পরানদা লোকটার মোবাইল রিপেয়ারিং-এর দোকান আছে পাড়ায়। ভাল বাড়ির ছেলে। অবস্থার গতিকে এখন জীবন পড়তির দিকে। কিন্তু এখনও একটা বনেদিয়ানা আছে চেহারায়। বেশ মোটা গোলগাল চেহারা। টকটকে ফরসা রং। সারাক্ষণ পান খায়। দেখলে অনেকেই মারোয়াড়ি ভেবে হিন্দিতে কথা বলে!
সেদিন পরানদাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল মাহির। ও যে এখন রিতুদার সঙ্গে আছে, সেটা মোটামুটি জেনে গিয়েছে সবাই। আগে মাহির এটা কাউকে জানাত না। কিন্তু এটা বুঝেছে যে, এ বাজারে কিছুই ঢাকা থাকে না। সব বেরিয়ে পড়ে। তাই এই ব্যাপারটা ও আর লুকোয়নি। তাতে অবশ্য লাভই হয়েছে। এখন কাউকে কিছু বললে আর না করে না।
ও পরানদাকে বলেছিল, “তুমি আজ আমার সঙ্গে যাবে একটা মলে। কাজ আছে। রিতুদার কাজ। ভাল জামাকাপড় পরে নেবে, কেমন! একজন লোক আছে। তার পাশে বসবে। খাবে। আর শুনবে কী বলে। এটা ইমপর্ট্যান্ট কিন্তু।”
ঠিক তারক এসেছিল সেই মলে। একজন ভদ্রমহিলাও এসেছিল দেখা করতে। পরানদা পাশের টেবলে বসেছিল। কাস্টমার সেজে খাচ্ছিল বসে। রেস্তরাঁর বাইরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে মাহির দেখছিল তারক পরানদাকে কিছু বলছে। ও হাসছিল মনে মনে! তারক তো জানে না, পাশে কে বসে রয়েছে!
যে-মহিলাটি দেখা করতে এসেছিল, তাকেও খুব চেনা লাগছিল ওর। কিন্তু মনে করতে পারছিল না। আর সত্যি বলতে কী, ওসবে মনও ছিল না মাহিরের। তারকের দিকেই চোখ ছিল ওর।
কাজ শেষ করে পরানদাকে সোজা রিতুদার কাছে নিয়ে গিয়েছিল মাহির। পাশের টেবিলে বসে পরানদা যা শুনেছে সব বলে দিয়েছিল গড়গড় করে!
রিতুদা খুশি হয়েছিল খুব। কিন্তু চিন্তিতও দেখাচ্ছিল। পরানদা চলে যাওয়ার পর সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল মাহির, “কী হয়েছে রিতুদা? আপনি কিছু আশঙ্কা করছেন?”
রিতুদা বলেছিল, “কী জানিস তো, অন্য সব কিছুর মতো আমাদের পার্টিতেও নানা দল, উপদল, কাঠিবাজি আছে। তারকের সঙ্গে পার্টির কিছু নেতার র্যাপো ভাল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ওই অঞ্চলে তারক একটা ফ্যাক্টর। তাই সরাসরি ওকে কিছু করা যাবে না। হাইকম্যান্ডকে বললেও, তারা সব শুনেও সবসময় কিছু করে না। প্লাস তারক তো আর সব টাকা একা গিলবে না! ভাগ করবে। তাই… ভাবছি!”
“ওই দেখ, দাঁড়িয়ে আছে!” থানার সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে টিটি সামনের দিকে হাত তুলল।
টিটির বাইকটার এমন আওয়াজ যে, না তাকিয়ে উপায় নেই। মাহির দেখল পলি ওদের দেখেছে!
মাহির সময় নষ্ট না করে বাইক থেকে নেমে এগিয়ে গেল পলির দিকে। পলি হাতঘড়িটা দেখে বিরক্ত মুখে বলল, “সাড়ে ছ’মিনিট লেট! আমার বুঝি সময়ের দাম নেই! ওদিকে স্যার গাড়িতে ওয়েট করছেন!”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না। আমতা-আমতা করে বলল, “আমি আসলে বুঝতে পারিনি। মানে…”
পলি হঠাৎ এগিয়ে এসে বলল, “আরে, গালে কী হয়েছে? এমন লাল কেন?”
সর্বনাশ! তুয়াদি কামড়ে দিয়েছে আজ! এটা ভুলে গিয়েছিল মাহির।
ও বলল, “আর বোলো না, ভাই মাঝে মাঝে এমন করে! আঁচড়ে দিয়েছে!”
“ও!” পলি আলতো করে ছুঁল ওর গালটা। মাহিরের মনে হল খোলা ইলেকট্রিকের তারে হাত লেগে গিয়েছে ওর।
পলি বলল, “যাকগে। তোমার মোবাইলটা এখনও তুমি ফেললে না! আমি কতবার ফোন করছি পাচ্ছি না! কী টিটি, বন্ধুকে একটা নতুন মোবাইল কিনতে বলতে পারো না?”
টিটি হাসল। অপ্রস্তুত মুখে হেঁ হেঁ করল একটু। মাহির বুঝল, পলির আলো লেগে টিটিও অন্ধ হয়ে গিয়েছে!
মাহির আস্তে করে বলল, “অন্য গ্রহের নেটওয়ার্ক আমার মোবাইলে ধরে না!”
“মানে?” পলি ভুরু কুঁচকে তাকাল, “অন্য গ্রহ মানে কী? আমি এলিয়েন নাকি?”
মাহির কিছু না বলে হাসল শুধু।
পলি বলল, “দাও, তোমার মোবাইলটা। দেখি!”
“আমার মোবাইল?” এবার একটু ঘাবড়ে গেল মাহির। এই রে, ওটা বের করতে হবে! ওই ঘষা, রংচটা, রাবার ব্যান্ড লাগানো মোবাইলটা! ওটা তো ওর কাঙালপনার সাইনবোর্ড! সেটা দেখে কী করবে পলি?
“না তো কী? দেবে, নাকি আমি প্যান্টের পকেট থেকে বের করে নেব?”
“আরে,” হেসে মোবাইলটা বের করে দিল মাহির। পেছন ফিরে একবার টিটিকেও দেখে নিল। দেখল, টিটি শান্ত ছেলের মতো চুপ করে আছে।
পলি মোবাইলটা নিয়ে দেখল ভাল করে। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল, “এই নাও। এটা তোমার।”
“আমার?” মাহির অবাক হয়ে তাকাল।
“হ্যাঁ। মোবাইল আছে। দ্যাখো। আর এই মান্ধাতার আমলের জিনিসটাকে আজকেই ছুড়ে ফেলে দেবে। তোমার লজ্জা লাগে না!”
লজ্জা! মাহির মাথা নিচু করে নিল। লজ্জা জিনিসটা আর আসে না ওর। সবাই তো ওর জীবনের কঙ্কাল দেখে ফেলেছে। সেখানে আর লজ্জা পেয়ে কী করবে। আচমকা চোখে জল এসে গেল ওর। এমন তো কেউ কোনওদিন করেনি ওর জন্য!
পলি বলল, “কী হল নাও! অত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? এটা দিতেই ডেকেছিলাম।”
সংকোচের সঙ্গে মোবাইলটা নিল মাহির। চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। ইস! তুয়াদির সঙ্গে শুয়ে এখানে এসেছে ও! পলিকে মিথ্যেও বলল দাগের ব্যাপারে। আর সেখানে মেয়েটা ওকে এসব দিচ্ছে! ও কী পাষণ্ড! শয়তান! পলিকে ঠকাচ্ছে ও!
মাহির হাসার চেষ্টা করল, “সেদিন তো আমায় রেস্তরাঁয় খাওয়ালে। আবার আজ এটা…”
“প্লিজ়, ন্যাকামো করবে না,” পলি বলল, “আর সেদিন যা হল!”
