পেখম উঠল। আজ ওর শেষদিন এই বাড়িতে। কাল থেকে নতুন পথ, নতুন জীবন, নতুন সব কিছু। কাল কাজু আর ও চলে যাবে এই সোনাঝুরি ছেড়ে।
কেউ তো ওদের বুঝল না। কেউ তো জানতে চাইল না ওদের কী সম্পর্ক। সবাই শুধু পাঁচিল তুলেই গেল। সবাই দূরে সরিয়ে রাখতে চাইল ওদের। ভেঙে দিতে চাইল সব কিছু। কিন্তু জীবনটা ওদের। আর কারও নয়। তাই এভাবে নিজেদের জীবন অন্য কারও কাছে দিয়ে যাবে না ওরা।
আজ বৃষ্টি পড়ছে খুব। নিম্নচাপের বৃষ্টি। ক’দিন ভোগাবে। ঠাকুরদা আজ দোকানে যাননি। ফুলুদাদুর সঙ্গে নিজের ঘরে বসে দাবা খেলছেন। বাড়িতে মা আর কাকিমা মিলে বিয়ের কীসব ফর্দ করছে। বাবা ছিল। কিন্তু কী একটা কাজে বেরিয়ে গিয়েছে।
পেখম গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা ওর কাঠের আলমারিতে তুলে রাখল। এটা মায়ের হাতে পড়লে বিপদ আছে। তবে একটাই বাঁচোয়া, ও যেহেতু আর বাইরে বেরোয় না, তাই মা-ও ওর ঘরে এসে কিছু হাতড়ায় না।
পেখম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আর-একবার ঘরের ভেতরটা দেখল। কাল রাতে সবার নজর এড়িয়ে বেরিয়ে যাবে ও। তাই আজ রাতটুকুই এই ঘরে ওর শেষ রাত। কীসের যে বন্ধন! কেন যে এত কষ্ট হচ্ছে ওর! এই সব ছেড়ে চলে যেতে হবে! কেন মা মেনে নেবে না কাজুকে? কেন বাড়ির লোকেরা কাজুকে পছন্দ করবে না? কেন ওর ইচ্ছেমতো তৈরি হবে না ওর জীবন? ও কি ক্রীতদাসী নাকি? মা, বাবা খেতে-পরতে দেয় বলে ওর ইচ্ছে আর জীবন কিনে নিয়েছে নাকি? কাজু ভাল লেখাপড়া জানে। পেখম নিজেও পড়াশোনা করে। তা হলে দু’জনে চাকরি করে কেন একযোগে সংসার চালাতে পারবে না? পেখম জানে এসব প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যাবে সারা জীবন। এগুলোর উত্তর ওদের বাড়ির লোকদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না।
পেখম কাকুদের ঘরে গেল। টেটু পড়ছে। পেছন থেকে ওকে দেখা যাচ্ছে। মাথা নিচু করে পড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। দেখে আচমকা কেন কে জানে আবার চোখে জল এল ওর। টেটু যখন হয়েছিল, ওর মনে আছে, সারা দিন ওর সামনে বসে থাকত পেখম। বলত, “আমার ভাই!” টেটুও ওকেই সবচেয়ে বেশি চিনত যেন। পেখম না এসে বসলে খেতেই চাইত না। পেখমের কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়িয়ে থাকত সারাক্ষণ। সেই ভাইকেও ছেড়ে চলে যেতে হবে!
নিজেকে শক্ত করল ও। এভাবে দুর্বল হলে হবে না। পৃথিবীতে দুর্বলদের জায়গা নেই। তুমি নরম হয়েছ কী লোকে সেটা তোমার অক্ষমতা, দুর্বলতা ভেবে তোমায় চেপে মাটিতে পুঁতে দেবে।
পেখম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে এগিয়ে গেল টেটুর কাছে। আলতো করে ওর মাথায় হাত দিল।
টেটু কী একটা লিখছিল। ঘুরে তাকাল, “আরে দিদি, তুই!”
“এমনি এলাম তোকে দেখতে। কী পড়ছিস?” পেখম সামান্য ঝুঁকে খাতাটা দেখল।
“আরে, দেখ না, ট্রানস্লেশন করতে দিয়েছেন স্যার। এসব কঠিন-কঠিন ইংরেজি আমি পারি? বলেছেন ডিকশনারি যেন না দেখি। আমি কি ভগবান যে, ডিকশনারি না দেখে নিজে থেকে সব মানে জেনে যাব!”
পেখম হাসল, “আরে, তুই দেখ। কে বারণ করেছে? এখানে তো আর কেউ দেখতে আসবে না!”
টেটু তাকাল পেখমের দিকে। তারপর বলল, “নাঃ, থাক। স্যারকে কথা দিয়েছি, আমি এমন কিছু করব না। কথার তো একটা দাম আছে, তাই না দিদি?”
পেখম হাসল। ঠিকই তো! কথারই তো দাম! মানুষের আর তো কিছু নেই কথা ছাড়া! অধিকাংশ মানুষ বোঝে না এটা। কিন্তু কেউ না বুঝলেই তো আর সেটা ভুল হয়ে যাবে না! ওর আশ্চর্য লাগল, টেটুর মতো ছোট ছেলে এসব জানে, কিন্তু বড়রা জানে না!
টেটু হাতের কলমটা বন্ধ করে ঘুরে বসল। তারপর চেয়ার সরিয়ে ওর দিকে ঘুরে বসল। বলল, “দিদি, একটা কথা বলব?”
“কী?” পেখম অবাক হল। টেটু তো এমন করে সিরিয়াস হয়ে কিছু বলে না কখনও।
টেটু দরজার দিকে তাকাল একবার। তারপর গলা নামিয়ে বলল, “কাজুদা তো খুব ভাল ছেলে। কিন্তু বড়রা বুঝতে চাইছে না। এটাই তো প্রবলেম, তাই না?”
পেখম অবাক হয়ে গেল। টেটু এসব কী বলছে! ও এসব কথা জানল কী করে! এই কয়েকদিন আগেও তো বাচ্চা বাচ্চা ছিল! এমন বড় হয়ে গেল কী করে!
পেখম চোখ বড় করে বলল, “তুই এসব কথা জানলি কী করে? কে বলল তোকে এসব কথা?”
টেটু মাথা নেড়ে বলল, “দিদি, আমি ক্লাস নাইন। কত বড় হয়ে গিয়েছি বল তো! বিজনের বয়সি আমি। বিজন এখন থেকেই পার্টি করে! আর আমি এটা জানব না!”
পেখম কী বলবে বুঝতে পারল না। কয়েকদিন আগেও তো কেমন ছোট্টটি ছিল যেন! কী হল টেটুর!
টেটু বলল, “তুই দিদি বড্ড ন্যাতপ্যাতে। কাজুদা আর তোর প্রেমই তো হবে। তোরা সোনাঝুরির বেস্ট দেখতে। এমনই তো হওয়ার কথা।”
“চুপ কর! তুই এত পেকেছিস!”
“আরে! পাকার কী আছে!” টেটু হাসল, “আমি আরও অনেক কিছু জানি। বড় হচ্ছি না! বাবা যে মাকে রাতে মাঝে মাঝে আদর করে সেটাও শুনি! আগে বুঝতাম না মায়ের কীসের ভয় করে, এখন বুঝি। আমায় ক্লাসের একজন বলেছে। মানে, শিখিয়ে দিয়েছে। জানিস, আমার শুনতে লজ্জা লাগে। কিন্তু বাবার লজ্জা নেই!”
“চুপ, চুপ একদম!” পেখম এবার টেটুর মুখটা চেপে ধরল।
টেটু ওর হাতটা জোর করে সরিয়ে দিয়ে বলল, “কাজুদার ভাই আছে না? ওই যে বাচ্চা ছেলেটা। ক্লাস ফাইভে পড়ে আমাদের স্কুলে। ও আমায় বলছিল কাজুদা নাকি বাড়িতে মনমরা হয়ে থাকে। ছেলেটার খুব গাছের বাতিক, জানিস! ওইটুকু ছেলে সারাক্ষণ গাছপালা নিয়ে পড়ে আছে! আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলে।”
