“তুই এমনটা করতে পারলি!”
আচমকা কথাটা মনে পড়ায় থমকে গেল আইকা! ভুরু কুঁচকে গেল ওর। কী হল ব্যাপারটা! হঠাৎ এটা মনে পড়ল কেন! আইকা চোখ বন্ধ করল একটু সময়ের জন্য। হঠাৎ এতদিন পরে এটা মনে পড়ল কেন? সেন্টিমেন্ট-কার্যকারিতা এসব নিয়ে ভাবছে বলেই কি এটা মাথায় এল? কিন্তু সে তো প্রায় উনিশ বছর হয়ে গিয়েছে! সেই স্কুললাইফের ব্যাপার। তবে? বয়স বাড়ছে বলেই কি আচমকা মনে পড়ে গেল ওর কথা?
করিডরের শেষ প্রান্তে রুপিনস্যারের কেবিন। তার আগের এই জায়গাটা স্টেনলেস স্টিলের পাত দিয়ে মোড়া। সামান্য বাঁকাচোরা হলেও প্রতিফলন দেখা যায়।
আইকা মুখ ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে নিল আর-একবার! ছোট করে কাটা চুল। বেবি পিঙ্ক রঙের শার্টের সঙ্গে কালো ট্রাউজ়ার। সারা দিনের ক্লান্তির পরেও দেখতে খারাপ লাগছে না! ভালই তো আছে আইকা! নিজের ফ্ল্যাট। মা। বন্ধুবান্ধব। ঋষি। সব নিয়ে খারাপ নেই তো! তবে?
ঋষির কথা মনে পড়তেই হাসি পেল আইকার। ঋষি আগরওয়াল। আলিপুরে থাকে ছেলেটা। বিশাল বড়লোকের ছেলে। চাল, পেঁয়াজ, ডাল আরও কীসবের ব্যাবসা আছে। মদেরও একটা ব্রুয়ারি আছে। কিন্তু সেসব দিকে ঋষির মন নেই।
ঋষি বিবাহিত। কিন্তু বউয়ের দিকেও মন নেই। আইকা বউয়ের কথা তুললে ঋষি বলে, “আরে, ওটা সমঝোতা। বাবার বিজ়নেস বাড়বে ওতে! পলকের বাবুজির বিশাল কারোবার। তুমি তো বোঝো আইকা। শি ডাজ়নট নো হাউ টু লাভ! হাউ টু ফ্… ইউ নো!”
আইকা হাসে। ঋষি ওর চেয়ে আট বছরের ছোট। অফিসের একটা পার্টিতেই আলাপ হয়েছিল বছরদুয়েক আগে। তারপর থেকেই আঠার মতো লেগে থাকে ওর সঙ্গে!
ঋষির একটা ফ্ল্যাট আছে রাজারহাটে। বেশ বড়। প্রায় তিন হাজার স্কোয়ার ফিট। সেখানে মাঝে মাঝে যায় ওরা। ঋষি পাগলামো করে! শরীর নিয়ে মেতে ওঠে! তারপর বিছানাতেই বসে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করে ওরা। বড় টিভিতে ফিল্ম দেখে। আড্ডা মারে। কিন্তু ওইটুকুই। আর কিছু নয়। শুধু টাইম পাস। কোনও মন নেই। গভীরতা নেই। ফিরে আসার সময় পিছুটান নেই। কিচ্ছু নেই। কেবলমাত্র ফান-টাইম। ব্যস। এটা কতদিন থাকবে, সেটাও ও জানে না।
রুপিন মেহতার কেবিনটা বেশ বড়। চারিদিকে বাদামের খোসার রঙের ফার্নিচার। এককোণে বড় লাউঞ্জার। প্রায় নিঃশব্দে এসি চলছে। বড় একটা টেবলের উলটো দিকে বসে রয়েছেন রুপিন। ছোটখাটো মানুষ। গোলাপি ফরসা গায়ের রং। মাথায় পাট করে আঁচড়ানো চুল। দাড়িগোঁফ কামানো। চোখে রিমলেস চশমা। ঘন ভুরুর আড়ালে আঁশফলের বীজের মতো চোখ! দেখলে বোঝা যায় না লোকটার পঞ্চাশ বছর বয়স!
আইকা ঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই রুপিন চোখ তুলে তাকালেন। তারপর হাত দিয়ে বসতে বললেন সামনের চেয়ারে। আইকার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই রে! বসতে বলছেন! তার মানে দেরি হবে। রুপিন ওর বস। তাঁর সামনে তো আর বিরক্তি দেখাতে পারে না আইকা! তাই যথাসম্ভব ক্যাজ়ুয়াল থেকে আড়চোখে ঘড়িটা আবার দেখল আইকা। আজ নির্ঘাত মা আর পুটুমাসির কাছে ঝাড় খাবে! পাত্রপক্ষ চলে এলে মুশকিল হবে। নোঈও রাগ করবে।
নোঈ পুটুমাসির ছোট মেয়ে। বড় মেয়ে এখানে থাকে না। বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নিউ জার্সিতে থাকে। প্রায় ওর মতোই বয়স। আর সেখানে নোঈ মাত্র ছাব্বিশ! এই বয়সে আজকাল কেউ কারও বিয়ে দেয়! হয়তো দেয়! আইকার মনে হয় এখনও নোঈ বিয়ে করার মতো হয়নি।
আইকার বিরক্ত লাগে। মানুষ যে কী করে না! পুটুমাসিদের কথাবার্তা শুনে তো মনে হয় মনে আলো হাওয়া লেগেছে! কিন্তু তারাও এটা কী করে করছে কে জানে! রাঙামেসোর সঙ্গে আইকার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। তাই নোঈ-র এখন বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে রাঙামেসোকে চেপে ধরেছিল আইকা।
রাঙামেসো মানুষটা ভাল। চুপচাপ ধরনের। ঝগড়াঝাঁটি বা তর্ক পছন্দ করে না। সব প্রায় মেনেই নেয়।
আইকার ভাল লাগে রাঙামেসোকে। সারাদিন হয় বই, নয়তো ল্যাপটপে মুভি নিয়ে বসে থাকে। কাউকে জ্বালায় না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘চা দাও’ বলে চিৎকার করে না। কিন্তু মাঝে মাঝে রাঙামেসোর এই নন-এনগেজিং ধরনটা ভাল লাগে না আইকার। মনে হয়, এভাবে জীবন-বিমুখ হয়ে কী করে থাকে কেউ! পুটুমাসিই যা করার করে, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেয়। রাঙামেসো যেন বাড়ির একটা ফুলদানি!
গত সপ্তাহে নোঈ-র এই বিয়ের সম্বন্ধের কথাটা ওদের বলেছিল পুটুমাসি। সন্ধেবেলাটায় মা পুটুমাসিদের বাড়িতেই থাকে। অফিস থেকে ফিরে আইকাও যায়। কখনও ও খাবার কিনে নিয়ে যায় আবার কখনও পুটুমাসি কিছু খাবার বানায়। সেদিন ও নিজে পিৎজ়া নিয়ে এসেছিল। খাবারটা ভাগ করে দিতে দিতে পুটুমাসিই তুলেছিল কথাটা!
পুটুমাসি বলেছিল, “তোদের একটা খবর দেওয়ার ছিল রেখা।”
আইকা তাকিয়ে দেখেছিল মাকে। মা চায়ের কাপটা হাতে নিয়েছিল সবে। পুটুমাসির কথা শুনে থমকে গিয়েছিল।
পুটুমাসি বলেছিল, “পরের সপ্তাহে নোঈকে দেখতে আসবে।”
“দেখতে আসবে মানে?” মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল পুটুমাসির দিকে।
“মানে বিয়ের জন্য,” হেসেছিল পুটুমাসি, “গত জানুয়ারিতে আমরা একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলাম। ওই মুকুন্দপুরের ওইদিকে। সেখানে ওঁরা দেখেছিলেন নোঈকে। খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই খবর দিয়েছে।”
