ও তখন সবে খাবার খেয়ে বাসন মেজে সাজিয়ে রাখছিল রান্নাঘরে। টিটি এসে বাইরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওকে।
মা বিরক্ত হয়েছিল খুব। বলেছিল, “ওই মর্কটটা এখন এসেছে কেন এখানে?”
“কাজ আছে,” মাহির আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে।
মা বিরক্ত গলায় বলেছিল, “রাত বাড়লে কাজ বাড়ে যদি, তবে সেখানে গন্ডগোল হবেই!”
এসব বাজে কথা। আজকাল রাত আর দিনের পার্থক্য নেই! সারাক্ষণ মানুষজন ফাটিয়ে কাজ করে যাচ্ছে! স্যার বলতেন, “কাজের সময় হয় না। কাজ হল ঈশ্বর মাহির। অলস মানুষ আর খারাপ মানুষে জানবি কোনও পার্থক্য নেই!”
মাহির অলস নয় মোটেই। কিন্তু ও কি খারাপ হয়ে যাচ্ছে না! সেদিন টিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগে স্যারের মুখটা খুব মনে পড়েছিল মাহিরের। কেন কে জানে কষ্ট হয়েছিল খুব। মনে হচ্ছিল স্যারকে ধোঁকা দিচ্ছে কি মাহির!
“শোন, রাস্তা ইস্মুদ। আমি দেখে এসেছি। খবরও নিয়ে এসেছি। লোকটা রোজ বিকেলবেলা একা হাঁটতে বেরোয়। দু’জনে যাব। পুঁচকে মাল। তোর ব্যাক পকেটে এঁটে যাবে। তুলে ঝোপের ধারে নিয়ে গিয়ে ঠুসে দেব, ব্যস। ইজ়ি কাজ।”
মাহির চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “ধরা পড়ে গেলে!”
“দুর! ভাটের কথা বলিস না। কোন শালাটা ধরবে আমাদের?” টিটি বিরক্ত হয়ে মাথার ব্যান্ডটা ঠিক করেছিল, “শালা, ওখানকার বহুত পাবলিক খেপে আছে ওর ওপর। আমি পালানোর পথ দেখে এসেছি। ভাবিস না।”
মাহির তাও তাকিয়েছিল টিটির দিকে।
টিটি ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, “শালা, গরিব হয়ে তো দেখলি কেমন লাগে! এবার এসব পেঁয়াজি ছাড়! তোর ওই স্যার আর বেঁচে নেই মাহির। তোর ভাই আর মা কিন্তু বেঁচে আছে!”
কাজটা করতে অসুবিধে হয়নি মাহিরের। শুধু প্রথম লাথিটা মারার আগে কেন কে জানে, লোকটার সামনের দাঁতটা দেখে মনে হয়েছিল, ওর বাবার সামনের দাঁতটাও এমন ভাঙা ছিল না?
আর নিজের ঘরে গেল না মাহির। ভেবেছিল স্নান করবে। কিন্তু সময় নেই। পলি আসবে আজ। টালিগঞ্জ থানার সামনে আসবে বলেছে। কী দরকার মেয়েটার জানে না। কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলেছে মাহির যেন পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও দেখা করে ওর সঙ্গে!
এইভাবে পলির কাছে যেতে মন থেকে সাড়া পাচ্ছে না মাহির। কিন্তু সাড়ে ছ’টায় মেয়েটা আসবে বলেছে, তাই আর সময় নেই।
এমনিতেই সারা জীবন মেয়েদের খুব একটা সান্নিধ্য পায়নি মাহির। ওর বয়েজ় স্কুলের জীবনে সেভাবে সু্যোগ হয়নি। প্রাইভেটেও কারও কাছে পড়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। তাই দূর থেকে মেয়েদের দেখত। সেই জন্যই কি না কে জানে, রেশমিকে দেখে মাথা পুরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। মনে হয়েছিল এই মেয়েটা যেন ওর সঙ্গে কথা বলে, পাত্তা দেয়। এই মেয়েটাকে ছাড়া আর থাকবে কী করে? ওর তুচ্ছ আর যন্ত্রণার জীবনে রেশমিই ছিল একমাত্র জানলা! নিজের সবটা দিয়ে মেয়েটাকে ভালবেসেছিল মাহির। কিছু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেনি। কিন্তু সেই মেয়েটা ওকে দায়ে-দফায় নানাভাবে ব্যবহার করে শেষপর্যন্ত ছেড়ে চলে গেল নিজের চেয়ে অনেক বড় একটা লোকের সঙ্গে! কেন? না লোকটার টাকা বেশি বলে!
মাহির সেদিন থেকে বুঝেছিল, টাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওর যদি অনেক টাকা থাকত, রেশমি কি ওকে ছেড়ে যেত!
একটা সর্বস্ব-খোয়ানো প্রেম চলে গেলে যা হয়, মাহিরের তাই হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে কঙ্কালের শহর বুকে নিয়ে ঘুরছিল ও। মনে হত আর কোনওদিন কাউকে ওর ভাল লাগবে না। কিন্তু পলিকে দেখে সব আবার গুলিয়ে গিয়েছে মাহিরের। এমন কোনও মেয়ের সান্নিধ্য তো পায়নি কোনওদিন! সেখানে পলি ওদের বাড়িতে এসেছে ওকে খুঁজতে! ওকে নিয়ে ঘুরেছে। ওকে মেসেজ করে। ও তো ভাবতেই পারছে না! একদিন রাস্তা পার হওয়ার সময় তো ওর হাতটাও ধরেছিল!
আজকাল ভোরবেলা অর্ধেক ঘুমের মধ্যে প্রায় রোজ পলিকে দেখে ও। নিজের পাশের কোলবালিশটা মনে মনে পলির সঙ্গে পালটে নেয়! নিজেকে কোলবালিশের সঙ্গে গেঁথে দিতে-দিতে কল্পনা করে পলি ভালবাসায়, আরামে ওকে আঁকড়ে ধরে আছে কাবুলি বিড়ালের মতো!
সেই পলি যদি ডাকে, তা হলে ও না গিয়ে থাকবে কেমন করে!
রাস্তায় বোঁচাদার পানের দোকানের সামনে টিটি দাঁড়িয়েছিল। ওকে দেখে বাইকে স্টার্ট দিয়ে বলল, “শালা, থাকিস কোথায়? ফোন করছি পাচ্ছি না? যা এক পিস মোবাইল রেখেছিস না! বাবরের আমলের! অর্ধেক সময়ে তো পাওয়াই যায় না। রিতুদা দুপুরে ঢুকে তোকে খুঁজছে। খচে আছে কিন্তু। তুই চল তাড়াতাড়ি।”
মাহির দেখল টিটিকে। মাথায় ব্যান্ডটা ছাড়া বাকি সব কিছু পালটে গেছে ওর। এখন আর অটোর কথা বলে না। রিতুদার দাক্ষিণ্যে টাকা লেগেছে ওর গায়ে! ভাল জামা, জিন্স। জুতোটাও বেশ দামি মনে হচ্ছে! গলায় একটা সোনার চেন দেখল আজ! লোডশেডিং-এ রাংতার মতো চকচক করছে টিটি।
“ক্যালানে হয়ে গেলি নাকি? কানে কথা যাচ্ছে না? রিতুদার মটকা গরম হয়ে আছে। বিশে, পগা আর নুলো লাগিয়েছে যে, তুই আজকাল আর নিয়মিত অফিসে আসিস না। তোর নাকি পাখনা গজিয়েছে! মাগিবাজির অলিম্পিকে নাকি সোনা জিতেছিস! রিতুদা বলছে তোকে যে-কাজ দিয়েছিল, সেটাও নাকি ঠিকমতো করিসনি! শালা, তুই মরবি আর আমাকেও ক্যাওড়াতলায় চালান করবি! চল তাড়াতাড়ি!”
