস না মাহির। জীবন এমন পোঁদে লাথাবে না! ওসব পলি-ফলি ভুলে যা! শালা প্রেম মারাচ্ছে! যেন সলমন খানের ছবি!”
খিদেটা পাচ্ছে ভালই। মাহির জানে বাড়িতে কোথায় বিস্কুট রাখা থাকে। ও রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির পেছন দিকে একচিলতে বারান্দার পাশে ছোট্ট রান্নাঘর। মা যতটা পারে গুছিয়ে রাখে। মাহির খুট করে রান্নাঘরের আলোটা জ্বালাল।
হলুদ বাল্ব। রান্নার তেল-কালিতে কেমন জং ধরা লোহার মতো হয়ে গেছে। অসুস্থ লাগছে দেখতে। ছায়া ছায়া আলো পড়েছে।
