পেখম বলল, “তুই এসব বলবি না আর। তুই এখনও অনেক ছোট। একদম এসব বলবি না!”
টেটু মাথা নেড়ে বলল, “তুই বুঝতে পারছিস না দিদি! আমাদের বাড়ির লোকগুলো খুব খারাপ। সবার এত লোভ! এই যে মালিকরা বাবাকে প্রোমোশন দিল। জেঠুর প্রোমোশন নিয়েও নাকি ওপরমহলে কথা বলবে। এই যে সবাইকে এসে এটা-ওটা দিয়ে যায়, সেসব দেখেই সবার মাথা ঘুরে গেছে! আমার খুব লজ্জা লাগে, যখন আমাদের বাড়ির লোকজন হ্যাংলাপনা করে। মনে হয়, আমার বাবা এমন! মা এমন! জেঠিমা এমন! স্যার বলেন, লোভ করতে নেই। এটা আমি জানি, বড়রা জানে না? তুই এক কাজ কর না!”
“কী কাজ?” পেখম অবাক হল।
টেটু আর-একবার দরজার দিকে তাকাল। তারপর গলাটা আরও খাদে নামিয়ে বলল, “তুই আর কাজুদা পালিয়ে যাচ্ছিস না কেন? তোরা পালিয়ে যা। দু’দিন ঝামেলা হবে, চিৎকার-চেঁচামেচি হবে। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। তখন আবার আসবি তোরা। ততদিনে কাজুদা একটা চাকরি ঠিক পেয়ে যাবে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন পালিয়ে যা দিদি। বাঁচতে চাইলে পালিয়ে যা!”
পেখম স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল টেটুর দিকে। কী বলল এটা ও? বিজন কি কিছু বলে দিয়েছে? কাল রাতে কাজু আর ও যে পালিয়ে যাচ্ছে, সেটা একমাত্র বিজন জানে। টেটুর সঙ্গে বিজনের কথা হয়। তবে খুব কিছু বন্ধুত্ব নেই!
পেখম সতর্ক হল। জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ এটা বললি কেন?”
টেটু বলল, “আমি হলে তো তাই করতাম। তাই বললাম আর কী! প্লাস আমার নিজের একটা প্ল্যান আছে। যত তাড়াতাড়ি পারি এদের সবাইকে ছেড়ে পালাব আমি। আমাদের বাড়ির লোকেরা সবাই কেমন যেন। শুধু জেঠু আর ঠাকুরদা এমন নয়। বাকিরা এত লোভী!”
“টেটু!” পেখম ধমক দিল এবার, “বড়দের সম্বন্ধে এমন কথা বলতে আছে?”
টেটু হাসল, “বড়রা আর কতদিন বল তো বয়সের সুবিধে নিয়ে যা খুশি তাই করবে আর সম্মান ডিমান্ড করবে! এর একটা শেষ থাকা দরকার, না! আমি এই নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, জানিস!”
“ঠিক আছে। চুপ করে এখন পড়। এ ক’দিনে এত পেকে গেছিস জানতাম না!” পেখম জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। এতক্ষণ বৃষ্টি পড়ছিল, কিন্তু শব্দ শুনে বুঝল, এবার ধরেছে।
টেটু টেবিল থেকে কলমটা তুলে প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলল। তারপর বলল, “ভাল কথা বলছি দিদি। আর মাত্র সাতদিন বাকি আছে। বিয়ের কার্ড দেওয়াও প্রায় শেষ। ভেবে দেখিস কিন্তু।”
পেখম আর না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এল। ঠাকুরদার ঘরে উঁকি দিল একবার। দেখল, ঠাকুরদা আর ফুলুদাদুর কোনওদিকে মন নেই। ও তাও দরজায় দাঁড়াল একটু। আজ মনে হচ্ছে সব কিছু আরও ভাল করে নিজের মনের মধ্যে নিয়ে নেয়। সব ছবি, সব মুহূর্ত বুকের মধ্যে জমা করে নেয়। আর এমন রাত, এমন সন্ধে তো পাবে না। মনখারাপ আর ভয় করছে পেখমের। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতটা যখন এগিয়ে গেছে তখন আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই। কাজু ওকে এইসব বলেছিল আগেই। বলেছিল, কী কী ছাড়তে হবে। কাদের ছাড়তে হবে। কিন্তু তাও কথা শোনেনি পেখম। কাজুকে ছেড়ে ওর পক্ষে থাকা সম্ভব নয়!
বিজনদের বাড়ির সেই বাগানে কাজুর বুকের সঙ্গে লেপটে থেকে পেখম বলেছিল, “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
কাজু বলেছিল, “হ্যাঁ, পাচ্ছি।”
“কীসের ভয়? সব ছেড়ে যেতে বলছি বলে?” পেখমের গলায় অভিমান এসে জমা হয়েছিল।
কাজু বলেছিল, “পেখম, জীবন তো থেমে থাকে না। তোমার হয়তো পরে আমাকে আর ভাল লাগবে না। হয়তো জানবে আমি এমন কিছু করেছি জীবনে, যাতে আমায় ঘেন্না করতে শুরু করবে!”
“মানে?” পেখম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে!
কাজু ইতস্তত করেছিল। কেমন একটা দ্বিধার ভাব ছিল ওর স্বরে। যেন কিছু আটকে আছে ওর মনে। এমনটা করতে কাজুকে কোনওদিন দেখেনি ও।
কাজু সময় নিয়েছিল একটু। তারপর বলেছিল, “মানে, মনখারাপের সময় তো মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। তখন সে যে কী করে ফেলে! কী বলে ফেলে! তাই…”
“থাক, মনখারাপের সময়ের কথা আমি আর শুনতে চাই না। অনেক মনখারাপ হয়েছে। আর না। আর শুনব না।”
“কিন্তু সেসব শোনা দরকার। সেসব আমি…”
“না, না, না। আমি শুনব না। যা হয়েছে, হয়ে গেছে… আমি সেসব শুনবই না!” জেদি গলায় বলেছিল পেখম, “এবার হল তো? আর ভয় নেই তো কিছু নিয়ে?”
কাজু এবার তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। সামান্য হেসে বলেছিল, “না। ভয় আমার আছে। তোমাকে নিয়ে আছে!”
“আমাকে নিয়ে!” পেখম অবাক হয়ে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি তোমার সঙ্গে গাছের তলাতেও থাকতে পারি!”
“হা হা,” কাজু হেসে বলেছিল, “সেটা নয় পেখম। দ্যাখো, জীবনের এই মুহূর্তে তুমি যতটা প্রেম অনুভব করছ, এমনটা তো আর সারা জীবন থাকবে না! অভ্যেস, সব কিছুর মতো প্রেমকেও ভোঁতা করে দেয়। তখন যদি তোমার মনে হয় আমার সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে ভুল করেছিলে! বাবাকে যে এত ভালবাসো, তাকে কষ্ট দিয়ে ভুল করেছিলে! তখন! আমার তো তুমি ছাড়া আর কিছু নেই পেখম! তুমি সেইসব ভেবে যদি পরে আমায় দূরে ঠেলে দাও! তাই ভয় লাগছে আমার।”
পেখম কাজুর মাথাটা ধরে নামিয়ে এনেছিল ওর দিকে। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে কাজুর সমস্ত ভয়, দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব শুষে নিয়েছিল। কাজুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “খালি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে একই কথা বলছ! এসব নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না, কেমন!”
