মুম্বই যাওয়ার আগের দিন কয়েকটা জিনিস কিনতে বেরিয়েছিল পুশকিন। সেসব কিনে দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল ওর। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে পারেনি। গলির মুখের আবছায়ায় একটা পরিচিত অবয়ব দেখে কেমন যেন বিদ্যুতের ছ্যাঁকা লেগেছিল পুশকিনের। স্মিতা! এখানে কী করছে?
স্মিতা ওকে দেখে প্রায় দৌড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। পা কাঁপছিল পুশকিনের। বুকে কেমন গিঁট পড়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল মাটিতে পড়ে যাবে। এমন আচমকা কেউ কাছে আসে! এ তো খুনের চেষ্টা!
স্মিতা সোজা তাকিয়েছিল ওর দিকে। এদিক-ওদিক থেকে ছিটকে আসা আলোর টুকরো এসে বিঁধেছিল স্মিতার মুখে।
“তুমি চলে যাচ্ছ?” স্মিতা কেমন একটা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারছিল না। তাও মনের তলায় পড়ে থাকা কয়েকটা শব্দ কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে নিয়ে ও বলেছিল, “হ্যাঁ, কালকে। মুম্বই।”
“কেন?” স্মিতা কিছুতেই চোখ সরাচ্ছিল না।
পুশকিনের কথাও আটকে গিয়েছিল যেন। তাও জোর করে অস্ফুটে বলেছিল, “মানে… তুমি তো জানো…”
“না বলো,” স্মিতা জেদের গলায় বলেছিল।
সেই, এক ব্যাপার! পুশকিনের মনে হয়েছিল এখনও বলতে হবে! এত কিছুর পরেও বলতে হবে! থাক তবে, আর কিছু বলে কাজ নেই। অনেক হয়েছে। তাই ও আর কিছু বলেনি। মাথা নামিয়ে স্মিতার পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল।
স্মিতা আচমকা ওকে চেপে ধরেছিল দু’হাত দিয়ে, তারপর অদ্ভুত ঝরা পাতার গলায় বলেছিল, “কেন যোগাযোগ করো না তুমি? আমি পারছি না তোমায় ছাড়া থাকতে। আমি মরে যাব। বুঝতে পারছ? মরে যাব আমি। তুমি যাবে না, আমায় ছেড়ে কখনও যাবে না। বুঝেছ?”
পুশকিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। স্মিতাই তো এটা? কী বলছে ও? এও সম্ভব নাকি?
স্মিতা বলেছিল, “আমি এই ক’দিনে বুঝতে পেরেছি, আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারব না। কিছুতেই না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমায় বিয়ে করবে?”
সেদিন থেকে দু’সপ্তাহের মাথায় স্মিতাকে বিয়ে করেছিল পুশকিন। ওর বাড়ির কেউ আসেনি। সবাই ছি ছি করেছিল। মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাও কোনও কিছু ওকে আটকাতে পারেনি।
ফুলশয্যার রাতে, পুশকিন স্মিতাকে দু’হাত দিয়ে ধরে বলেছিল, “তুমি আমার সামান্য জীবনে এক পরি!”
স্মিতাও পুশকিনকে আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া আমি মরে যাব। আমায় ছেড়ে যাবে না তো?”
জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল সেটা। পুশকিনের ভেতরের আদিম পুরুষটা যেন জিতে গিয়েছিল সেদিন। স্মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে পুশকিন ভেবেছিল, তমালকে স্মিতার জীবন থেকে ঠিক সরিয়ে দিতে পেরেছে ও।
কিন্তু জীবন সমুদ্রের মতো। কোনও কিছুই তাতে হারায় না। একদিন না একদিন কোনও না কোনও বালুতটে সেই হারানো জিনিসটাকেই ঠিক আছড়ে এনে ফেলে জীবন। বোঝায়, কোনও খেলাই শেষ হওয়ার আগে শেষ নয়।
রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ওরা দেখল জায়গাটাকে। ভাঙা রেললাইন চলে গিয়েছে একটা। চারিদিকে কেমন ঝোপজঙ্গল হয়ে আছে। একপাশ দিয়ে সরু রাস্তা। কয়েকটা গাছের ডালপালা সেই রাস্তার কিছুটা দখল নিতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। ওরা সেই পথে এগিয়ে গেল।
একজন বয়স্ক লোক বাড়ির সামনে রোদে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। ওদের দেখে মুখ তুলে তাকালেন। তারপর স্মরণকে দেখে চিনতে পারলেন ঠিক, “আরে তুমি?”
স্মরণ হেসে এগিয়ে গেল, “হ্যাঁ স্যার, আমি। আর এই আমার সঙ্গে…”
পুশকিন স্মরণকে কাঁধে হাত দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। তারপর নিজে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল মানুষটাকে।
ভদ্রলোক ঘাবড়ে গেলেন সামান্য। বললেন, “কে বাবা! তোমায় তো ঠিক…”
“একদম চেনা যাচ্ছে না, বিজনকাকু! লোকে যে বলে, আমাকে আমার বাবার মতো দেখতে!”
বিজন স্তব্ধ হয়ে গেলেন একদম। যেন মোমের মূর্তি! যেন লাভায় আটকে যাওয়া প্রজাপতি! যেন বহুবছর পর হারানো সম্পদ ফেরত পাওয়া মানুষ!
বিজন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “পরি… পরি…”
পুশকিন জানে পরি বলে কিছু হয় না। শুধু কিছু মানুষ আছে, যারা সারা জীবনেও এই সত্যিটা বিশ্বাস করে না। সারা জীবন তারা নিজেদের ক্রমাগত ঠকিয়ে যায়।
.
৩৩. পেখম
ঘুম নেমেছে অন্ধ তারার চোখে
পুকুরঘেরা ঝাপসা গাছের সারি
হাত ছুঁয়ে কে বৃষ্টি দিয়ে গেল!
মেঘলা, তোমার বকুল হতে পারি!
ফুল হবে? সেই সাধ্য ছিল কারও?
আমরা এখন সব খেলাতে হারি…
তবুও জেনো তোমার দিকে চেয়ে
সাজিয়ে রাখি জোনাকিদের বাড়ি
লেখাটা আর-একবার পড়ল পেখম, তারপর কাজুর ডায়েরিটা বন্ধ করে ঝোলার মধ্যে ভরে নিল। এই লেখাটা বেশ পছন্দ ওর। আজ অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে ডায়েরিটা গুছিয়ে নেওয়ার আগে কেন কে জানে লেখাটা আর-একবার পড়তে ইচ্ছে হল! সত্যি কি কাজু ওর জন্য সাজিয়ে রাখবে এমন একটা জোনাক-রঙা বাড়ি?
ডায়েরিটা ঢুকিয়ে পেখম দেখে নিল চারিদিক। আর কি কিছু পড়ে রইল! নাঃ, আর কিছু পড়ে নেই। কিন্তু আসলে তো সবটাই পড়ে রইল! এই ঘর, এই চৌকি। ছোট কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেমে বাঁধানো আয়না। দরজার কড়ায় ঝোলানো চুলের কালো ফিতে। ওই টেবিল। জড়ো করা বই। খবর কাগজের কাটিং। ঝরনা কলম। লাল কালি, সবুজ কালি। ঠাকুরদার এনে দেওয়া সেই আকাশি রঙের পেনসিল। কুমকুম টিপের বাক্স। ঠাকুরমার রুপোর পাউডার কেস। জমানো দেশলাইয়ের খোল। ইনফ্যান্ট স্কুলের প্রথম ইংরেজি বই। সব, সব তো রয়েই গেল! ওই জানলা, তার পাশে বাবু হয়ে বসে জোনাকি দেখা। মায়ের গায়ের গন্ধে ডুবে ঘুমিয়ে পড়া। বাবার পিঠে চড়ে ঘোড়া ছোটানোর আনন্দে খিলখিল শব্দে উড়ে যাওয়া। আর কাকুর সঙ্গে বসে, লোডশেডিং-এর আকাশে তারা দেখার সেই ছোট্ট পেখম, সব তো রয়েই গেল এখানে। এই ঘরে, এই বাড়িতে। ওই ছোট্ট কাপড়ের ঝোলা ব্যাগে এতগুলো বছর আর এত এত স্মৃতি কি ভরে নিয়ে যাওয়া যায়!
