“স্যার, পরের স্টেশনটায় নামব,” স্মরণের কথায় ফিরে তাকাল পুশকিন। ওর সিটের উলটোদিকে বসে রয়েছে স্মরণ। আর স্মরণের পাশে বসে আছে নোঈ।
দুপুরের ট্রেন। ভিড় নেই তেমন। শিয়ালদহ থেকে বসার জায়গা পেয়ে গিয়েছিল ওরা। পুশকিন ঘড়ি দেখল। প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। গাড়িতে এলে কি আরও তাড়াতাড়ি হত না!
স্মরণ দেখল, পুশকিন ঘড়ি দেখছে। ও বলল, “ট্রেনে তাড়াতাড়ি হল স্যার। সোনাঝুরির যাওয়ার রাস্তায় ফ্লাইওভার হচ্ছে। ওটা স্যার এখন আর রাস্তা নেই। ছোট গাড়ি গেলে উলটে যাবে নির্ঘাত। কী সাংঘাতিক যে অবস্থা! গাড়িগুলো পুরো র্যাফটিং-এর মতো করে দুলতে-দুলতে যায়। হয় আপনার শিরদাঁড়া পৌঁছবে নয়তো আপনার কোমর পৌঁছবে! দুটো কিছুতেই এক সঙ্গে পৌঁছবে না। তাই বললাম ট্রেনে চলুন।”
ট্রেনে যেতে অসুবিধে নেই পুশকিনের। বরং ভালই লাগছে। শীতের দুপুর। মফস্সলের ছোট ছোট স্টেশন। ট্রেনে ওঠা নানা ধরনের হকার। লজেন্সওয়ালা, বাদামওয়ালা, হজমের গুলি বিক্রেতা। কতদিন পরে এদের দেখছে পুশকিন! হ্যাঁ, এখানে ট্রেনগুলো একটু নোংরা, যেসব মানুষ ওঠে, তাদের অনেকেরই হাইজিন ভাল নয়। কিন্তু তাও বেশ লাগছে পুশকিনের। শিয়ালদা থেকে কুড়ি কিলোমিটার যাওয়ার পরেই কেমন যেন শহরটা ফুরিয়ে গেছে। বেশ বড় বড় ধানখেত। দিঘি। কলাবন। পুকুর ঘিরে ভিড় করে আসা তালবাগান। কতদিন পরে এসব দেখছে পুশকিন! জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে। এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল। শীতের রোদ কমলা রাংতার মতো ছড়িয়ে আছে জানলার পাশে। মাঝে মাঝে বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। খড়-ছাওয়া মাটির বাড়ি। টিনের ছাদওয়ালা ইটের বাড়ি। ফাঁকা খেতে ক্রিকেট খেলছে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে। কোথাও মাইক বাজছে। রাস্তার ওপর লেবেল ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে আছে টেম্পো, ম্যাটাডোর, সাইকেল। নানা পাখি উড়ছে। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে পাশের মেঠো পথ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে ছোট মেয়ে। আর এইসব ছাড়িয়ে ঝমঝম করে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। রেলগাড়ি। পুশকিনের আবার নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে!
“স্যার, নেমে রিকশা নিয়ে নেব। ওঁর অফিসটা একটু দূরে,” স্মরণ বলল।
পুশকিন বলল, “তুমি এত চিন্তা করছ কেন? ঠিকই সব হবে। ডোন্ট ওয়ারি।”
স্মরণ হাসল। পুশকিন দেখল, নোঈ চুপ করেই আছে। বেশ শব্দ হচ্ছে ট্রেনের। ধাতব ঝমঝমের ওপর গলা তুলে কোনও কথা বলাই মুশকিল। তাই নোঈ হয়তো চুপ করে আছে। কিন্তু পুশকিনের মনে হল আরও কিছু ব্যাপার ঘটেছে। আজ সকাল থেকেই মেয়েটা কেমন চুপচাপ। কথা কম বলছে। তবে পুশকিনও ঘাঁটাচ্ছে না। আন্দাজ করছে বাড়িতে কোনও ঝামেলা হয়েছে। মানে, সেই সম্ভাবনাই তো বেশি। সেদিন আইকা এসে যা বলে গিয়েছে, তাতে অন্তত সেটাই মনে হচ্ছে পুশকিনের।
বহুদিন পরে আইকাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল পুশকিন। আইকা নিজের গাড়ি নিয়েই এসেছিল ওর ফ্ল্যাটে। পুশকিন ভেবেছিল, হঠাৎ কেন এল মেয়েটা! কোনও দরকার আছে কি? তা ছাড়া এখানে তো আগে আসেনি? তা হলে আইকা জানল কী করে এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা? ও তো নিজে বলেনি কোনওদিন!
“ভেতরে আসতে বলবি না?” আইকা তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে।
পুশকিন সদ্য অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক পালটে ল্যাপটপটা নিয়ে বসেছিল। বুদাপেস্টের কাজটার কিছু কারেকশন ছিল। সেটা শেষ করে দু’দিনের মধ্যে জমা দিতে হত, তাই টেনশন ছিল একটু।
নিজের অজান্তেই হাতঘড়ির দিকে চোখ চলে গিয়েছিল পুশকিনের। রাত ন’টার সময়ে এখানে কী করছে মেয়েটা!
ও সরে দাঁড়িয়েছিল দরজা থেকে। আইকা ঘরে ঢুকেছিল। হাতব্যাগটা সোফার ওপর রেখে সময় নিয়ে ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল গোটা ঘরটা।
প্রায় আড়াই হাজার স্কোয়ার-ফিটের ফ্ল্যাট। বসার ঘরটাও বেশ বড়। পুশকিন ছিমছাম জিনিস পছন্দ করে। তাই ঘরটাকেও সেইভাবেই সাজিয়েছে। একটা ছোট টেবিল ল্যাম্প জ্বলছিল শুধু ওর কাজ করার জায়গাটায়। তার কমলা রঙের আলো কেমন যেন ছড়িয়ে, মিশে যাচ্ছিল মেরুন অন্ধকারে।
আইকা একটা সিঙ্গল সোফায় বসেছিল। তারপর বলেছিল, “কী রে, বোস। তুই নিজের বাড়িতেই আছিস।”
পুশকিন হেসেছিল সামান্য। দু’পা এগিয়ে বসেছিল সামনের একটা চেয়ারে। বলেছিল, “তুই হঠাৎ এমন আন-অ্যানাউন্সড?”
“আমি কোথাকার রাজা যে, আসার আগে সবাইকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলে আসতে হবে? জানি তুই বিরক্ত হচ্ছিস। কিন্তু আমি কাজেই এসেছি!”
“বিরক্ত হব কেন?” পুশকিন হেসেছিল আবার।
“শোন, আমি কি কিছুই বুঝি না! ফালতু ঢং করিস না। আমি জানি ক্লাস টুয়েলভের সেই ব্যাপারটা তুই ভুলতে পারিসনি। কিন্তু এটা একবারও ভেবে দেখিসনি যে, আমারও বয়স তখন কত কম ছিল! আমারও ভুল হতে পারে। একটা ব্যাপারের জন্য এখনও এতটা হেট্রেড কেন পুশকিন?”
“হেট্রেড!” ভুরু তুলেছিল পুশকিন, “হেট ইজ় আ স্ট্রং ওয়ার্ড! সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।”
“তা হলে? হোয়াই ডু ইউ অলওয়েজ় রান আওয়ে ফ্রম মি?”
“আমি কারও কাছ থেকে পালাই না আইকা। আমি এমনই। কী করব বল। সবার কাছ থেকে সরে থাকি আমি। আয়্যাম আ লোনার আই গেস। আই লাইক টু স্টে আওয়ে।”
“এত অসামাজিক! কিন্তু সবার সঙ্গে তো নয়!”
“অসামাজিক হলে অসামাজিক! আর সবার সঙ্গে নয় মানে?” পুশকিন হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠেছিল। আইকার কথাটা কোনদিকে বাঁক নিচ্ছে!
