আপন আর পুশকিনের চেম্বার আলাদা। নোঈদের বসার জায়গাটা আবার অন্য ঘরে। সেখানে নিজের কিউবিকলে বসে জব রিপোর্টটা শেষবারের মতো দেখছিল নোঈ। তখনই আপন এসে দাঁড়িয়েছিল ওর পেছনে।
“কী করছ দেখি!” আচমকা আপন পেছন থেকে নোঈর ঘাড়ের ওপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
“স্যার,” নোঈ একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। চাকা লাগানো চেয়ারটা ঠেলে ও পিছিয়ে গিয়েছিল কিছুটা।
আপন বলেছিল, “এসব করে আর লাভ কী! ইফ ইউ রাইড অন আ সিঙ্কিং শিপ, ইউ আর বাউন্ড টু গো ডাউন উইথ ইট।”
“সরি স্যার, মানে?” নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আপনের দিকে।
আপন হেসে একটু ছড়িয়ে বসেছিল পাশের একটা খালি চেয়ারে। এই কিউবগুলো তিন দিকে ঘেরা। আপন একটা ফাইল তুলে নিয়েছিল টেবিল থেকে। সেটা উলটে-পালটে দেখেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, “লাইফ কখনও একরকম যায় না! ইটস আ সাইক্ল। একদিন বস আমার কাছ থেকে প্রোজেক্ট নিয়ে দিয়েছিলেন পুশকিনকে। আর আজ দ্য টেব্ল হ্যাজ় টার্নড। আমার কাছে ভেতরের খবর আছে। ওকে যে শোকজ় করা হয়েছিল, সেটার স্যাটিসফ্যাক্টরি রিপোর্ট ও দিতে পারেনি। কোম্পানি ইজ় নট হ্যাপি। হ্যাঁ, ওই বুদাপেস্টের কাজটায় কন্ট্রিবিউট করেছে বটে, কিন্তু সেটা তো সহজ কাজ ছিল। ও পাগলা স্মরণটাকে দিলে সেও করে দিত। আসল ব্যাপার ছিল এই মালিক জুটের কাজটা। আর পুশকিন হ্যাজ় ব্রট আবাউট হিজ় ডুম। আরে, একজন এজেড লেডিকে কনভিন্স করতে পারে না! ঘণ্টা কাজ পারে! আমাকে তো সেভাবে সেই চান্সই দেওয়া হল না! শোনো, আজ বস আমাদের নিয়ে কনফারেন্সে বসবেন। তোমাকেও জিজ্ঞেস করবেন কেন প্রজেক্টটা এত মাস ডিলে হয়ে আছে। কোন পয়েন্টে আটকে আছে? তুমি জাস্ট বলবে, এটা হয়েছে পুশকিনের জন্য। বস পুশকিনকে পছন্দ করেন। তাই এখনও বেঁচে আছে মালটা। কিন্তু বোর্ড অব ডাইরেকটর্স বসকেও ঝাড় দিয়েছেন। ফলে শি ইজ় ইন ডিপ শিট অলসো। তাই এবারের মিটিংটা খুব ইমপর্ট্যান্ট কিন্তু। তুমি বলবে যে, পুশকিন তোমাদের এনাফ কাজ করতে দিচ্ছে না। বলবে, ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড’-এর আইকা বাসুর সঙ্গে ওর শেডি ডিল হয়েছে। সেটা তুমি জেনেছ। আমরা ডিলে করালে ওরা প্রজেক্টটা পেয়ে যাবে। তাতে পুশকিনের পকেট ভারী হবে।”
“কী বলছেন স্যার?” নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আপনের দিকে।
আপন ওর ছোট কুতকুতে চোখ দুটো বুজিয়ে খিকখিক করে হেসে বলেছিল, “তুমি বাচ্চা মেয়ে। এসব বুঝবে না। বস নিজেকে বাঁচাতে একটা স্কেপগোট খুঁজছে। গিভ হার ওয়ান! ভেতর থেকে খবর পেয়েছি, আমায় এই প্রজেক্টটা দেওয়া হবে এর পর। তুমি আমার হয়ে কাজ করবে। তাই বলছি, নাউ ইজ় দ্য টাইম টু জাম্প শিপস!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কী বলছে কী আপন! এমন করতে কী করে বলতে পারে!
আপন এদিক-ওদিক দেখে চেয়ারটা গড়িয়ে নিয়ে এসেছিল সামনে। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল, “শোনো, পরিস্থিতির সুযোগ নিতে শেখো। আমি জানি তোমার চাকরিটাতে ও হেল্প করেছে। কিন্তু কাজ আর পলিটিক্সে কেউ বন্ধু নেই। সবটাই টেম্পোরারি। নেল হিম। দিস ইজ় দ্য টাইম। না হলে কিন্তু ও সব ব্লেম তোমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে। আগেও এমন হয়েছে। ও সাংঘাতিক ছেলে! এমনকী, এও শোনা যায়, ও নাকি নিজের বউকে খুন করেছিল!”
“কী? কী বলছেন এসব?” নোঈ ঘাবড়ে গিয়েছিল খুব।
আপন বলেছিল, “হ্যাঁ। বাইরে ছিল তখন। আগের রাতেও যে-মেয়েটা সুস্থ থাকে, সে কী করে এক রাতের মধ্যে মারা যায়? শালা, টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করেছিল ব্যাপারটা। প্লাস ওর এক কাকা আর তার ছেলে মানে ওর খুড়তুতো ভাই আছে— ডাক্তার। তারাও কীসব ম্যানেজ করেছিল শুনেছি। হি ইজ় ইভ্ল। পিয়োর ইভ্ল। ওকে আমি ছোট থেকে চিনি। তুমি কী ভাবো, বস ওকে এমন প্রেফার করে কেন?”
“কেন?” নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
আপন টাইয়ের নটটা আলগা করে নাক টেনে হেসেছিল। হালকা গোলাপি শার্টের হাতাটা গুটিয়ে বলেছিল, “বসের সঙ্গে ওর…” বলে চোখ টিপেছিল, “বস যখন এখানে আসে। হি ভিজ়িটস হার! আর… ইউ নো! আমি আর কী বলি!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। ও তাকিয়েছিল অবাক হয়ে। এসব আপন কী বলছে। ওকেই-বা বলছে কেন?
আপন পকেট থেকে একটা চুয়িংগাম বের করেছিল এবার। সময় নিয়ে র্যাপারটা খুলে মুখে দিয়েছিল সেটা। তারপর কোণে রাখা একটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে সেই র্যাপারটা ফেলে দিয়ে বলেছিল, “তুমি বাচ্চা মেয়ে, তাই এতদিন বলিনি। কিন্তু তোমার কেরিয়ার ইজ় অ্যাট স্টেক। তাই বলছি। লাইফ হল সি-স-র মতো। একদিকে ডুবলে আর-একদিক ওঠে! তোমার টাইম এখন ওঠার। ডোন্ট ওয়েস্ট ইট। আজ তোমার দিন। সেভ ইয়োরসেলফ। প্লাস এই প্রোজেক্টটা নেক্সট আমার কাছে আসছে। তাই আমার টিমে তুমি থাকতে চাইলে এটা কোরো। আমি এমন কাউকে টিমে রাখব না, যে আমার কথা শোনে না। বুঝেছ?”
আপন চলে যাওয়ার আগে হেসেছিল। বলেছিল, “আমার কথা শোনো। আখেরে লাভ হবে। পুশকিন কিছু দেবে না তোমায়। বুঝেছ?”
বিশ্ববাংলার সিগন্যালে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এত রাত হলেও ট্র্যাফিক ভালই আছে। ডান দিকে বিশাল হোটেল দুটো রূপকথার রাজপ্রসাদের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে!
নোঈ জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। ওর ছোটবেলার কলকাতাটা যেন হারিয়ে গিয়েছে কোথায়! এই কলকাতাকে মাঝে মাঝে চিনতে পারে না নোঈ। একদিকে আকাশে গেঁথে যাওয়া বিশাল বাড়ি। মাফলারের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া ফ্লাইওভার। বিয়েবাড়ির মতো ঝলমলানো শপিং মল। খাবারের দোকান। রেস্তরাঁ। এসি বাস। মোবাইলের সাহায্যে বাড়ির ভেতর ডেকে নেওয়া গাড়ি। সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল। দামি লিফট আর এসি বসানো স্কুল। আর তার পাশে রাস্তায় স্তূপ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষ। বগবগে কালো ধোঁয়া বমি করতে-করতে যাওয়া টেম্পো। নোংরা দেওয়াল। ধুলোজমা পুরনো বাড়ি। বারান্দায় বসে থাকা মোটা চশমা আর খাটো পাজামা পরা জং ধরা মানুষ। জায়গায় জায়গায় পুঁজের মতো জমে থাকা অটোর লাইন। নোঈ মাঝে মাঝে বোঝে না আসল কলকাতা কোনটা! এই চকমেলানো শহরটা নাকি ওই ফুটপাথের ময়লা ন্যাংটো বাচ্চা ঘোরা শহরটা!
