এইসব কথা প্রায়ই বলত স্মিতা। পুশকিনের কষ্ট হত খুব। মনে হত, কে যেন বুকের মধ্যে বসে মাটি কোপাচ্ছে! কিন্তু তাও ও শুনত। স্মিতা যে ওর কাছে আসছে, ওর পাশে বসছে, ওকে ব্যক্তিগত কথা বলছে সেসব ভেবেই নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু সত্যি কি আর খুশি হত? হত না। বরং ক্রমে বুকের মধ্যে বিষ জমছিল ওর। মনে হচ্ছিল রক্তের মধ্যে মিশে যাওয়া এই বিষ ওকে পাগল করে দেবে!
তাই একদিন ও ঠিক করে নিয়েছিল, আর নয়। আর স্মিতার কাছ থেকে তমালের কথা শুনবে না। বরং স্মিতার সঙ্গে আর কথাই বলবে না। সামনে থেকেও যে-মেয়েটা ওর হবে না কোনওদিন, তার ওপর মায়া বাড়িয়ে কী লাভ! মানুষ নিজেকে যদি সুখ দিতে না-ও পারে, নিজেকে কষ্ট দেওয়ারও কোনও মানে হয় না।
স্মিতা চাকরি করত ওই বিল্ডিং-এরই অন্য একটা সফ্টওয়্যার ফার্মে। টিফিনে দেখা করত ওরা। আর ছুটির পরে একসঙ্গে ফিরত।
এই সিদ্ধান্তের পরের দিন আর টিফিনে পুশকিন গেল না বাইরে। ছুটির পরও ফিরল না একসঙ্গে। একদিনটা তারপর দু’দিন হল। দু’দিনটা চারদিন। আর চারদিন ঘুরে গেল এক সপ্তাহে। পুশকিন আর সামনেই যেত না স্মিতার।
তারপর একদিন কলকাতায় বৃষ্টি হল খুব। সবকিছু ডুবে গেল চারিদিকে। শুধু দ্বীপের মতো জেগে রইল অফিসের কাছের একটা বাসস্টপ আর ফুটপাথ।
তারই একটায় দাঁড়িয়ে সেদিন পুশকিন চেষ্টা করছিল কী করে বাড়ি ফেরা যায়। সন্ধে হয়ে এসেছিল প্রায়। অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল! আকাশে কাকের পালকের মতো রঙের মেঘ এসে জমছিল ক্রমে। সারা দিনের কাজের পর পুশকিনের আর কিছু ভাল লাগছিল না। স্মিতার কাছ থেকে সরে এলেও মনে মনে যে সরে আসতে পারেনি, সেটা বুঝতে পারছিল প্রতিমুহূর্তে। শূন্যতাও যে এমন ধারালো হয়, সেটা ভাবতে পারেনি কোনওদিন। সারাক্ষণ কেমন একটা অনিচ্ছে আর বিষাদ যেন মুড়ে ছিল ওকে। দম দেওয়া পুতুলের মতো ঘুরতে-ঘুরতে সেদিন ওই ছোট্ট দ্বীপের মতো বাসস্টপে দাঁড়িয়ে, ওরকম ঝিমধরা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে কেমন অপ্রয়োজনীয় আর ফালতু মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পুতুলের দম এবার ফুরিয়ে এল প্রায়! আর চলতে পারবে না। আর তখনই জল কেটে একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে।
কোমর অবধি জল ছিটকে এসেছিল পুশকিনের। খুব বিরক্ত হয়েছিল ও। ভেবেছিল কিছু বলবে। কিন্তু তার আগেই পেছনের দরজার কাচটা নামিয়ে বেরিয়ে এসেছিল একটা মুখ। স্মিতা! বলেছিল, “আর বাহাদুরি না দেখিয়ে উঠে এসো গাড়িতে।”
পুশকিন দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল। কেন কে জানে, আচমকা এক আকাশ মেঘের মতো অভিমান এসে ভিড় করেছিল ওর মনে।
“কী হল, এসো!” স্মিতা এবার ধমক দিয়েছিল। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তাকাচ্ছিল ওদের দিকে। অফিসের দু’-চারটে পরিচিত মুখও ছিল সেই বাসস্টপে। তারাও তাকাচ্ছিল। তবে সেই সব লোকজন বেশি দেখছিল স্মিতাকেই। মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল পুশকিনের। হিংসের সবুজ দৈত্য কামড় দিয়েছিল ওর বুকে।
যদিও মনের ভেতরে দুটো পুশকিনের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। একজনের যেমন হিংসে হচ্ছিল, তেমন আর-একজনের মনে হচ্ছিল, পুশকিন না এর থেকে সরে আসতে চাইছে! তা হলে! তা ছাড়া স্মিতা তো সারাক্ষণ ‘তমাল, তমাল’ করে কানের মধ্যে তমালগাছের জঙ্গল তুলে দিল! তা হলে কে ওকে দেখছে, কে দেখছে না তাতে পুশকিনের কী এসে গেল!
মানুষের মাঝে মাঝে কীসে যে কী এসে যায় তার উত্তর মানুষের নিজের কাছেও থাকে না!
“কী হল? নেমন্তন্নের কার্ড ছাপাতে হবে?” স্মিতা ধমক দিয়েছিল এবার।
পুশকিন আর কিছু না ভেবে, মনের মধ্যে পাকিয়ে ওঠা ঝগড়াটাকে মুলতুবি রেখে উঠে পড়েছিল গাড়িতে। আর তখনই আবার বৃষ্টি নেমেছিল ঝেঁপে!
গাড়িটা চলছিল বৃষ্টিতে আবছা একটা শহরের মধ্য দিয়ে। চারদিকের কাচ তোলা ছিল। সামনে বৃদ্ধ চালক একমনে তাকিয়ে ছিল পথের দিকে। পুরনো ওয়াইপারের ঘটঘট শব্দ আর ট্যাক্সির চালে ঝামরে পরা পিটার-প্যাটারের মধ্যে পুশকিন বসেছিল মাথা নিচু করে।
স্মিতা ওর কাঁধ ধরে জোর করে ঘুরিয়েছিল নিজের দিকে। তারপর রাগের গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে তোমার? আমায় এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? আমি কী করেছি? বলো। কী হয়েছে আজ বলতেই হবে!”
পুশকিন তাও মাথা নিচু করে বসেছিল। কিছু বলছিল না।
স্মিতা এবার ওর থুতনি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়েছিল জোর করে, “কী হল, বলো? এমন করছ কেন?”
পুশকিন এবার তাকিয়েছিল স্মিতার দিকে। বুকের ভেতরে কেমন একটা বেলুন ফুলছিল যেন। আটকে আসছিল দম। কষ্ট হচ্ছিল ওর। মনে হচ্ছিল বেলুনের সঙ্গে ও নিজেও হয়তো বোমার মতো ফেটে পড়বে! ওর গা ঘেঁষে বসেছিল স্মিতা। পারফিউমের ছোট ছোট ফুল ঝরে পড়ছিল স্মিতার প্রতিটা নিশ্বাসের সঙ্গে। ক্রমশ অবশ হয়ে আসছিল পুশকিন। বুঝতে পারছিল এমন ঘূর্ণিতে ও পড়ে গিয়েছে, যেখান থেকে ওর বেরোনোর আর কোনও উপায় নেই!
“আচ্ছা, আর কিচ্ছু বলতে হবে না,” স্মিতা আচমকা ঘুরে বসেছিল।
পুশকিন ছিটকে উঠেছিল। ওর বুকের ভেতরের চুপ করে থাকা ছেলেটা এবার চাপা পড়া পিঁপড়ের মতো হাত-পা ছুড়ছিল। এ কী হল! স্মিতা রাগ করল নাকি! ঘাবড়ে গিয়েছিল পুশকিন। বেশি টেনে ফেলেছে কি নিজের মনখারাপটা? কাঙালের মতো করে উঠেছিল মনটা! আর নিজেকে আটকাতে পারেনি পুশকিন। মাথা নিচু করে বলেছিল, “বলছি তো! অত রাগ করো কেন?”
