স্মরণ সব শুনে চুপ করে ছিল একটু। তারপর বলেছিল, “আমরা জুনিয়র। অফিসে গিয়ে বলব আপনার কথা। আমাদের হাতে তো কিছু নেই!”
মাহির উঠে দাঁড়িয়েছিল। ছেলেটার হাইট ভাল। শরীরটাও পেটানো। নোঈর মনে হয়েছিল ব্যায়াম-ট্যায়াম করে নিশ্চয় ছেলেটা। স্পোর্টসম্যান টাইপ।
মাহির বলেছিল, “আপনারা সিরিয়াসলি কথাটা ভাবুন। অফিসে গিয়ে বলুন। রিতুদা কিন্তু সিরিয়াস এই ব্যাপারে! আমি তা হলে রিতুদাকে বলছি যে, আপনারা যোগাযোগ করছেন। কেমন! আপনাদেরই কিন্তু লাভ। মনে রাখবেন! আসছি।”
পুশকিন নাক টানল। জ্যাকেটের চেনটা গলা অবধি টেনে দিয়ে বলল, “আবার কেন ফোন করছে! আমি তো গিয়েছিলাম রিতুদার সঙ্গে কথা বলতে। বলেছি, সময়মতো নিশ্চয় জানাব। এরা কেউ একটা কথা বুঝতে পারছে না যে, আমার হাতে কিছু নেই। বসও বুঝতে পারছেন না, পলিটিক্যাল পার্টির লোকজনও বুঝতে পারছে না। আরে, দীপমালাদেবী যদি এমন জেদ ধরে বসে থাকেন যে, বাড়ি বিক্রি করবেন না, তা হলে আমি কী করতে পারি!”
নোঈ বলল, “আমি তো শুনলাম ‘মুছাল গ্রুপ’ নামে একটা কোম্পানি নাকি ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে। পেপারে পড়ছিলাম। তারা আবার জোনাক-বাড়ি ছাড়াই কিনবে বলছে সব কিছু। আপনি কিছু জানেন?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “আমি শুনেছি, কিন্তু শিয়োর নই। আসলে আমাদের যে-ভিশনটা আছে ওই জায়গা নিয়ে, সেটা কিন্তু ইউনিক। আমাদের কোম্পানির প্রেস্টিজ বাড়ত এতে। কাউকে আপরুট না করে সব কিছু ঠিক করে সেখানে আবার নতুন করে সিটি বিল্ডিং ইজ় আ বিগ জব। জোনাক-বাড়ি তো প্রায় দশ বছর হল ডেজ়ার্টেড। তাও কেন যে ওই মহিলা সেটা ছাড়তে চাইছেন না! এটা আমার কাছে একটা মিস্ট্রি কিন্তু!”
স্মরণ যেন কিছু বলতে গিয়েও আচমকা চুপ করে গেল বলে মনে হল নোঈর। কী ব্যাপার! এমন হল কেন! সেদিন স্মরণদের বাড়িতেও এমন হয়েছিল না!
নোঈর মনে পড়ল ব্যাপারটা।
মাহির চলে যাওয়ার পরে কাকিমা খাবার নিয়ে এসেছিলেন। সাদা ফোলা লুচি, লাল-কমলা আলুর দম। আর নারকেল ছাঁচের মিষ্টি।
লুচি থেকে দারুণ ঘিয়ের গন্ধ বেরোচ্ছিল। নোঈ খুব সাবধানে খায়। কিন্তু সেদিন ভাবছিল আজ আর অত ভাববে না।
কাকিমা ছ’টা করে লুচি দিয়েছিলেন। সেটাই শুধু কমিয়েছিল নোঈ।
কাকিমা ওর পাশে বসে থুতনি ধরে বলেছিলেন, “খুব মেপে যে খাও বোঝা যাচ্ছে। এমন সুন্দর স্কিন আমি দেখিনি কোনওদিন।”
লজ্জা পেয়ে নোঈ মুখ নামিয়ে নিয়েছিল।
কাকিমা আবার বলেছিলেন, “স্মরণটা পাগল, জানো তো! বাড়িতে থাকলে সারাক্ষণ লেখে আর পড়ে। আমার সঙ্গে কথাই বলে না! তোমরা নাকি সোনাঝুরিতে কাজ করবে? তাই?”
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ। ওই একটা জুট মিল…”
“আর জোনাক-বাড়ি?” কাকিমা কেমন অদ্ভুত মুখে বলে উঠেছিল, “বিয়ের পর ওর বাবার সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম সোনাঝুরিতে। জোনাক-বাড়িও দেখি। আসলে…”
“মা কী বলছ! আলুর দমে আলুর ভেতরে মশলা ঢোকেনি। বলেছি না আলুটা রান্নার আগে কয়েকটা ফুটো করে দেবে।”
নোঈ বলেছিল, “কোথায়! ঠিকই তো আছে! তা কাকিমা, আপনি কী বলছিলেন?”
কাকিমা আবার শুরু করেছিল, “আসলে ওর বাবা তো…”
“বাবা বোটানিস্ট ছিলেন,” স্মরণ আবার ওর মাকে বাধা দিয়ে বলেছিল, “বাবা-মা’র লাভ ম্যারেজ হয়েছিল। মায়ের বাড়িতে বাবাকে মেনে নেয়নি। মা সবাইকে এই গল্প শোনায়। প্রেম করার চেয়েও প্রেমের গল্প শোনানোতে কিন্তু অনেক বেশি স্যাটিসফ্যাকশন আছে। তাই না?”
সেদিন বেশ অনেকক্ষণ ওদের বাড়িতে ছিল নোঈ। দেখেছিল, মাকে আর ওই বিষয় নিয়ে কিছু বলতেই দেয়নি স্মরণ।
গাড়িটা গড়িয়াহাট টপকাল। ঘড়ি দেখল নোঈ। প্রায় দশটা বাজে। আজ দেরি হয়ে গেছে খুব। বাড়িতে অবশ্য ফোন করে দিয়েছিল! কিন্তু এত দেরি হবে ভাবতে পারেনি ও। বস এত সময় নিয়ে নিয়েছিলেন!
বস খুব রাগী আর স্পষ্ট কথার মানুষ। আপন যেমন বলেছিল, তেমন কিন্তু কোনও কিছু হয়নি। বস ইন্ডিভিজ়ুয়ালি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। শুধু মূল ব্যাপারটা শুনে নিজেই ওই রুম থেকে ফোনের স্পিকার অন করে কল করেছিলেন দীপমালাদেবীকে।
কিন্তু ভদ্রমহিলা খুব ঠান্ডা গলায় বসকেও একই কথা বলে দিয়েছেন, “আমি আপাতত এই বাড়ি বিক্রি করব না। আমার ছেলে না বুঝে প্রথমে এটা ডিলে রেখেছিল। আমি জানি আপনারা সেইভাবেই ডসিয়ার আর প্রেজ়েন্টেশন তৈরি করেছেন। কিন্তু সরি। আমি একটা উত্তর খুঁজছি। সেটা না পাওয়া অবধি আমি অপারগ।”
ওদের কনফারেন্স রুমটা বেশ বড়। দীপমালাদেবীর গলাটা নরম শোনালেও তার দৃঢ়তা নিয়ে কারও মনেই কোনও সংশয় ছিল না।
বস বলেছিলেন, “আমাদের ব্যাপারটা একবার ভাবুন। আমাদের প্রজেক্টে সামাজিক উপকারও হবে। সোনাঝুরি উইল বি ইমেন্সলি বেনিফিটেড।”
দীপমালাদেবী যেন হেসেছিলেন সামান্য। তারপর বলেছিলেন, “আপনাদের পুশকিন ছেলেটা খুব পুশ করছে ব্যাপারটা নিয়ে। আমায় অনেকবার কনভিন্স করার চেষ্টা করেছে! কিন্তু আমি ওকে যা বলার বলেছি। আর সোনাঝুরি! সোনাঝুরি মরল কী বাঁচল আই ডোন্ট কেয়ার!”
পুশকিন যে কাজটা নিয়ে খুব খাটছে, সেটা দীপমালাদেবীর কথাতেই বস বুঝে গিয়েছিলেন। নোঈ আড়চোখে তাকিয়েছিল আপনের দিকে। দেখেছিল, প্ল্যান আর আশা সবেতেই ছাই পড়ছে দেখে কেমন যেন চোয়াল ঝুলে গিয়েছিল লোকটার।
