বস ফোনটা শেষ করে চুপ করে বসেছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর ওদের বসতে বলে চলে গেছিলেন নিজের চেম্বারে।
সবাই এই ঘরে চুপচাপ বসেছিল। নোঈ বুঝতে পারছিল যে, টেনশনের একটা চোরাস্রোত বইছে। এখানে কোনও কথা বলা ঠিক হবে না।
স্মরণ জলের বোতল থেকে জল খেয়ে হাত দিয়ে নিজের চুল ঠিক করার চেষ্টা করেছিল।
পুশকিন এর ভেতরেও হালকা গলায় বলেছিল, “ছেড়ে দাও, ও ঠিক হবে না!”
বস ফিরে এসেছিলেন দশ মিনিট পরে। তারপর পুশকিনের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “লাস্টলি আর-একবার ট্রাই করি! আমি বোর্ড থেকে আরও দু’-আড়াই মাস টাইম নিয়ে এসেছি। তার মধ্যে কি তুমি ব্যাপারটা করতে পারবে?”
“আমি পারব ম্যাম,” আপন এবার নিজের নাকটা গলিয়ে দিয়েছিল।
“তোমায় জিজ্ঞেস করেছি? নিজের কাজটা কি পারো? ফলতার কাজটাও তো ড্র্যাগ করতে শুরু করেছে। সো স্টে আউট অফ ইট!”
“আমি পারব ম্যাম,” পুশকিন সোজা তাকিয়েছিল বসের দিকে।
সামনে খোলা ট্যাবের ওপর আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে বস বলেছিলেন, “ইউ বেটার ডু সামথিং। সামনে তোমাকে আর-একটা প্রজেক্টে আমরা ডিপ্লয় করব। বাট এটা আপাতত টপ প্রায়োরিটি। ইউজ় এভরি মেথড। লিভ নো স্টোন আনটার্নড। তুমি জানো হোয়াট মে কাম হ্যান্ডি!”
স্মরণ নেমে গিয়েছে রাসবিহারীতে। কী একটা নাকি কাজ আছে! কী কাজ আর নোঈ জিজ্ঞেস করেনি। করলেই হয়তো বলবে প্যাঁওয়ের জন্য কিছু কিনতে হবে!
বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড়াল। নোঈর খারাপ লাগছে। ও পুশকিনকে বলেছিল যে, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে পুশকিন আগে নেমে যাক। গাড়ি তো আছে, ও চলে যেতে পারবে। কিন্তু পুশকিন শোনেনি ওর কথা। তবে বাকি পথটা কথাও বলেনি তেমন। এমনকী, একবারও নোঈর হাতটাও ধরার চেষ্টা করেনি। গাড়ি তো ফাঁকা, তা হলে কেন!
নোঈর খারাপ লাগছে। পুশকিন কেন এমন দূরে-দূরে থাকছে! তা হলে কেন সেদিন চুমু খেয়েছিল! সেটা কি তা হলে একটা ফ্লিটিং ফিলিং! একটা ইমপাল্স! ছেলেরা কি এমনই হয়? এমন স্বার্থপর, শরীরসর্বস্ব? পুশকিনের ইচ্ছে করছিল বলেই কি কাছে এসেছিল? এতে নোঈর যে খারাপ লাগতে পারে, সেটা কি একবারও ভাবেনি?
আচমকা মনের মধ্যে কেমন একটা অভিমান জন্মাচ্ছে নোঈর। মনে হচ্ছে, ও তো বারবার কাছে যাচ্ছে। কেয়ার দেখাচ্ছে। পুশকিন কেন এমন দূরে ভেসে ভেসে আছে!
নোঈ সারাটা পথ আর কথাই বলেনি। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। একবার মনে পড়েছিল আপনের কথাগুলো। ও জানে আপন জেলাস। তাই এসব নোংরামো করেছে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য এখন মনে হল, এসব যদি সত্যি হয়!
গাড়ি থেকে নেমে আর পিছন দিকে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছিল নোঈ।
“কী হল?” ডাকল পুশকিন।
নোঈ মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
পুশকিন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে নোঈর জ্যাকেটটা ঠিক করে দিয়ে চাপা গলায় বলল, “গাড়িতে ড্রাইভার আছে। অমন রাগ করে না।”
“গাড়িতে আছে, সব জায়গায় থাকে না কিন্তু!” নোঈ বলতে চায়নি, কথাটা কেমন যেন বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।
“আই লাইক ইউ সো মাচ, গার্ল। ইউ আর সো প্রিটি! আর এত ভাল তুমি! ইট ইজ় হার্ড টু রেজ়িস্ট। কিন্তু তুমি আমার চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট। অ্যান্ড আই হ্যাভ আ পাস্ট নোঈ। তোমায় কী যে বলি! আমি… ”
আলতো কুয়াশা পড়ছে শহরে। ফিনফিনে একটা ওড়না কে যেন আস্তে-আস্তে নামিয়ে আনছে কলকাতার মাথায়। চারিদিক যেন পুরনো বাংলা ছবির মতো সাদা-কালো হয়ে আছে। নোঈ তাকাল পুশকিনের দিকে। আলোছায়ায় কেমন যেন রহস্যময় লাগছে ওকে। ছোট্ট ঠোঁট। টিকালো নাক। হাসলে সামান্য টোল পড়ে এমন গাল। নোঈর মনে হল ও আলাদা থাকতে পারছে না যেন।
নিজেকে অনেক কষ্টে আটকাল ও। তারপর ফিসফিস করে বলল, “সবার একটা পাস্ট থাকে। আয়্যাম নট ইন্টারেস্টেড ইন দ্যাট! শুনুন, এই প্রজেক্টের পরে যেখানে যাবেন, আমায় নিয়ে যাবেন। আমি একা থাকব না কলকাতায়!”
পুশকিন হাসল।
নোঈ আবার বলল, “আর-একটা কথা। আমার বাড়ির সামনে এটা। এখানে এই আফটার শেভটা মেখে আমার এত কাছে আসবেন না। বুঝলেন? আমি আসি।”
আর অপেক্ষা না করে, নোঈ প্রায় দৌড়ে ঢুকে গেল ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে। কিন্তু মনে মনে যেন দেখতে পেল, আলতো কুয়াশার মধ্যে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুশকিন। আলো-ছায়ায় ওর কিছুটা দেখা যাচ্ছে। কিছুটা দেখা যাচ্ছে না!
বাড়িতে ঢুকে ব্যাগটা নিজের ঘরের বিছানায় ছুড়ে রাখল নোঈ। তারপর বাথরুমে ঢুকে গিজারের সুইচটা অন করে দিল। রাত হলেও, স্নান না করলে আজ অসুবিধে হবে ওর।
ও দেখল ওকে দরজা খুলে দিয়ে বাবা আজ বসার ঘরেই বসল। আশ্চর্য হল নোঈ। বাবা এখানে কেন? নিজের ঘরে থাকে তো এমন সময়! খুব একটা বেরোয় না।
“নোঈ, শোন,” মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ডাকল এবার।
নোঈ ভেবেছিল মুখটা একটু ধুয়ে তারপর স্নান করতে যাবে। কিন্তু মা এমন করে ডাকল যে, ও থমকে গেল। মায়ের গলার ভেতরে আজ কিছু একটা আছে। অশান্তির গন্ধ পাচ্ছে ও! সারা দিন পরে নোঈর আর ভাল লাগছে না এসব। আজ আবার কী শুরু করবে মা!
“বলো,” মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নোঈ।
“তুই শেষপর্যন্ত ওই দোজবরের সঙ্গে ঘুরছিস!”
“কী? মানে?” নোঈ তাকাল অবাক হয়ে। কী বলছে মা!
“ওই পুশকিন। ওর বউ তো মারা গিয়েছে। জানিস না? তোর চেয়ে কত বড়! তার সঙ্গে তুই… এত রাত করে তোকে বাড়ি ছাড়তে আসছে। মাথায় মাথা ঠেকিয়ে কী এত গুজগুজ করছিলি, হ্যাঁ? আমাদের এই পাড়ায় থাকতে দিবি না? মানসম্মান কিছুই কি রাখবি না?”
