“কী বলছ!”
মা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সেই জন্য তোকে চাকরি দিয়েছে! কচি মেয়েদের মাথা খেতে ভাল লাগে! আর তুই! তুইও তার সঙ্গে হোটেল-রেস্তরাঁ করে বেড়াচ্ছিস!”
“মানে? আরে, যা খুশি তাই বলে যাচ্ছ!” কী বলবে বুঝতে পারল না নোঈ।
“কেন কিছুদিন আগে তুই ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসের ওখানে ওর সঙ্গে একটা রেস্তরাঁয় যাসনি? বিকেলে? তুই কি ভাবিস কলকাতায় সবাই অন্ধ? কেউ কিছু দেখে না?”
নোঈ দেখল বাবা চুপ করে বসে আছে। মায়ের রাগ যেন বাড়ছে আরও।
মা বলল, “তোর দিদি সম্বন্ধ পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। এবার তোকে বিয়ে দিয়ে দেবই। অনেক হয়েছে চাকরি। আর করতে হবে না কাজ। কাজের নাম করে কী হচ্ছে যেন বুঝতে পারছি না!”
“কে বলেছে তোমায় এসব?” নোঈ চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল।
“যে বলেছে, সে দেখেই বলেছে। কাক চোখ বন্ধ করে গু খেয়ে ভাবে কেউ দেখছে না। কিন্তু সবাই দেখে। তোকেও দেখেছে। ছিঃ, তুই এভাবে আমাদের মুখে চুনকালি মাখাচ্ছিস! শেষে একটা আধবুড়ো…”
নোঈর সারা গা-হাত-পা কাঁপছে রাগে। বিকেল। রেস্তরাঁ। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনস। ওকে কে দেখেছে ও জানে। ভিড়-রাস্তার অন্য ফুটে কিছুটা দূরে ছিল নোঈ। কিন্তু তাও ওর চোখ এড়ায়নি। মা বলে যাচ্ছে এখনও, কিন্তু ওর আর কিছু মাথায় ঢুকছে না। কান লাল হয়ে গিয়েছে নোঈর। বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে! আর ওর চোখের সামনে ভাসছে সেই বিকেলটা। ভাসছে, রাস্তা টপকে একটু দূরে একটা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আইকা।
.
৩২. পুশকিন
সেদিন মেঘ ছিল আকাশে। গাছের ছায়া আরও একটু বেশি ছায়াময় ছিল যেন। উলটো ফুটের বিশাল বড় বিল্ডিংটাকে রাক্ষস মনে হচ্ছিল পুশকিনের। মনে হচ্ছিল একটু পরেই এটা সামনে ছড়ানো মানুষগুলোকে আবার গিলে নেবে! হাতে ধরা স্যান্ডউইচের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পুশকিনের নিজেকেও তেমনই একটা খাবার মনে হয়েছিল।
আর ঠিক তখনই কান্নার শব্দটা ভেসে এসেছিল গাছের অন্যদিক থেকে। কে কাঁদছে এভাবে? পুশকিন ডান দিকে তাকিয়েছিল। রাস্তার এই দিকটায় সারি-সারি পাম গাছ। তার মাঝে কয়েকটা সবুজ রঙের বেঞ্চ পাতা ছিল। পুশকিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে পাশের বেঞ্চটা গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। কান্নার আওয়াজ শুনে পুশকিন দু’পা পিছিয়ে গিয়ে উঁকি দিয়েছিল। আর প্রথম দেখেছিল ওকে। স্মিতাকে।
হাতে একটা স্কার্ফ। তাতে মুখ গুঁজে কাঁদছে স্মিতা। পিঠ ফুলে-ফুলে উঠছিল ওর। পাশের বেঞ্চে রাখা খাবারের প্লেটটা পড়ে ছিল অবহেলায়। কী করা উচিত এখন? পুশকিন তাকিয়েছিল। তাকিয়েই ছিল। স্মিতা মুখ তুলেছিল কিছু সময় পরে। আর থমকে গিয়েছিল পুশকিন। এ মেয়ে এমন করে কাঁদছে! ওর মনে হয়েছিল মাখন থেকে ছুরি দিয়ে কেটে মেয়েটার মুখ বের করে এনেছেন ভগবান! পুশকিন হাঁ করে তাকিয়েছিল স্মিতার দিকে। এমন খাড়া আপ-টার্ন নাক! এমন বড়-বড় চোখ! চোখের পাতা! এমন গায়ের রং! এমন মেয়েরা কাঁদলে তো পৃথিবীতে ন্যায়বিচার বলে আর কিছু থাকবে না!
পুশকিন কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু কিছু একটা করতে ওর ইচ্ছে করছিল খুব। এভাবে কারও দিকে অসভ্যের মতো তাকিয়ে থাকতে নেই ও জানে। কিন্তু তাও নিজেকে কিছুতেই আটকাতে পারছিল না। তাকিয়েই ছিল স্মিতার দিকে। এই ক’দিন আসছে এই অফিসে, কিন্তু এই মেয়েটাকে তো আগে দেখেনি! রাক্ষস কোন কুঠুরিতে আটকে রেখেছিল একে!
স্মিতা এবার ঘুরে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মেয়েটার ঠোঁটের ওপর একটা তিল আছে। পুশকিনের মনে হয়েছিল মাটির মধ্যে যেন আরও কয়েক ফুট গেঁথে গেল ও!
স্মিতা কিছু না বলে তাকিয়েছিল সোজা। মেঘ ছিঁড়ে একটা রোদের স্তম্ভ যেন নেমে এসেছিল স্মিতার দিকে। স্পটলাইট! পুশকিন বুঝতে পারছিল, ওর জীবনটা আজকে, এই দিন থেকে পালটে গেল একদম।
স্মিতা কিছু জিজ্ঞেস করার মতো অবস্থায় ছিল না। শুধু কষ্টে নুইয়ে আসা চোখ নিয়ে ও তাকিয়েই ছিল। সব পুরুষের বুকের ভেতরে ছোটবেলা থেকে যে-ছদ্মবেশী রাজপুত্রটা বসে থাকে, যে কোনও একদিন কাল্পনিক দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচাতে চায় রাজকুমারীকে, সেই রাজপুত্রটা বেরিয়ে এসেছিল পুশকিনের বুকের ভেতর থেকে। তবে কোমর থেকে তরোয়াল বের করে নিয়ে নয়, বাঁ হাতে ধরা ছোট জলের বোতলটা বাড়িয়ে স্মিতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল পুশকিন।
স্মিতা সময় নিয়েছিল সামান্য। তারপর হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল জলের বোতলটা। কোনও কথা বলতে পারছিল না পুশকিন। ও শুধু তাকিয়ে ছিল। স্মিতা সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে জল দিয়েছিল চোখে-মুখে। তারপর ফিরিয়ে দিয়েছিল বোতলটা। পুশকিন যন্ত্রচালিতের মতো বোতলটা ফেরত নিয়েছিল। তারপর অন্য হাতের স্যান্ডউইচটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
স্মিতা তাকিয়ে ছিল সামান্য সময়। চোখে বিস্ময়। কিন্তু তারপর পুশকিনকে চমকে দিয়ে হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল স্যান্ডউইচটাও। পুশকিন আর কিছু না বলে পায়ে-পায়ে গিয়ে বসে পড়েছিল পাশে।
সেই শুরু। তারপর তিনবছর স্মিতার সঙ্গে ঘুরেছিল ও। স্মিতা সমস্ত কথা বলত পুশকিনকে। ওর বাবার ছোটবেলায় মারা যাওয়ার কথা। তার কাকাকে মায়ের বিয়ে করার কথা। স্কুলের কথা। প্রথম প্রেমের কথা। বলেছিল ওর সমস্ত কান্নার কথাও। পরে একদিন, বেঞ্চে বসে সেই কান্নার কথাটা বলতে গিয়ে স্মিতা বলেছিল, “তমাল আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ছ’বছরের রিলেশন ছিল আমাদের। সেখানে আমায় ছেড়ে ও অন্য একজনকে বিয়ে করে নিল! বাবা মারা যাওয়ার পরে, আমার মা আমার কাকাকে বিয়ে করেছে শুনে, ওদের বাড়ির লোকজন ওকে সরে আসতে বলেছিল আমার কাছ থেকে। ওর মা আর বাবা খুব অশান্তি করেছে সেই ব্যাপারে। তাই তমাল আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। একবারও আমার কথা ভাবেনি। আমি যে ওকে ছাড়া থাকতে পারব না, তাও মনে রাখেনি। যেসব কথা দিয়েছিল, প্রমিস করেছিল সব ভুলে গিয়েছিল নিমেষে।”
