হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে রইল মাহির, কাচের দরজা দিয়ে কিছু মুখ উঁকি মারছে। কারা যেন কিছু বলছে! কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছে না! ভাইয়ের মুখটা ভাসছে শুধু। মায়ের মুখটা ভাসছে! রিতুদা যদি সত্যি ক্ষতি করে দেয়! কী করবে ও? ঘন হচ্ছে ডিসেম্বরের সন্ধে। আর তার অন্ধকার ধীরে-ধীরে রক্তে মিশে যাচ্ছে মাহিরের। স্যার যে ছেলেটার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, সেই ছেলেটা আরও যেন গেঁথে যাচ্ছে মাটির গভীরে! একটা ধূসর গাড়ি চলে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে। সেই অন্য গ্রহ থেকে আসা মেয়েটা হাত নাড়ছে ওকে দেখে! চলে যাচ্ছে? মেয়েটা কি চলে যাচ্ছে! মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা, বশ্যতা মেনে নেওয়া এই ছেলেটার থেকে কি দূরে চলে যাচ্ছে মেয়েটা!
রিতুদা চুলের মুঠি ধরে রেখেছে। টান লাগছে! টান লাগছে খুব! শিকড় উপড়ে যাওয়ার আগে এমন টান আর যন্ত্রণাই কি অনুভব করে গাছ!
.
৩১. নোঈ
এত টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না নোঈর। একটা বাড়ির জন্য এই প্রজেক্টটা আটকে যাবে! এর কোনও মানে হয়! ও বিরক্ত হয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
আজ চাঁদ উঠেছে আকাশে। চকচকে কাচের বুদ্বুদের মতো চাঁদ! মনে হচ্ছে কে যেন কলকাতার মাথায় একটা চিনে লণ্ঠন জ্বালিয়ে রেখেছে! সুন্দর লাগছে খুব। কিন্তু তাও কিছু ভাল লাগছে না নোঈর। অফিসে আজ ভাল সময় যায়নি ওর।
দিল্লি থেকে বস এসেছেন আজ। আর সবাই মিলে একটা মিটিং হয়েছে। তাতে পুশকিন আর ওর টিমকে বেশ বকাবকি করা হয়েছে! মনটা একদম ভাল নেই।
“তুমি জানলাটা বন্ধ করে নাও, ঠান্ডা লাগবে!” পুশকিন পাশ থেকে বলল।
গাড়ি হু হু করে ছুটছে বাইপাস দিয়ে। আজ রাত হয়ে যাওয়ায় গাড়ি ড্রপ দিচ্ছে ওদের। পুশকিন গাড়ি আনেনি আজ। তাই একসঙ্গেই ফিরছে! সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে রয়েছে স্মরণ। গাড়িতে ওঠার পর থেকে এই প্রথম কথা বলল পুশকিন। আসলে সবটাই কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে!
নোঈ তাকাল। পুশকিন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। গাড়ির আবছায়ার ভেতরে পুশকিনের মুখটা কেমন যেন লাগছে। এমন বিষণ্ণ পুশকিনকে ও কোনওদিন দেখেনি।
নোঈ সামনের দিকে তাকাল। স্মরণ রাস্তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ও সময় নিল একটু তারপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে ধরল পুশকিনের হাত। ছেলে হিসেবে পুশকিনের হাতটা খুব নরম। নোঈ হাতটায় চাপ দিল সামান্য!
পুশকিন তাকিয়ে হাসল অল্প। তারপর আবার বলল, “কাচটা তুলে দাও। নতুন ঠান্ডা পড়েছে। এটা ভাল নয়। সর্দি লেগে যাবে!”
নোঈ পুশকিনের আঙুলের মধ্যে নিজের আঙুলগুলো জড়িয়ে রাখল কিছুক্ষণ। দেখল পুশকিন সাড়া দিচ্ছে না! নোঈ তাকাল পুশকিনের দিকে। আবছায়া হলেও দু’জনে দু’জনের চোখ দেখতে পাচ্ছে!
নোঈ নীরবে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে! পুশকিন সামান্য মাথা নাড়ল শুধু!
“স্যার,” স্মরণ আচমকা পেছনে ফিরল।
নোঈ নিজের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল।
“বলো,” পুশকিন তাকাল স্মরণের দিকে।
“একটা কথা বলব?”
পুশকিন হাসল। আজ সারাদিনে বোধহয় এই প্রথম, ভাবল নোঈ।
স্মরণ প্রায় ঘুরে বসে বলল, “মহিলা এমন ঢ্যাঁটা কেন?”
“কোন মহিলা?” পুশকিন অবাক হল।
“ওই দীপমালাদেবী! দাবিটা কি ওঁর? আমরা যা প্রস্তাব দিচ্ছি সেটা তো ভাল। ওদের জুট মিলের অবস্থা ভাল নয়। ওরা লায়াবিলিটিটা ঝেড়ে ফেলছে না কেন?”
“জুট মিল নিয়ে তো সমস্যা নেই,” পুশকিন বলল, “ওঁর সমস্যা তো বাড়িটা। জোনাক বাড়িটা!”
স্মরণ চশমাটা ঠেলে ওপরে তুলে বলল, “কিন্তু সেটাই বা কেন! দিয়ে দিলে তো ল্যাটা চুকে যায়!”
পুশকিন হাসল, “কেউ-কেউ হয়তো ল্যাটা চোকাতে চায় না! আজ বস তো সবার সামনেই কনফারেন্সরুমে দীপমালাদেবীকে কল করলেন। শুনলে তো কী বললেন উনি।”
“ওই তো, প্রশ্নটা জেনে তার উত্তরটা জানতে হবে। ইজ় দিস আ জোক!” স্মরণ মাথা নেড়ে সোজা হয়ে বসল।
পুশকিন আর কিছু বলল না। আবার বাইরের দিকে তাকাল।
স্মরণ আবার পেছনের দিকে ঘুরল, “স্যার।”
“কী হল?” পুশকিন আবার হাসল সামান্য।
নোঈ অবাক হয়ে যায়! স্মরণটা যেন ক্লাস সিক্সে পড়া একটা ছেলে! সারাক্ষণ ছটফট করছে! সুস্থির হয়ে বসতে পারে না এক মুহূর্তের জন্যও!
“একটা কথা বলব?”
নোঈ বলল, “সোজা হয়ে বোস না। সারাক্ষণ বকবক করে যাচ্ছিস! কী কথা বলতে চাস তুই?”
স্মরণ নোঈর কাছে ধাতানি খেয়ে হাসল। কিন্তু চুপ করল না। উলটে বলল, “আপনস্যার আপনাকে হিংসে করে কেন?”
“এই! কী সব বাজে কথা বলছিস!” নোঈ আবার কড়া গলায় শাসন করার চেষ্টা করল স্মরণকে।
স্মরণ বলল, “স্যার, এখন তো অফিস টাইম নয়। আমি আনঅফিশিয়ালি বলছি। কিন্তু কেন স্যার?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “ওসব কিছু নয়। ও তোমার ভুল ধারণা!”
“স্যার, দেখছিলেন, যখন কনফারেন্স রুমে বস আপনাকে বকছিলেন তখন উনি কী খুশি হচ্ছিলেন! আমাকে তো চাপা গলায় বললেন, এরপর তোমার হবে। নাও, অ্যাকাউন্টস থেকে আরও নাচতে-নাচতে গিয়ে ফিল্ডে নামো!”
“তাই?” পুশকিন হাসল।
স্মরণ বলল, “হ্যাঁ। আমি সত্যি বলছি। এমনকী, কনফারেন্স আরম্ভ হওয়ার আগেও তো নোঈকে কী সব বলছিল। কী রে নোঈ, বল!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। এভাবে কি এসব কথা বলা উচিত?
আসলে বস এলেই অফিসে একটা টেন্সড অবস্থার সৃষ্টি হয়। ওদের নানা রিপোর্ট জমা দেওয়ার থাকে। নোঈরও ছিল। তাই সেটা নিয়ে দুপুর থেকে ব্যস্ত ছিল ও।
