শুভ মারা যাওয়ার পর আবার যোগাযোগ হয়েছিল পুটুমাসির সঙ্গে। এখনও মনে আছে আইকার। শুভর শ্রাদ্ধের চারদিন পর মাকে নিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়েছিল আইকা। পুটুমাসিরাও এসেছিল ব্যাঙ্কে। অ্যাকাউন্ট খুলতে। মা আর পুটুমাসি তো দু’জন দু’জনকে দেখে কিছুক্ষণ নড়তেই পারেনি! কেমন যেন থমকে গিয়েছিল! থমকে গিয়েছিল সময়! তারপর দু’জনে জড়িয়ে ধরেছিল একে অপরকে। আর কী কান্না কী কান্না! মা একদম ছেলেমানুষের মতো আঁকড়ে ধরে কাঁদছিল পুটুমাসিকে। পুটুমাসিও কাঁদছিল। ব্যাঙ্কে লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল গোটা ব্যাপারটা! কেউ কেউ হাসছিলও। সকলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আইকার খুব এমব্যারাসড লাগছিল। মনে হচ্ছিল মা এমন বাড়াবাড়িটা না করলেই পারত। কিন্তু কিছু বলতেও পারেনি। কী বলবে! আসলে এই বহুবছর পরের দেখা হওয়াটার ভিতর যে অনেক অনেক মেঘ জমে ছিল! মানুষকে মাঝে মাঝে কাঁদতেও দিতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তখন। তাকে সান্ত্বনা দিতে নেই। তাকে প্রবোধ দিতে নেই। কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতে নেই। তাকে শুধু কাঁদতে দিতে হয়। আইকা জানে, কান্না আসলে খুব ব্যক্তিগত একটা অভিব্যক্তি। খুব সৎ একটা প্রকাশ। সান্ত্বনার মতো বাহ্যিক আড়ম্বর দিয়ে তাকে সব সময় লঘু করার মানে হয় না।
সেই মায়ের সঙ্গে আবার পুটুমাসির যোগাযোগের শুরু। সেই যোগাযোগ থেকেই একসঙ্গে ফ্ল্যাট কেনাও হয়েছে। আসলে শুভর সঙ্গে বিয়ের পর টাকাপয়সার সব অভাব মিটে গিয়েছিল আইকার। তাই শুভ মারা যাওয়ার পরে পঞ্চান্ন লক্ষ টাকা দিয়ে এই ফ্ল্যাটটা কিনতে ওদের কোনও অসুবিধে হয়নি।
শুভর সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। ইংলিশে এম এ করছিল আইকা। শুভদের ছিল সোনার ব্যাবসা। গোটা কলকাতায় ছ’টা সোনার দোকান ছিল ওদের। শুভ নিজে দেখত দুটো দোকান। তার একটা ছিল কলেজ স্ট্রিটে। সেখানেই একদিন আলাপ হয়েছিল ওর সঙ্গে শুভর। রথের দিন ছিল সেটা। আজও মনে আছে আইকার।
শুভ লম্বা ছিল খুব। গায়ের রং মিশকালো। মোটা গোঁফ, দাড়ি। গম্ভীর মুখ। আইকার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় ছিল শুভ।
একটা ছোট বই কিনতে গিয়েছিল আইকা। আটত্রিশ টাকা দাম ছিল সেটার। সঙ্গে খুচরো ছিল না ওর। আইকা পাঁচশো টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল। দোকানদার লোকটি বিরক্ত হয়েছিল খুব। আইকাও বুঝতে পারছিল যে, বিরক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। এতটা খুচরো সব সময় যে থাকবে তা তো নয়। সেটা ও ভাল করে বলতেও গিয়েছিল। কিন্তু লোকটা শুনছিল না কিছুতেই।
পাশেই একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিল শুভ। হাতে মাটির খুরিতে চা নিয়ে ও যে গোটা ব্যাপারটাই দেখছিল, সেটা বুঝতে পারেনি আইকা!
দোকানদার লোকটাকে কিছুতেই বোঝাতে না পেরে আইকা যখন বইটা না কিনেই চলে আসছিল, ঠিক তখনই এগিয়ে এসেছিল শুভ।
আইকার লজ্জা লাগছিল খুব! এমনিতেই দোকানদারটি ওকে সামান্য হলেও অপমান করেছিল, তারপর একদম অচেনা একজন এমন করে গায়ে পড়ে উপকার করছে দেখে লজ্জাটা যেন বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। কিন্তু বইটাও দরকার ছিল খুব। তাই শুভ টাকাটা খুচরো করে দিতে চাইলে আর আপত্তি করেনি। শুভ বিশেষ কথা বলেনি। শুধু জানতে চেয়েছিল, কী পড়ে আইকা।
আইকা বলেছিল। শান্ত নরম গলায় ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এসেছিল দোকান থেকে। কিন্তু পরের দিন ইউনিভার্সিটি ছুটির পরে দেখেছিল বিদেশি দামি বাইকে হেলান দিয়ে ফুটপাথের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুভ! প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল আইকা। কী করছে লোকটা এখানে? টাইট জিন্স, বুকের একটা বোতাম খোলা সাদা জামা আর বিশাল বড় একটা বিদেশি বাইক! লোকজন রীতিমতো দেখছিল বাইকটা। আইকা কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু শুভ একদম সামনে চলে আসায় এড়াতে পারেনি। সৌজন্যবশত সামান্য হেসেছিল! শুভ ভাবলেশহীন মুখে বলেছিল, “আজও যদি খুচরো লাগে, তাই চলে এলাম!”
ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল আইকা। সামনের কাচে নিজেকে দেখে ছোট করে কাটা চুলগুলো ঠিক করে নিল। তারপর টেবলে রাখা বোতলটা থেকে জল খেল একটু।
“শোন, স্যারের সঙ্গে একবার দেখা করে যাস,” দূর্বা নিজের কিউবের দিকে যেতে-যেতে বলল, “তোকে একবার খুঁজছিলেন।”
“তো এতক্ষণে বলছিস!” আইকার বিরক্ত লাগল, “আমায় বেরোতে হবে! আসল কথা না বলে এসব জ্ঞান তোকে কে দিতে বলেছে! আর উনি বেয়ারা দিয়ে কল করাননি কেন?”
দূর্বা বলল, “আরে, আমি ঘরে গিয়েছিলাম তাই আমাকেই বললেন! জাস্ট দু’মিনিট লাগবে। মনে হয় ঝাড়খণ্ডের ওই প্রজেক্টটা নিয়ে কিছু বলবেন।”
আইকা মাথা নাড়ল বিরক্তিতে। তারপর ঘড়ি দেখল। সেই লেট হবেই! ভাগ্যিস ওর নিজের গাড়ি। সত্যি দূর্বাকে নিয়ে আর পারা যায় না। ও আর অপেক্ষা না করে এগিয়ে গেল স্যারের চেম্বারের দিকে। স্যার মানে ওদের কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার রুপিন মেহতা। দেখা যাক, স্যার কতক্ষণ আটকান।
ওর কিউবিকল থেকে বেরিয়ে একটা টানা লম্বা করিডর। আশপাশের কিউবিকলে এখনও লোকজন কাজ করছে। আইকা সেইদিকে তাকাল না। শুধু ঘড়ি দেখল। দূর্বাটা যেন কী একটা! কাজের কথা না বলে এটা-সেটা নিয়ে বেশি ব্যস্ত! মেয়েটা খুব ভাল। কিন্তু দরকারের চেয়ে বেশি সেন্টিমেন্টাল। এত বেশি সেন্টিমেন্টাল, যে মাঝে মাঝে অফিসেই কেঁদে ফেলে! বিরক্ত লাগে আইকার। নিজের মনের গোপন ভাঁজগুলো নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি ভাল লাগে না ওর। জীবনে যখনই সেন্টিমেন্ট আর কার্যকারিতার মধ্যে বাছবিচার করতে হয়েছে, কার্যকর হবে যেটা ওর পক্ষে, সেটাই সব সময় বেছে নিয়েছে আইকা।
