তা ঠিক! মাহিরের মনে পড়ে গেল। কী কাণ্ড! ওই লোকটা সবার সামনে মেয়েটাকে কীভাবে নিয়ে গেল!
“নিশান ঠিক আছে? সেদিন তো না খেয়ে চলে গেল!” মাহির জিজ্ঞেস করল।
“জানি না,” পলি হাতঘড়ি দেখে বলল, “খুব বাজে করেছে রাধির বাবা! এত টাকা লোকটার, কিন্তু ম্যানার্স জানে না! যাকগে। আমি যাই। কাজ আছে আমার।”
মাহির আর আটকাল না। এই নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সেদিন ওখানে স্মরণ বলে সেই ছেলেটাও এসেছিল। কিন্তু সবার সামনে কেউই কাউকে চেনা দেয়নি। ভালই হয়েছে। সবাইকে তো আর সব কিছু জানিয়ে লাভ নেই!
মাহির থানায় লাগানো ঘড়িটা দেখল। রাস্তা থেকে দেখা যায়। ওর নিজেরও দেরি হচ্ছে। রিতুদার পারা চড়ছে ওদিকে। ও মাথা নাড়ল।
দেখল, পলি প্রায় দৌড়ে চলে গেল একটু দূরে দাঁড় করানো একটা গাড়ির দিকে। গাড়িটা বেশ বড়। ধূসর রঙের। গাড়িতে উঠে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওর দিকে হাত নাড়ল পলি। তারপর বেরিয়ে গেল।
মাহির এসে বসল বাইকে। টিটি বলল, “শালা, তুই তো কামাল করে দিয়েছিস! পুরো ক্যাচ কট কট একদম! এই জিনিসকে তুলে ফেলেছিস! কিন্তু সামলে ভাই। বড়লোকের মেয়ে। আমাদের কুত্তার পেট। ঘি হজম হবে তো?”
“ভাগ! চল অফিসে!”
মাহির কথাটা মুখে বললেও মনে মনে ভাল লাগছে খুব। কেমন একটা হালকা লাগছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে বেলুনের মতো আকাশে উড়ে যাবে না তো! পলি ওকে গিফট দিল! ওর গাল ছুঁয়ে দিল! নিজের এই সাধারণ খোলসটা ছেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল ওর। এই খোলসটা ভাল লাগে না মাহিরের। এটাকে লোকে ব্যবহার করে। নিংড়ে নেয়। এটা ছেড়ে একটা ভাল, পরিষ্কার মানুষ হতে ইচ্ছে করছে আজ। ইচ্ছে করছে সেই ছেলেটা হতে যাকে স্যার ভালবাসতেন। মনে মনে ঠিক করল আবার সেই ছেলেটা হতে হবে ওকে। পলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে খুঁজে বের করতে হবে মাহিরকে!
“অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ভাল কথা, ওই ছেলেটা আর মেয়েটার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেছিলি?”
মাহির ঠোঁট কামড়াল। স্মরণ আর নোঈ। ওরা এখনও কেন যোগাযোগ করেনি কে জানে!
তারককে পালটা দিতে রিতুদা বলেছিল, “অন্য গ্রুপটা, মানে ‘রিকো গ্রুপ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ কর। ওরা মাল্টিন্যাশনাল। ওদের আউটলুক অন্যরকম। ওরা অত ঘুষ দেবে না। আর ওরা জুটমিলটাকে রিভাইভ করাতে চায় শুনলাম। শালা, ওদের কাজটা করিয়ে দিতে পারলে, আমার প্রেস্টিজ বাড়বে। হাইকম্যান্ড জানবে এই বাজারে আমি নতুন করে কর্মসংস্থান করছি। আমার লিফট হবে। তোদেরও হবে। পরের ভোটে একটা পদ আমার পাকা হয়ে যাবে। বুঝলি! তুই ওদের আমার সঙ্গে দেখা করতে বল। তারক নিশ্চয় এর মধ্যে ওদের ভড়কাতে শুরু করেছে। আর না করলেও করবে। তার আগেই আমাকে ঢুকে পড়তে হবে। বুঝলি কিছু?”
স্মরণ আর নোঈ যে ‘রিকো’-য় আছে সেই খবরটা নিয়েছিল মাহির। মোতিই বলেছিল ওকে। ও বুঝতে পেরেছিল এই গ্রুপটা বিশাল বড়, ওদের মাথাদের কাছে ঘেঁষা সহজ হবে না। তাই ওই স্মরণ আর নোঈকে টার্গেট করেই কাজ শুরু করতে হবে।
সোনাঝুরিতে একদিন গিয়েছিল ওই দু’জন। সেখান থেকে ওদের ফলো করেছিল মাহির। তারপর সুযোগ বুঝে স্মরণের বাড়িতে গিয়েছিল!
রিতুদা থমথমে মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঘরে চারজন ছিল, কিন্তু মাহির ঢোকামাত্র সবাই বেরিয়ে গিয়েছে! ও কয়েকজনের মুখে হালকা হাসিও দেখেছে। মানে, আজ হবে মাহিরের!
ডিসেম্বরের এই সময়ে কলকাতায় গরম নেই বিশেষ। তাও রিতুদা কুলকুল করে ঘামছে!
মাহিরের গলা শুকিয়ে গিয়েছে। একটু আগে যে-ভাললাগা ছিল, সেটার জায়গায় ভয় এসে ঢুকে পড়েছে মনে।
মাহির মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“জানিস মাহির, আমার না হাই প্রেশার আছে। রাগ খুব বেশি তো! আমার মা, অনেক বয়স এখন, তাও সপ্তাহে একদিন উপোস করে আমার শরীরের জন্য। কারণ, ছোটবেলায় এক সন্ন্যাসী মাকে বলেছিল, আমার নাকি এমন রাগ যে, মাথার শিরা ছিঁড়ে মরে যেতে পারি! কিন্তু মা এটা জানে না যে, আমি মরার আগে আরও গোটাকয়েক জানোয়ারকে নিয়ে মরব।”
“রিতুদা, আমার ভাইয়ের খুব শরীর খারাপ ছিল। মায়ের কাজ থাকে তো, তাই…”
“তো আমার কী ছেঁড়া যাবে তাতে! শুয়োরের বাচ্চা! খালি অজুহাত! যখন টাকা দিই হাত পেতে নিস না! আর কাজের বেলায় ঢ্যামনামো! আমি কলকাতায় নেই বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ!”
“কিন্তু…”
“চোপ বাঞ্চোত!” হাতের কাছে থাকা কাচের পেপার ওয়েটটা আচমকা ছুড়ে মারল রিতুদা!
কোনওমতে মাথা নিচু করে নিজেকে বাঁচাল মাহির। শব্দে বুঝল পেছনে রাখা একটা ছবি চুরমার হয়ে গিয়েছে! রিতুদা উঠে দাঁড়িয়েছে! চোখ লাল। সারা শরীর কাঁপছে। মাহির ভয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
রিতুদা এগিয়ে এসে চুলের মুঠিটা ধরল শক্ত করে। বলল, “ভাইয়ের মতো ভালবাসি বলে কিন্তু পার পাবি না! তুই জানিস, আজ সকালে তারক এসে আমার অফিসে বলে গেছে আমি নাকি কিছু করতে পারব না। ওই নাকি ঠিক করবে কে জমি পাবে ওখানে। আমায় সবাই বলছে তুই বেকার, ফালতু। আমি তোর ওপর ভরসা করেছিলাম। রিকোর কেউ এখনও এল না। কেন? কেন এমন হল? মাহির তোকে রাস্তা থেকে তুলেছি, আবার রাস্তায় ফেলে দিতে আমার সময় লাগবে না। ভাইকে নিয়ে কী করবি? নিজে কী করবি? তোর মায়ের কাজ যাতে বন্ধ হয় সেটাও দেখব। বল কী চাস? থানার সামনে দাঁড়িয়ে মাগিবাজি করবি, না কাজ করবি? বল মাহির, বল…”
