তারপর ওরা ঠিক করেছিল দিন।
কাজু বলেছিল, “গেট মিটিং আছে আর-একটা। মালিকরা তো আগের কথা শুনল না! তাই মিটিংটা এবার আরও বড় করে করতে হবে। আমি জানি মালিকরা সেটা বানচাল করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি সেটা ম্যানেজ করব। পুলিশ, গুন্ডা যাই আসুক। তুমি ভয় পাবে না। আমি ঠিক সেফলি বেরিয়ে যাব। তারপর…”
“তোমার কিছু হবে না তো?”
পেখমের মাথায় হাত বুলিয়ে কাজু বলেছিল, “আমি বলছি তো। আমি আসব তোমার কাছে।”
পেখম নিজের গলা থেকে কালো কারে ঝোলানো রুপোর চৌকো লকেটওয়ালা হারটা খুলে হাতে দিয়েছিল কাজুর। বলেছিল, “এটা তুমি সঙ্গে রাখবে। কেমন?”
“কিছু বলবি?” ঠাকুরদা পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন হঠাৎ।
পেখম হাসল। তারপর পায়ে-পায়ে ঢুকে এল ঘরে। বলল, “একটা কথা বলবে?”
“গজের প্যাঁচে পড়েছে মন্ত্রী! পরে বললে হবে?” ঠাকুরদা আবার দাবার বোর্ডের দিকে মুখ ফেরালেন।
পেখম বলল, “না, এখনই বলো।”
ঠাকুরদা হাসলেন, “তুই সত্যি পাগলি! বল।”
“আচ্ছা ঠাকুরদা, তোমার ছোটবেলার সব বন্ধুর নাম মনে আছে? তাদের জীবনের সব কিছু মনে আছে? ফুলুদাদু ছাড়া বলছি।”
ঠাকুরদা অবাক হয়ে তাকালেন, “আর কি মনে থাকে? আমার আশি হল। স্মৃতি তো ফিকে হবেই। তাই না?”
“তা হলে, বলাই বলে সেই বন্ধুর এত কিছু মনে আছে কেমন করে?”
ঠাকুরদা থমকে গেলেন। কী বলবেন যেন বুঝতে পারলেন না।
ফুলুদাদু বলল, “বগলা, তুই ওকে বলাইয়ের গল্প করেছিস? ওঃ, কী ছেলে ছিল! না?”
পেখম বলল, “তুমি ওকে ভুলতে পারোনি। কারণ, বলাই কাউকে ওরকম পাগলের মতো ভালবেসেছিল বলেই, তাই না! ওরকম তো দেখা যায় না! সবাই তো নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। মুখে প্রেম বললেও আসল সময় এলে কিছু করতে পারে না, ভয় পায়। একটা সেফ জীবন চায়। তাই না? কিন্তু বলাই তা চায়নি। আর দ্যাখো, তাই সবাই ফিকে হয়ে গেলেও ওর কথা তুমি মনে রেখে দিয়েছ! ভোলোনি! ও কষ্ট পেয়েছিল, ওর কিছু হয়নি। কিন্তু তোমরা কেউ যা পারোনি ও কিন্তু সেটাই পেরেছিল। তাই তোমরা ওকে ভুলতে পারোনি। আমরা বাঙালিরা, উত্তম-সুচিত্রা দেখে গদগদ হই। চোখের জল ফেলি। কিন্তু নিজের বাড়ির কেউ কিছু করলে এমন করি কেন?”
ঠাকুরদা এবার উঠে এলেন। পেখমের মাথায় হাত দিলেন আলতো করে। তারপর মৃদু গলায় বললেন, “সামনে বিয়ে। আর এসব মনে রাখিস না।”
“তুমি ভুলতে পেরেছ বলাইকে? সেটা তো তাও তোমার বন্ধুর জীবন ছিল, আর এটা তো আমার নিজের জীবন। কী করে ভুলি?”
ঠাকুরদা কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে পড়লেন আবার। পেখম হাসল। ঠাকুরদা ওকে খুব ভালবাসেন, কিন্তু ও এটাও বোঝে যে, ঠাকুরদা কোথায় যেন বদ্ধ!
পেখমের কষ্ট শুধু বাবাকে নিয়ে। ও বুঝতে পারে বাবার এসব কিছু ভাল লাগছে না। কিন্তু মাকে বাবা বেশ ভয় পায়। মায়ের কথা বাবা কাটে না। মা এমন রাগী! এমন ঝামেলা করে যে, বাবা খুব সমঝে চলে মাকে।
গতকাল রাতেও তো মা বাবাকে বলেছিল, “এদিকে আমরা সব আয়োজন করছি। কিন্তু তারপর যদি তোমার গুণধর মেয়ে কোনও ঝামেলা করে! বা ওই পাজি ছেলেটা যদি কিছু করে তখন কিন্তু…”
বাবা বিছানায় বসে একটা বই পড়ছিল। মায়ের কথা শুনে বলেছিল, “আমি তো বলেছি, আমি আছি। চিন্তা কোরো না!”
মা রাগের সঙ্গে বলেছিল, “কীসের পুলিশ তুমি কে জানে! দেখি কী করো তুমি!”
পেখম হাসল নিজের মনে। কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। না বাবা, না মা। সবাই দেখবে শুধু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। ও ভাবল একবার মায়েদের ঘরে যাবে। কিন্তু তারপরেই মত পালটাল। না যাবে না। গেলেই বিয়ে নিয়ে গালগল্প শুরু করে দেবে। ভাল লাগে না এসব কথা ওর। মা বোঝে না যে, ওর এসব ভাল লাগে না। মালিকরা যত পয়সাওয়ালা লোকই হোক না কেন, তাতে ওর আগ্রহ নেই কোনও।
পেখম আবার নিজের ঘরের দিকে ফিরল। কিন্তু তার আগেই ছোটকার গলা শুনতে পেল মেন গেটের কাছে।
“বউদি, বউদি! বাবা!”
ছোটকার গলার ভেতর এমন কিছু একটা ছিল যে, পেখম দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল ঠাকুরদা, ফুলুদাদু, মা আর ছোটকাকিমা বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
ছোটকা এসে দাঁড়াল ওদের বারান্দায়। ছোটকা হাঁপাচ্ছে। হাতে ধরা সাইকেলের চাবিটা নিয়ে অস্থিরভাবে একবার মুঠো খুলছে আর মুঠো বন্ধ করছে!
“কী হয়েছে?” ঠাকুরদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
ছোটকা বলল, “আরে, ফ্যাক্টরি গেটে খুব ঝামেলা হয়েছে। কাজু জানোয়ারটা লোক নিয়ে গোলমাল পাকিয়েছে। আমাদের প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজন জানোই তো, কাজ না করার ছুতো পেলেই হল। বোমা পড়েছে প্রচুর! পুলিশ এসেছে! দাদাও গেছে।”
বোমা! পুলিশ! পেখমের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল নিমেষে! কাজু কেমন আছে? ও ঠিক আছে কি? ওর কিছু হয়নি তো?
মা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর কাজু! পুলিশ ধরেছে ওকে!”
ছোটকা বলল, “ও শয়তানের বাচ্চা। সবাইকে খেপিয়ে দিয়ে নিজে কেটে পড়েছে! কোথায় গেছে কে জানে! তবে জানোয়ারটা পালিয়ে যাবে কোথায়! চারদিকে আমাদের লোক! একবার হাতে পেলে না!”
পেখম তাকিয়ে রইল সবার দিকে। কেমন যেন অচেনা মানুষ মনে হচ্ছে সবাইকে। মনে হচ্ছে এরা কারা ঢুকে এসেছে ওদের বাড়িতে! সবার মধ্যে এমন তীব্র নৃশংসতা আগে দেখেনি ও! সবাই যেন কাজুকে পেলেই মেরে দেবে! এ যেন এক চক্রব্যূহ! এ যেন প্রবল মৃত্যুর আয়োজন! কী করে মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে পারে! পেখমের মনে হল কাজু আটকে পড়েছে একরাশ লোভী আর স্বার্থান্ধ মানুষের মধ্যে!
