“মানে তুই ভাল করেই জানিস!” আইকা ভুরু কুঁচকে অস্থির হয়েছিল সামান্য।
পুশকিন কথা ঘোরানোর জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “কফি খাবি?”
“না, তুই বোস!” আইকা ওর হাত ধরে আবার টেনে বসিয়ে দিয়েছিল, “তুই কী করছিস পুশকিন? যা করছিস ভেবে করছিস তো?”
“মিনিং হোয়াট?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “কী বলতে চাইছিস সোজা করে বল।”
“আবার ঢং করছিস! আগে তো এত ঢং করতিস না? আজকাল কী হয়েছে তোর?” আইকা মাথা নেড়েছিল বিরক্তিতে।
“আমি জানি না। এসব বলতে এসেছিস এত রাতে! আমার কিন্তু কাজ আছে।”
“সোনাঝুরি তো? আমাদের কম্পিটিটর ছিলি তোরা। এত লেট হয়ে গেল প্রজেক্ট যে, আমাদের কোম্পানি বোধহয় আর করবে না কাজটা। তুই তো ইনচার্জ, না?” আইকা জিজ্ঞেস করেছিল।
“প্লিজ় উই শুড নট ডিসকাস জব হিয়ার!”
“আমি তোর ওপর স্পায়িং করতে আসিনি। এসেছি তোকে বলতে যে, মাথায় রাখিস, নোঈর বয়সটা তোর চেয়ে অনেক কম।”
“আরে!” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না, “এসব কী বলছিস তুই?”
“শোন, নোঈ খুব সুন্দরী, যে-কোনও ছেলের মাথা ঘুরে যাবেই। তোরও গেছে। প্লাস তুই তো একা। কাছে থাকিস ওর। ফলে…”
“ওয়েট, ওয়েট,” পুশকিন সামনের দিকে ঝুঁকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “তোর ব্যাপারটা কী? আমি কী করেছি?”
“নোঈর সঙ্গে তুই ইনভলভড নোস? আমি কিন্তু নিজে তোদের দু’জনকে দেখেছি দূর থেকে। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসের একটা রেস্তরাঁয় ঢুকছিলি।”
“এখনও একটা ছেলে আর একটা মেয়ে কোথাও গেলে লোকে এই চোখে দেখে সেটাকে!” পুশকিন হাত নেড়ে ব্যাপারটাকে সহজ করার চেষ্টা করেছিল।
“আমায় বোকা পেয়েছিস? বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখে কি কিছু বোঝা যায় না?”
হেসে ফেলেছিল পুশকিন। আজকাল সবাই এসব কথা কোথা থেকে শেখে কে জানে! বডি ল্যাঙ্গোয়েজ! গত দশ বছরে বাঙালি এত নতুন শব্দ শিখে ফেলেছে যে, তার চোটে চোখে অন্ধকার দেখছে! এটাও তার একটা।
পুশকিন উঠে সামনে খোলা জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। লেকের ওদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। বাইরের অন্ধকারের মধ্যে টিপটিপ আলো জ্বেলে যাচ্ছিল সার সার গাড়ি।
“উঠে গেলি কেন?” আইকা নিজেও উঠে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে, “তোর ভাল লাগে নোঈকে? সোজা উত্তর দিবি। আমি সেদিন দেখেছি, নোঈ কীভাবে তোর গাল থেকে কী একটা সরিয়ে দিয়েছিল। দূরে, গাড়িতে আমি আর মা ছিলাম। নোঈ কারও সঙ্গে এমন করে না। কারও কাছে যায় না। আমি ওকে চিনি। ওর যে তোকে পছন্দ, আমি বুঝতে পারছি। না হলে ও কখনও ওর বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে না!”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারেনি প্রথমে। তারপর বলেছিল, “দেখ, তোকে একটা কথা বলি। আমার জীবনটা সহজ নয়। আমার অতীতটাও নয়। আমি জানি সেটা। আর তাই…”
“তুই কি নোঈকে পছন্দ করিস? সোজা বল। ঘোরাবি না কথা। এই সব বেকার অতীত-টতিত বলবি না। হ্যাঁ কি না বল!” আইকা পুশকিনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কেমন যেন কোণঠাসা করে দিয়েছিল।
পুশকিন সময় নিয়েছিল। আইকার দিকে তাকিয়ে ঘরের নরম আলোর মধ্যে ওর মনের ভাবটা বোঝার চেষ্টা করছিল। কেন এমন রাতে এল আইকা? কী চায় আসলে? এমন করে জেরা করছে কেন?
পুশকিনের হঠাৎ মনে হয়েছিল, এসব কী ভাবছে ও! জীবনে সহজভাবে সত্যিটা বলে দিলে তো আর কোনও ঝামেলাই থাকে না। ও কেন সেখানে এত মাপজোক করছে! কেন এটা-ওটা ভাবছে! আজও তো অনেস্টি ইজ় দ্য বেস্ট পলিসি। সত্যি বললে তো কোনও ল্যাঠাই থাকে না।
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “হ্যাঁ, নোঈকে আমার পছন্দ।”
আইকা স্থির হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “কতদূর এগিয়েছে? মানে…”
“না। কাম অন! কী ভাবছিস তুই আমাকে!” পুশকিন বিরক্ত হয়েছিল।
আইকা বলেছিল, “আজকাল তো প্রেম আর ওসব আলাদা আলাদা। আমরাও ইউরোপিয়ান হয়ে গিয়েছি! তাই… আসলে কী জানিস দু’জনকে দেখলে বোঝা যায় যে, তারা কতটা ইন্টিমেট হয়েছে। তাই…”
“তুই এসব বলতে এসেছিস?”
আইকা থেমেছিল সামান্য সময়। যেন কিছুটা নিজের সঙ্গেই মনে মনে একটা তর্ক চলছিল ওর।
পুশকিন বলেছিল, “দেখ, আমি এমন কিছু করব না যাতে নোঈর ক্ষতি হয়। কাকু-কাকিমাকে বলিস এসব কিছু নয়। আমাদের তো কাউকে না কাউকে মনে মনে ভাল লাগেই। কিন্তু আমাদের তো বুঝতেও হয়, কী সম্ভব আর কী সম্ভব নয়। আমি জানি কী সম্ভব নয়। আমি এমন কিছু করব না, যাতে কারও ক্ষতি বা সম্মানহানি হয়!”
আইকা মন দিয়ে শুনেছিল কথাটা। তারপর বলেছিল, “আমি জানি। তাই তোকে সরাসরি এসে ধরলাম। আসলে নোঈ মনে হচ্ছে সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে। তবে শুধু এটা নয়…আসলে… আর-একটা কথা। আমার নিজের কথা। আমি যে কাউকে জিজ্ঞেস করব… তেমন কেউ নেই। তাই সেটা বুঝতে পারছি না। আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।”
পুশকিন অবাক হয়ে গিয়েছিল। আইকা সমস্যায় পড়ে ওর কাছে এসেছে কেন! তেমন তো কিছু বন্ধুত্ব নেই ওদের। মানে, পুশকিনের দিক থেকে তো নেই অন্তত। কিন্তু কেউ যদি এভাবে কিছু বলতে চায়, তা হলে মানুষ আর কী করবে! পুশকিন জানে, কারও কথা শোনাটাও খুব দরকার। মানুষ যত এগোচ্ছে, যত যোগাযোগের টেকনোলজি বাড়ছে, তত দ্বীপের মতো হয়ে যাচ্ছে মানুষ— টাওয়ার অব ব্যাবেল যেন! আইকার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খারাপ লেগেছিল পুশকিনের। মেয়েটার জীবনটা তো খুব কিছু সুখের নয়!
