“কী রে, মাঝে মাঝে কী হয় তোর?” স্মরণ সামনে থেকে জিজ্ঞেস করল।
নোঈ হাসল সামনে তাকিয়ে, “কিছু না। এই ভাবছিলাম!”
“কী ভাবছিলি?” স্মরণ আরও ভাল করে ঘুরে বসার চেষ্টা করল আবার, কিন্তু সিট বেল্টের জন্য পারল না ঠিকমতো।
“এই যে, তোকে প্যাঁও স্ট্যান্ড করে কী করে?”
“মানে?” স্মরণ গম্ভীর হয়ে গেল, “আরে, প্যাঁও আমার মতো ডিভোটেড লাভার পাবে না কোথাও। জানিস, প্যাঁও যখন টিউশনে যেত আমি ওর জন্য গাছের তলায় সাড়ে চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার মোবাইল ছিল না তো! সবাই হাসত আমায় দেখে। কিন্তু আমি পাত্তা দিতাম না। সাড়ে চার ঘণ্টা। তারপর ও পরীক্ষা দিয়ে বেরোলে আমি ফ্রুট জুস নিয়ে রেডি থাকতাম। চাইনিজ় খেতে ভালবাসত। আমি টিউশন করতাম তো, সেই টাকা জমিয়ে ওকে চাইনিজ় খাওয়াতাম। ওই যে ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের একটা রেস্তরাঁ আছে না! সেই সিঁড়ি উঠে গেছে সোজা। সেইটায়। মেঘমল্লার থেকে অটো ধরত প্যাঁও। ওর সঙ্গে অটোর লাইনে দাঁড়াতাম আমি। নোট জ়েরক্স করে দিতাম। এমনকী, একবার ওর জুতো ছিঁড়ে গেল। আমি স্যারের বাড়ি থেকে খবরের কাগজ নিয়ে সেটা প্যাক করে রাসবিহারী মোড়ের মুচির কাছ থেকে সেটাও সারিয়ে এনেছিলাম। নানা লোকে আওয়াজ দিয়েছিল। স্যারও আওয়াজ দিয়েছিলেন খুব। কিন্তু প্যাঁওয়ের জন্য সব করতে পারি আমি।”
পুশকিন সব শুনে বলল, “তুমি ওর আয়ামাসি না প্রেমিক, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!”
স্মরণ একটা কথাতেই এমন ভোঁতা হয়ে গেল যে, নোঈ খিলখিল করে হেসে উঠল। আর ঠিক তখনই স্মরণের পকেটের ফোনটা বেজে উঠল শব্দ করে।
স্মরণ, পুশকিনের কথার ধাক্কা সামলে উঠে ফোনটা ধরতে সময় নিল একটু।
পুশকিন তাকাল নোঈর দিকে। তারপর চাপা গলায় বলল, “দ্যাটস মোর লাইক আ গুড গার্ল! ইউ শুড স্মাইল মোর। আজ অফিসে যা হল ভুলে যাও। এসব হয়। আমরা ঠিক ক্র্যাক করব কাজটা। ডোন্ট ওয়ারি!”
“স্যার,” ফোনটা রেখে স্মরণ সামলে ঘুরল আবার, “ওই মাহির ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছিল কী হল কাজের। মানে, রিতুদা জিজ্ঞেস করছে। আমি বলেছি কাল বলব।”
মাহির! নোঈ অবাক হল। ছেলেটা অদ্ভুত বেশ। সেদিন আচমকা ওকে স্মরণদের বাড়িতে দেখে তো ঘাবড়েই গিয়েছিল!
ছেলেটা খুব লম্বা। ভাল চেহারা! একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরা। পায়ে সাধারণ একটা চটি!
স্মরণ চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কাকে চাইছেন?”
ছেলেটা নরম গলাতেই বলেছিল, “আপনাদেরই চাইছি।”
“আমাদের? মানে?” স্মরণ যে অবাক হয়েছে খুব, সেটা ওর গলার স্বরেই বুঝতে পেরেছিল নোঈ।
ছেলেটা বলেছিল, “বলতে পারেন আমি আপনাদের কাছে একজনের হয়ে এসেছি। সোনাঝুরির কাজের ব্যাপারে এসেছি!”
“সোনাঝুরি?” নোঈ এবার উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্মরণের পাশে!
ছেলেটা বলেছিল, “হ্যাঁ। দরকারি কাজ। একটু যদি শোনেন আপনাদের ক্ষতি হবে না।”
নোঈ অবাক হয়েছিল, “কে আপনি?”
ছেলেটা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর নরম স্বরে বলেছিল, “আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি! আমার নাম মাহির।”
স্মরণ দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল, “আসুন।”
ছেলেটা সময় নিয়ে পায়ের জুতোটা খুলে বারান্দার একপাশে সরিয়ে রেখেছিল। তারপর ঢুকে এসেছিল ঘরে।
“বসুন,” স্মরণ হাত দিয়ে একটা গদির দিকে দেখিয়েছিল।
মাহির যে নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ি থেকে আসছে, ওর জামাকাপড় আর মুখচোখের ভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল নোঈ। বয়সও বেশি নয়। ওর কৌতূহল হয়েছিল, কী বলতে চায় ছেলেটা?
মাহির চারিদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখেছিল একটু। তারপর হেসে বলেছিল, “আমার বয়স দেখে আপনারা হয়তো আমার কথা সিরিয়াসলি নেবেন না, কিন্তু আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি। রিতুদা কে চেনেন তো? এমপি মানে…”
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ, নাম জানি। বলুন।”
মাহির বলেছিল, “আমি আপনাদের বেশি সময় নেব না। ছোট করে একটা কথা জানাতে চাই। আমরা জানি যে, সোনাঝুরির কাজটা নিয়ে তারক চক্রবর্তী আপনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু চাইছে। লোকটা খুবই বাজে আর বদ। আমাদের পার্টির নাম ও খারাপ করছে। এখন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়ন। সেখানে আমরা কোনও কম্প্রোমাইজ় করব না। রিতুদা আপনাদের কোম্পানির কথা জানেন। খুব বড় আপনাদের কোম্পানি। তাই আপনাদের সাহায্য করতে চান। আমি জানি, আপনারা দু’জন কাজটা ফলো করছেন। তাই আপনাদের বললাম। এই রিতুদার কার্ড। আপনাদের বসকে বলবেন রিতুদা কথা বলতে চেয়েছেন। রিতুদার কিন্তু কোনও স্বার্থ নেই। আমাদের রাজ্যের ভাল করতে চান রিতুদা। তারকের মতো লোকদের জন্য আমাদের রাজ্যের মানুষের কোনও ক্ষতি রিতুদা হতে দেবেন না!”
ছেলেটা একটা কার্ড এগিয়ে দিয়েছিল। নোঈ কার্ডটা নিয়ে দেখেছিল ভাল করে। ছেলেটা সত্যি কথাই যে বলছে বুঝেছিল!
রিতেশ আইচ। ছোট করে রিতুদা। নোঈ কেন, লোকটার নাম সবাই জানে। কেউ মুখে না বললেও এটা ঘটনা যে, রিতুদা আগে পাতি গুন্ডা ছিল। সেই হিসেবেই তার নাম আর পরিচিতি। পরে পার্টির টিকিটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে। মনা পান্ডে বলে আর-একজন নেতা কাম মস্তানের সঙ্গে তার খুব ঝামেলা। মাঝে মাঝে পেপারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খবর পাওয়া যায়। এখন সেই লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে! এসব দালাল টাইপের লোকজন কেন ঢুকে পড়ে মাঝখানে! মাথা যখন গলিয়েছে তখন কিছু তো একটা দাবি আছেই। কিন্তু নোঈ বুঝেছিল এই ছেলেটি দূতমাত্র। একে এটুকুই বলা হয়েছিল।
