“কেন?” স্মিতা পুশকিনের চোখে নিজের চোখ গেঁথে রেখেছিল একদম।
পুশকিন একবার আড়চোখে সামনে বসা ড্রাইভারকে দেখেছিল। কারও সামনে এত ব্যক্তিগত কথা ও বলে কী করে! আর স্মিতাই-বা কেন জিজ্ঞেস করছে! ওর এখন যা হাল তা দেখে কি বুঝতে পারছে না? কিন্তু মেয়েরা এমনই করে। হ্যাঁ করুক আর না করুক, সবটা শোনা তাদের চাই-ই চাই।
পুশকিন অস্থির হয়ে গিয়েছিল খুব। তারপর আর নিজেকে না আটকে বলেছিল, “আমার তোমাকে এত ভাল লাগে যে, সামনে এলে মনে হয় আমি জলের তলায় ডুবে যাচ্ছি! আমার… সব গুলিয়ে যায়! কিন্তু… আমি জানি তমাল তোমার সব। তাই নিজেকে কেন কষ্ট দেব ভেবে… মানে…”
“হ্যাঁ, তমাল আমার সব, ওকে আমার নিজের মনে হয়,” স্মিতা বলেছিল শান্ত গলায়।
পুশকিনের মনে হয়েছিল কেউ বোধহয় ওর শরীরে গরম লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছে! কিছু জিনিস মনে মনে ভেবে নেওয়া আর সেটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার মধ্যে এক আকাশ পার্থক্য আছে। মনে মনে কিছু ভাবার মধ্যে এক শতাংশ হলেও আশা থাকে। সেলফ নেগেশন থাকে। কিন্তু একবার কেউ সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে বলে দিলে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়!
পুশকিন জানত, তমালকে ভালবাসে স্মিতা। কিন্তু যেই সেটা স্মিতা বলে দিয়েছিল ওর সব কিছু কেমন যেন দলা পাকিয়ে গিয়েছিল।
প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ছ’মাস লেগেছিল পুশকিনের। স্মিতা কিন্তু তাও যোগাযোগ রাখত ওর সঙ্গে। নিজে থেকে কথা বলত। খাবার নিয়ে আসত। শপিং-এ ধরে নিয়ে যেত জোর করে।
আর পুশকিন নিজেও বুঝতে পারছিল যে, ও তো আর অন্য কাউকে ভালবাসতে পারবে না। তাই স্মিতার সঙ্গ পাচ্ছে ভেবে ধীরে ধীরে মেনেও নিয়েছিল সব। পুশকিনের নিজেরই অবাক লাগত মাঝে মাঝে। অন্যের জীবনে কিছু হলে, মানুষ কত জ্ঞান দেয়! কিন্তু নিজের জীবনে শুধুমাত্র যাকে পছন্দ করে, তার কাছাকাছি থাকবে বলে মানুষকে যে মেনে নিতে হয় কত জিনিস!
পুশকিন কেন ওর সঙ্গে ঘোরে, ওর সব কথা মেনে নেয় সবটাই জানত স্মিতা। এমনকী, কখনও-কখনও সামান্য দুর্বল হয়ে পুশকিন বলেও দিত ওর মনের কথা। তখন স্মিতা রাগ করত। বলত, “একই কথা বারবার বলো কেন?” কিন্তু পরেই আবার পুশকিন চলে গেলে সেই নিয়েও অভিমান দেখাত।
বাড়িতেও স্মিতার কথা ক্রমে জেনে যায় সবাই। মা রাগ করতে থাকে স্মিতার পারিবারিক অবস্থা শুনে। বাবাও বোঝানোর চেষ্টা করে ওকে। কিন্তু পুশকিনকে যেন ভূতে পেয়েছিল! এ যেন এক কুহক! যেন নিশিডাক! রাতে ঘুমের মধ্যে ও দেখত স্মিতা ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেখত, কোন এক নাম না-জানা পুরুষের সঙ্গে পাহাড়ি কোনও এক শহরে বসে আছে ও। ঘুম ভেঙে একা অন্ধকারে বসে থাকত পুশকিন। কাঁদত বালিশে মুখ গুঁজে। মনে হত কেউ যেন ওর শরীরের চামড়া ধীরে-ধীরে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কাছে গেলে কষ্ট। আবার দূরে সরে থাকাও সম্ভব নয়। এক অদ্ভুত চোরাবালি যেন! ডুবে যাওয়ার মধ্যে এমন মৃত্যুভয় আর বাঁচার আনন্দ একসঙ্গে আগে কোনওদিন অনুভব করেনি ও!
তারপর একদিন মা খুব রাগারাগি করেছিল। সারা দিন না খেয়ে, চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুলে নিয়েছিল একেবারে! আর তার এক সপ্তাহের মধ্যেই জোর করে বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল কয়েকটা। আত্মীয়স্বজনরা জেনে গিয়েছিল সব। সবাই মিলে পুশকিনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, এই স্মিতা কেন ওর জন্য খারাপ। যে সাড়ে তিন বছর কোনও ছেলেকে এভাবে ঝুলিয়ে রাখে, কাছে আসতে দেয় না, কিন্তু দূরেও যেতে দেয় না, যে অন্যের ভালবাসার সুযোগ নেয়, সে ভালমানুষ হতে পারে না। হয় সে শয়তান, নয়তো অসুস্থ। আর কোনওটাই সাংসারিক জীবনে কাম্য নয়। তাই সবাই মিলে একযোগে পুশকিনকে বোঝাতে শুরু করেছিল— ও যেন এসব ভুলে যায়।
মাসদুয়েক পরে এক রাতে পুশকিন আবার ওরকম কষ্টের স্বপ্ন দেখেছিল একটা। চোখে জল নিয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসেছিল একা। সব যেন কেমন গুলিয়ে গেছিল ওর। মনে হয়েছিল মাথাটা এবার ঠিক ফেটে যাবে। ভেতর থেকে কী যেন একটা ভেঙে, মরে, পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছিল পুশকিন। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো সেই মাঝরাতে ছাদে উঠে গিয়েছিল ও। ভাবছিল, আর কী হবে বেঁচে থেকে! কার জন্য বাঁচবে! ছাদের পাঁচিলের ওপর উঠেও পড়েছিল! পায়ের তলায় শূন্যতা। মাথার ওপর অপার অসীম কালো। শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিল পুশকিন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে পেছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। এক হ্যাঁচকায় টেনে নামিয়ে এনেছিল ছাদের মেঝেতে। পুশকিনের গায়ে জোর ছিল না কোনও। কুঁকড়ে, নরম হয়ে ও মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল একদম। ধীরে-ধীরে জ্ঞান হারানোর সময়ে ওর দৃশ্যের মধ্যে, ফোঁটা-ফোঁটা জলের মতো এসে জমেছিল ভাই, বাবা, কানুদা, টুকুদি, মাসি, কাকা, মা…
পরের দিন দুপুরে ঘুম ভেঙেছিল পুশকিনের। দেখেছিল, মা বসে রয়েছে। ওকে চোখ খুলতে দেখে মা বলেছিল, “এই বয়সে তোর বাবাকে তোর জন্য ছাদে উঠতে হয়! তোকে টেনে নামাতে হয় পাঁচিল থেকে! তুই এমন হয়ে গিয়েছিস! শোন, আগে আমায় মেরে তারপর তুই মরবি। এটা মাথায় রাখিস। তাই তোর তাড়া থাকলে বল, আমি এখনই মরছি!”
এখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল পুশকিন। তারপর মুম্বইয়ে চাকরি নিয়েছিল। স্মিতার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। মা, বাবা, ভাই সবাই খুশি ছিল খুব। পুশকিন নিজেকে বুঝিয়েছিল, এই জীবনে সব কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। না-পাওয়াটাও মেনে নিতে হয়। যত পছন্দেরই হোক না কেন কেউ, মানুষকে একসময় মেনে নিতে হয় যে, সে হেরে গেছে। মেনে নিতে হয় এই সম্পর্ক, এই জীবন এইটুকুই ছিল। আর কিছু এর কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া রুবিগুলির মতো, প্রিয় ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে যাওয়ার মতো, সেই সবচেয়ে পছন্দের জামাটার ছোট হয়ে যাওয়ার মতো, মেনে নিতে হয়, সব শেষ! আর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো আমরা পাই এই ধরনের মেনে নেওয়া থেকেই। এই ধরনের সরে আসা থেকেই।
