“আমার একটা কাজ আছে,” মাহির গম্ভীর গলায় বলল।
“কা…” শব্দটা মাঝপথে থামিয়ে টিটি তাকিয়ে রইল, “শালা, আবার পলি!”
“পাঁচ মিনিট। প্লিজ়,” মাহির বলল, “টালিগঞ্জ থানার সামনে আসবে। পাঁচ মিনিট জাস্ট।”
“তুই মাইরি আবার রেশমি পার্ট টু করছিস নাকি?” টিটি সন্দেহের চোখে তাকাল, “তোর লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন কিছুই তো ভাল ঠেকছে না!”
মাহির ওর বাইকের পেছনে উঠে পড়ল। পুরনো বাইক! স্প্রিংগুলো সামান্য ককিয়ে উঠল মাহিরের চাপে।
ও বলল, “একবার ঘুরে চল প্লিজ়। আর্জেন্ট!”
টিটি নিজের মনে মাথা নাড়ল, “প্যান্টে আগুন লাগলে শালা সবার সবকিছু আর্জেন্ট হয়।”
মাতৃভবন হাসপাতালের সামনে দিয়ে না গিয়ে সামান্য ঘুরে থানার দিকে এগোল টিটি। মাহিরের ভাল লাগল। টিটি যতই ওকে বকাবকি করুক, আসলে ছেলেটা ওকে ভালবাসে খুব। হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে পার্টি অফিসের মোড়টা পড়ে, তাই চিনুদার গ্যারেজের রাস্তাটা ধরেছে টিটি।
রিতুদা রেগে আছে! মনে মনে ভয় করছে মাহিরের। কিন্তু পলির সঙ্গে দেখা না করে ও যেতে পারবে না। আর রিতুদার কাজ তো ও করে দিয়েছে। তারক চক্রবর্তী। আইকা। নোঈ। সব তো খবর রাখছে। তা হলে কেন রেগে আছে রিতুদা! রিতুদার কাজে তো ওরা ‘না’ করে না! তা হলে!
যোগেনের ব্যাপারটার পরে রিতুদা মাহিরকে বেশ নির্ভর করতে শুরু করেছে। এতে অবশ্য নানা লোকের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু রিতুদা জানে কাকে কীভাবে রাখতে হয়।
যোগেনের ব্যাপারটা মিটিয়ে আসার সপ্তাহখানেক পরে আবার রাতে, সবাই চলে যাওয়ার পরে রিতুদা ডেকেছিল মাহিরকে। বলেছিল, “ওই যন্ত্রটা নিয়ে আসিস।”
রিতুদার টেবিলে গিয়ে পিস্তলটা রেখেছিল মাহির। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল ও। এটা খুব ভয়ের একটা জিনিস। তারপর মা যদি দেখে ফেলত তবে তো হয়ে গিয়েছিল!
রিতুদা বসতে বলেছিল ওকে। পিস্তলটা নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে বলেছিল, “তোর জন্য একটা কাজ আছে।”
“কাজ!” আবার কাজ! আবার কাউকে পেটাতে হবে নাকি! মাহিরের মুখটা তেতো হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। শেষপর্যন্ত ও ভাড়া করা গুন্ডা হয়ে গেল! কোথায় ভাবত কানাভারোর মতো ডিফেন্ডার হবে, তা না পুরো মাস্তান বানিয়ে দিল জীবন!
“ভয় নেই,” রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে একটা লজেন্স বের করেছিল পকেট থেকে। বলেছিল, “এবার আর মারামারি করতে হবে না। শোন, সোনাঝুরিতে বড় প্রজেক্ট আসছে। কিন্তু সেখানে আমাদেরই পার্টির তারক চক্রবর্তী বলে এক নেতা আছে। মালটা খুব সেয়ানা। সে বিশাল হাঁ করে বসে আছে! আমাদের কাছে খবর এসেছে যে, সেই জন্য ঝামেলা হতে পারে। তা ছাড়া আমাদের পার্টিরও নাম খারাপ হচ্ছে ওখানে। তাই আমায় বলা হয়েছে ওর ওপর নজর রাখতে। তুই একটু খবর নে যে, আসলে কেসটা কী। সত্যি কি তারক অমন হাঁ করে বসে আছে? নাকি অন্য গল্প আছে এর মধ্যে?”
কথা শেষ করে রিতুদা তাকিয়েছিল ওর দিকে, “এটা পারবি তো? আর শোন, তোর জন্য একটা জিনিস আছে।”
জিনিস! কী জিনিস সেটা বুঝতে পারেনি মাহির। দেখেছিল, রিতুদা একটা কাঠের বাক্স বের করে সামনে রেখেছিল। তারপর সেটার ঢাকনা খুলে বাড়িয়ে দিয়েছিল সামনে, “এটা রাখ। নাইন এম এম চাইনিজ় মাল। চারবার ফুল ম্যাগাজ়িন ফায়ার করলেও গরম হয় না। হাতে ফাটার চান্স নেই। আর যখন-তখন লক হয়েও যায় না। বুঝেছিস? পার পিস কত জানিস? পঞ্চান্ন! রাখ এটা। চালাবি না দরকার না পড়লে। জাস্ট দেখাবি। ওই ফোঁস!”
মাহির নিরুপায় হয়ে তাকিয়েছিল পিস্তলটার দিকে। রিতুদা বলেছে, তখন আর কী করে না করবে! একবার যখন খেলায় ঢুকেই পড়েছে, পিছিয়ে আসবে কী করে! ওর মাস-মাইনের টাকা। ভাইয়ের চিকিৎসা সবটাই তো মাথায় রাখতে হবে।
তোয়ালে মুড়ে আবার আগের মতো লুকিয়ে রেখেছিল জিনিসটা।
কিন্তু ওর মনে হয়েছিল এই কাজটা আগের চেয়ে সহজ।
সোনাঝুরি জায়গাটা বেশ। সুন্দর সাজানো একমুঠো মফস্সল। পাশ দিয়ে গঙ্গা বয়ে গিয়েছে। আর এই ছোট্ট জায়গায় তারক চক্রবর্তী একটা বিশাল বড় নাম! সবাই যে ভয় পায় তারককে, সেটা বুঝেছিল মাহির। আর এও জেনেছিল প্রাথমিকভাবে তিন-চারটে পার্টি থাকলেও এখন এই জমি, জুটমিল আর বড় ওই জোনাক-বাড়িটা কেনার দৌড়ে দু’জন অবশিষ্ট আছে। বাকিরা তারকের হাঁ মুখ দেখে গন্ডগোলের আভাস পেয়ে সরে পড়েছে। রিতুদার খবর যে ভুল নয় সেটা বুঝতে পেরেছিল।
আরও কিছুদিন খবর নেওয়ার পরে ও জানতে পেরেছিল, তারক ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিটেলর্স’ নামে একটা সংস্থার সঙ্গে কলকাতায় গোপন মিটিং করবে।
মাহির জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য মোতিবাবু? আমায় বুলু দিচ্ছেন না তো?”
সোনাঝুরিতে গিয়ে এই মোতি নামে লোকটাকেই ধরেছিল মাহির। নরমে-গরমে বুঝিয়ে দিয়েছিল ও কার কাছ থেকে আসছে। বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওর মাথায় পার্টির হাত আছে। ওকে সাহায্য না করলে বিপদ আছে।
মোতি বোকা লোক নয়। রিতুদার নাম জানে। ক্ষমতাও বোঝে! তা ছাড়া এই সব লাইনে কেউ কারও হয় না। তাই নিজের আখের গোছাতে, রিতুদার গুড বুকে থাকতে চেয়ে মোতি বলেছিল, ও ঠিক খবর দেবে। শুধু সময়মতো ওকে যেন মনে রাখে রিতুদা!
মোতি বলেছিল, “আরে মাহিরভাই, আমি কেন সেধে ঢপ মারতে যাব? বলেইছি ফুল কো-অপারেশন করব। আপনি চলে যান রাজডাঙার পাশের নতুন বড় মলটায়। বিকেলে। তারকদা কথা বলবে একজনের সঙ্গে। ওই জমির কেসটা নিয়ে টাকাপয়সার কথা বলবে একটা রেস্তরাঁয় বসে। যান, দেখুন কী হয়!”
