পেখম চোখ বন্ধ করল। ওর মনে পড়ে গেল প্রথম দিন কাজুকে দেখার সেই মুহূর্তটা।
জানুয়ারি মাস ছিল সেটা। সকালের আলোর ভেতর কেমন একটা পাতলা দুধের সরের মতো কুয়াশা পড়েছিল। পেখমদের ছোট্ট বাড়িটার পাশের পুকুরের জলে তখনও ভাল করে সূর্য এসে দাঁড়ায়নি। পেখম একটা লাল চাদর গায়ে দিয়ে দু’হাতে দুধের গ্লাস ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। কাজু এসেছিল একটা লাল-হলুদ ডোরা-কাটা মাফলার আর নীল রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে।
রোদের ঢালু মিনারের ভেতর সোনাকুচির মতো ধুলো উড়ছিল। তার মধ্যে কাজুর হালকা দাড়ি আর টানা-টানা চোখ কেমন যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা মানুষের মতো লেগেছিল পেখমের। পেখম যেন বুঝেছিল আজ থেকে ওর জীবনের আর-একটা দিক খুলে গেল। সেদিকে আর কেউ নেই কাজু ছাড়া!
পেখম চোখ খুলল। বাইরের শব্দ শুনে বুঝল, বৃষ্টি শুরু হল আবার! আর সেই জলে ধুয়ে যেতে লাগল সব সম্পর্কের টান, সব বন্ধন! মুছে যেতে লাগল আকাশের তারা, ঘোড়ার খুরের শব্দ, মায়ের গায়ের ঘুম-পাড়ানি গন্ধ! নিভে যেতে লাগল মাইলের পর মাইল জোনাকির আলো!
পেখম বুঝল, কাল এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় বাবা ছাড়া আর কারও জন্য মনখারাপ করবে না ওর! বুঝল, ওর জীবনে আজকের পর থেকে কাজু ছাড়া আর কেউ রইল না!
.
৩৪. মাহির
ছোট্ট ভাঁজে মণীশ আর রাজাকে কাটিয়ে এগিয়ে আসছে ছেলেটা। মাঠের ডান দিক থেকে আড়াআড়িভাবে বল নিয়ে ঢুকে আসছে ভেতরের দিকে। ছেলেটা রোগা, মাঝারি হাইট! হরিণের মতো দৌড়োচ্ছে! বলটাকে একবার ডান পায়ে আর-একবার বাঁ পায়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে ছোট ছোট লাফে। এবার রাইট ব্যাক ঝাঁপি পাশ থেকে দৌড়ে এল আটকাবে বলে। কিন্তু একটা ছোট্ট টোকায় বলটাকে ঝাঁপির পায়ের ওপর দিয়ে তুলে দিয়ে ছেলেটা বেরিয়ে গেল। সামনে শুধু মাহির একা। বিকেলের রোদ তেরছা করে এসে পড়েছে স্টেডিয়ামের পাশে ঘিরে থাকা দেবদারু গাছগুলোর মাথায়। হাওয়া দিচ্ছে আজ! লেকের দিক থেকে আসা হাওয়ায় ছেলেটার জার্সি উড়ছে পতাকার মতো! মাহির দেখল পতাদা চিৎকার করছে সাইড লাইন থেকে। বিশাল ভুঁড়িটা টি-শার্টের নীচ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। পইতেটা দেখা যাচ্ছে। মাহির তাকাল একবার। ছেলেটা সামনে এসে পড়েছে প্রায়! গ্যালারির সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। রেফারি ঘড়ি দেখছে। যে-কোনও সময়ে শেষ হয়ে যাবে খেলা। মাহির জানে গোল খেয়ে গেলেই সব শেষ! আর ফিরে আসার উপায় নেই। ওকে টপকে গেলে পেছনে শুধু সুমিত। ছেলেটা বলটা আবার বাঁ পা থেকে ডান পায়ে নিল। আড়চোখে দেখে নিল পেছনে কেউ আসছে কি না! পেছনে দশ মিটারের মধ্যে কেউ নেই! ছেলেটা এগিয়ে আসছে। মাহির তাকিয়ে আছে। হাওয়ার জোর বাড়ল আর-একটু। দেবদারু গাছের মাথা থেকে রোদ সরে যাচ্ছে আরও। গ্যালারির লোকগুলো কীসব যেন বলছে! আবছা শব্দ সব। মাহিরের আর কিছু মাথায় নেই। শুধু দুটো পা দেখছে ও। বলটার ওপর ঘুরছে দুটো পা! ছেলেটা এগিয়ে এল আরও। মাহিরও এগোল। ছেলেটা বাঁ পা দিয়ে ভাঁজ মারতে গেল। মাহির ডান দিকের পায়ের ওপর ট্যাকল করবে বলে চার্জ করল। বলটা সামান্য লাফিয়ে ঘুরে গিয়ে লাগল ওর বুটের ডগায়। বলটা ছিটকে গেল! কোথাও ঝনঝন করে শব্দ হল একটা। আর চোখ খুলে উঠে বসল মাহির।
ছেলেটা কি কাটিয়ে যেতে পারল? গোলটা কি হল? নাকি ও ক্লিয়ার করে দিতে পারল বলটাকে! কিছু বুঝতে পারছে না ও। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে। বুকের ভেতরটা কেমন একটা করছে! খেলার আর কত বাকি ছিল! মাহির দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। এই ডিসেম্বরের শীতেও ঘেমে গেছে একদম! ওর মনে হচ্ছে সত্যি মাঠের মধ্যেই ও ছিল! এত জীবন্ত হয় স্বপ্ন!
মাহির ধাতস্থ হতে সময় নিল একটু। আজ বাড়িতে একা আছে ও। শরীরটা ভাল নেই। মা ভাইকে নিয়ে গেছে ডায়ালিসিস করাতে। ওর সামান্য জ্বর, তাই আজ আর ও যায়নি রিতুদার কাছে। তবে আর কোনওদিন যাবে কি না, সেটাও ভেবে দেখছে এই সু্যোগে। রিতুদা ওকে যে-পথে নামাতে চাইছে সেটা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। মা ঠিকই বলেছিল, এরা অজগর সাপের মতো। সম্পূর্ণ গিলে নিতে চায়!
মাহির হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের আলোটা জ্বালাল। সন্ধে হয়ে গেছে। ভাই আর মায়ের আসতে দেরি আছে এখনও। এই দিনগুলোয় মায়ের আসতে প্রায় রাত দশটা বাজে। ও মোবাইলটা তুলল। নতুন মোবাইল। সাবধানে ব্যবহার করে মাহির। পলি দিয়েছে এটা। এর মূল্যই আলাদা! সওয়া ছ’টা বাজে। কাল পঁচিশে ডিসেম্বর। ছুটি। আজ রাস্তাঘাটে তাই ভিড় বেশ। মাহিরের মনে হল, যতই শরীর খারাপ লাগুক, ওর আজ মায়ের সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল!
বিছানা থেকে মাটিতে পা ঝুলিয়ে বসল মাহির। মেঝেটা ঠান্ডা হয়ে আছে। পুরনো বাড়ির ভাঙা লাল মেঝে। মাটিতে একটা গেলাস পড়ে আছে। বিছানার পাশে প্লাস্টিকের টুলের ওপর রাখা ছিল গেলাসটা। ঘুমের মধ্যে পা ছুড়েছিল ও, তাই মেঝেতে টুলসমেত ওটা উলটে পড়ে গেছে। এটারই কি আওয়াজ হয়েছে?
মাহির উঠে গেলাসটা তুলল। প্লাস্টিকের টুলটাও সোজা করে ঘরের এক কোণে সরিয়ে রাখল। শোওয়ার আগে জ্বর কমানোর ওষুধ খেয়েছিল। কাজ দিয়েছে। ঘাম হচ্ছে। এখন শরীরটাও অত খারাপ লাগছে না। বরং খিদে পাচ্ছে। দুপুরে আজ বিশেষ কিছু খেতে পারেনি! ডাক্তার দেখিয়েছিল গতকাল। সে কতগুলো কী ওষুধ দিয়েছে কে জানে, গা বমি-বমি করছিল খাওয়ার পরে! এখন অবশ্য তেমন কিছু লাগছে না।
