ও বলেছিল, “দাঁড়া, আগে কফি করি একটু!”
কফি করার সময় আইকা ওর ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখেছিল। তারপর রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “নিজেদের অত বড় বাড়ি। থাকিস না কেন রে ওখানে?”
হেসেছিল পুশকিন। বলেছিল, “আসলে অড আওয়ার্সে জব। তাই বাড়ির লোকের যাতে অসুবিধে না হয় সেজন্য। প্লাস আমার একাই ভাল লাগে।”
আইকা রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছিল এবার। ফ্রিজটা খুলে দেখেছিল ভেতরে কী আছে! বলেছিল, “সব তো দারুণ পরিষ্কার আর সাজানো দেখছি! আমারও একাই ভাল লাগে। শুভ মারা যাওয়ার পরে এতগুলো বছর তো একাই… তাই… আমারও ভাল লাগে এরকম। আর সেইজন্য বুঝতে পারছি না কী করব।”
“কেসটা কী?” কফির একটা বড় মাগ আইকার দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিন।
আইকা কফিটায় একটা চুমুক দিয়ে বলেছিল, “আমায় একজন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, জানিস?”
সোনাঝুরি স্টেশনটা মাঝারি মাপের। চারটে প্ল্যাটফর্ম। ওদের ট্রেন তিন নম্বরে ঢুকেছে। লোকজন কম এখন। কয়েকটা কুকুর এখানে-ওখানে ঘোরাফেরা করছে। একটা পাগল বসে রয়েছে সিমেন্টের সিটের ওপর। পুশকিনের বেশ লাগল। প্ল্যাটফর্মের শেষে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে। কিতকিত।
ওরা লেভেল ক্রসিং-এর দিকে হাঁটতে লাগল। এদিকটা বেশ ঘিঞ্জি। একটা মিষ্টির দোকান আছে। ট্রেন এসেছিল বলে লেভেল ক্রসিং-এর গেট পড়েছিল। এবার সেটা খোলায় গাড়ি সাইকেল, রিকশা, অটো সব মাতালের মতো টলতে-টলতে চলছে। সেইসব বাঁচিয়ে ওরা এগোতে লাগল।
স্মরণ বলল, “আপনারা স্যার আসুন, আমি আগে গিয়ে দুটো রিকশা দেখছি। আর ওখানে গিয়ে বলবেন না রিতুদার কথা। প্লিজ়।”
রিতুদা! হ্যাঁ তার সঙ্গে তো দেখা করেছে পুশকিন। আর দেখেছে লোকটার খাঁই তারকের মতো নয়। সামান্য সময় কথা হলেও, রিতুদা কিন্তু বারবার বলেছে, জুট মিলটা যে আবার নতুন উদ্যমে ওরা চালু করতে চায় সেটা পার্টির হাইকম্যান্ডের ভাল লেগেছে। বলেছে, ‘রিকো গ্রুপ’-এর চিন্তা নেই। তারককে ভয় পেতে হবে না।
এই লোকটা নাকি গুন্ডা ছিল। চোখমুখ দেখলে মনে হয় সেই পদার্থ এখনও রয়ে গিয়েছে ভিতরে। কিন্তু ওর সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেছিল। বলেছিল, কোনও কিছু দরকার হলে যেন বলে। রিতুদার ঘরের বাইরে একটা ছেলেকে দেখেছিল পুশকিন। লম্বা-চওড়া। পেটানো স্বাস্থ্য। কিন্তু মুখটায় একটা অদ্ভুত ইনোসেন্স আছে। দেখেছিল, স্মরণের সঙ্গে ছেলেটা হেসে কথা বলছে খুব। পরে জেনেছিল, এই ছেলেটাই যোগাযোগ করেছিল স্মরণদের সঙ্গে। নাম, মাহির।
পুশকিন আবার একবার নোঈকে দেখল। গম্ভীর। মাটির দিকে মুখ নামানো।
ও আলতো করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আজ?”
নোঈ কিছু না বলে তাকাল শুধু।
পুশকিন বলল, “এমন মুখ কেন?”
“আপনি তা হলে লক্ষ করেছেন?” নোঈর গলায় কেমন একটা রাগ।
“কী হয়েছে?” পুশকিন হেসে ব্যাপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করল।
“আমার আজ খুব ঝগড়া হবে!” নোঈ মুখটা শক্ত করে বলল।
“সে কী, কেন? কার সঙ্গে?” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না।
নোঈ সামান্য থমকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল পুশকিনের দিকে। তারপর বলল, “আপনার সঙ্গে।”
“আমার সঙ্গে? আমি কী করলাম?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল নোঈর দিকে। এ কী বলে মেয়েটা!
পুশকিন আবার বলল, “ওই দ্যাখো, চুপ করে আছে! কী হয়েছে বলবে তো!”
নোঈ তাও কিছু বলল না। সামনে কিছু লোকজন থাকায় ওরা আস্তে হাঁটছে। পুশকিন বুঝতে পারল না ব্যাপারটা কী হয়েছে।
ও বলল, “ঠিক আছে, আমি যা করেছি তা ভুল হয়েছে। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে।”
“না, একদম এসব বলবেন না। সারাটা পথ একবারও আমার দিকে ভাল করে তাকিয়েছেন? একবারও আমার সঙ্গে… আমাকেই কেন বারবার কাছে যেতে হবে? কেন? যাকগে, আমি এখন আর কোনও কথা বলব না স্যার। তা হলে উলটোপালটা কিছু বলে ফেলব! তাই…”
হাঁটতে-হাঁটতে ওরা রিকশা স্ট্যান্ডের কাছে চলে এসেছে। পুশকিন দেখল স্মরণ একটা রিকশায় উঠে ওদের পেছনের রিকশাটায় উঠতে বলছে। পুশকিন কী করবে বুঝতে পারল না। দেখল, নোঈ নিজের কথাটা শেষ না করে স্মরণের পাশে উঠে বসল।
স্মরণ ঘাবড়ে গেল একটু। নোঈ গম্ভীর গলায় বলল, “সরে বোস। আর জামা এমন অর্ধেক গুঁজে রাখিস কেন? ঠিকমতো পরতে পারিস না!”
স্মরণ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “যাঃ শালা, আমি কী করলাম!”
পুশকিন আর কথা বাড়াল না। নোঈ রাগী খুব। জেদও আছে প্রচণ্ড। দেখলে শান্তশিষ্ট মনে হয়, কিন্তু পুশকিন দেখেছে শান্ত মেয়েগুলোই বেশি রাগী হয়! যেমন ছিল স্মিতা। শান্ত কিন্তু রাগী। আচমকা আবার স্মিতার কথা মনে পড়ে গেল পুশকিনের!
সেই গাড়ির ভেতরে স্মিতার পাশে বসে আচমকা ঘাম দিয়েছিল পুশকিনের। কেন কে জানে, নিজেকে আটকাতে পারছিল না ও। যে- কথাটা বলা উচিত নয় সেটাই যেন বেরিয়ে আসতে চাইছিল মুখ দিয়ে! পুশকিন জানত যে, স্মিতার তমালকে ভাল লাগে। তমাল ওকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে স্মিতা সারাক্ষণ ফরম্যালিনে ডুবে থাকা মৃত পায়রার মতো হয়ে থাকে। তবু কেন কে জানে, সেই বৃষ্টির ভেতরে নিজেকে আটকাতে পারেনি পুশকিন। কিছুতেই আটকাতে পারেনি। কে যেন ওর শরীরের ভেতর থেকে কথাগুলো বের করে এনেছিল।
পুশকিন বলেছিল, “আমি তোমার সামনে আসছি না কারণ, এলেই আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি জানি এই কষ্টের শেষ নেই। সমাধান নেই। তাই সরে আছি।”
