মাহির কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী সাংঘাতিক একটা ফাঁদে আটকে যাচ্ছে! কাউকে এসব বলতে পারবে না। কিন্তু সহ্যও করতে পারছে না! এর থেকে বেরোবে কী করে? ও ঘর থেকে বাইরে যাবে বলে পা বাড়াল।
তুয়াদি বলল, “পাশের গলিটা দিয়ে যাবি। না হলে দুই বউদি দেখতে পাবে। আবার খিস্তি শুরু করবে ঢেমনি মাগিগুলো!”
দাদাদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকলেও তুয়াদির ঘরটা একেবারে আলাদা। ঢোকার পথও আলাদা। তাই এখানে এলে চট করে কারও চোখে পড়ে না।
তুয়াদি বলল, “আমি মেয়ে বলে কি আমার সেক্স করতে ইচ্ছে করতে পারে না? আমার তোকে ভাল লাগে। অনেকদিন থেকেই লাগে। এটা তুই বুঝিস না? আমি জানি আমাদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক সামাজিকভাবে হয়তো হতে পারে না। কিন্তু যেটুকু পাওয়ার চান্স আছে, সেটা আমার চাই। তার জন্য আঙুল বাঁকাতে হলে বাঁকাবই!”
মাহির আর দাঁড়াল না। ওর সারা শরীর কেমন করছে। যৌনতার একটা টান আছেই। কিন্তু একবার সেটা শেষ হয়ে গেলে তার যে কী তীব্র বিরাগ, সেটা বুঝতে পারছে মাহির। আর শুধু তা নয়, ওর মনের মধ্যে একটা তীব্র অপরাধবোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই শরীর নিয়ে ও কীভাবে যাবে পলির কাছে!
পলি। নামটা মনে করলেই শরীরের ভেতরে যেন কেউ কর্পূর ভরে দেয় মাহিরের। কেন এত ভাল লাগে ওর পলিকে! কী স্মার্ট আর খোলা মনের মেয়ে! কী উদ্যোগী! শুনেছে ওই ওল্ড এজ হোমটার সঙ্গে অনেকে যুক্ত! কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তো শুধু পলিকেই দেখে একা হাতে সব সামলাতে।
রিতুদাকেও ভাল বলতে হবে। এককথার মানুষ! প্রথমে টালবাহানা করলেও পরে ঠিক ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কুড়ি লাখ টাকার একটা ফান্ড দিয়েছে ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’-কে! তবে মাহির জানে, এমনি-এমনি তো আর সেটা হয়নি।
ভাল করে দেখে, কাগজ তৈরি করে রিতুদাকে যেদিন ও সব কথা বলেছিল, যেদিন পলির তৈরি রিপোর্টটা দিয়েছিল, রিতুদা কিছু দেখেনি। শুধু বলেছিল, “ক্লাব জায়গা দখল করে রেখেছে সেটা তুলতে সময় লাগবে। ওদের ছেলেরা আমার খাস লোক। কিন্তু তার বদলে আমি ওদের একটা ফান্ড দিয়ে দিচ্ছি। আপাতত সেটা দিয়েই তুই হিরো হ, বুঝলি! শুধু আমার নামটা যেন লিখে দেয় সামনে, সেটা দেখবি। আর ভাই, আমি তোমার হিরো হওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তোমাকেও তো কিছু করতে হবে। তাই না?”
সামান্য ভয় পেয়ে গিয়েছিল মাহির। সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল অনেক। পার্টি অফিস ফাঁকা ছিল। বাইরে দরজার কাছে চারটে ফড়ে বসে শুধু আড্ডা দিচ্ছিল।
রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মাথার ঘাম মুছতে-মুছতে বলেছিল, “কয়েকটা ভেড়ি আছে। ওই গঙ্গানগর ছাড়িয়ে। বেশ কয়েকমাস হল ওরা টাকাপয়সা দিচ্ছে না। কথাও শুনছে না। তুই জাস্ট যাবি। মানে, তুই আর টিটি। তোরা দু’জন অপেক্ষাকৃত নতুন, তাই তোদের কেউ আটকাবে না। যোগেন বসাক বলে একটা লোক আছে। ও-ই সব কন্ট্রোল করে। জাস্ট গিয়ে মালটাকে উদোম কেলিয়ে দিবি। আনখাই মারবি আর কী! তুই তো ক্যারাটে জানিস। ওকে ‘মা’ বলতে দিবি না। জাস্ট মেরে বেরিয়ে আসবি। চেনা লোক গেলে আগে থেকেই যোগেন সাইডিং হয়ে যাবে। আর আসার আগে ওর কানের গোড়ায় এটা ধরবি। বলবি টাকা না পৌঁছলে বাড়িসুদ্ধু জ্বালিয়ে দেওয়া হবে! এই নে এটা রাখ।”
কথা শেষ করে রিতুদা পাশের ড্রয়ার থেকে একটা পিস্তল বের করে রেখেছিল সামনে। বলেছিল, “এটা সেভেন এম এম। মুঙ্গেরি মাল। ভাল। এটা রাখ। না, চালাতে হবে না। শুধু বের করে দেখাবি।”
“মুঙ্গেরি!” মাহিরের চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছিল বাইরে! কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কী করা উচিত ওর! হাত কাঁপছিল মাহিরের। কান লাল হয়ে গিয়েছিল। মায়ের মুখ মনে পড়ছিল।
রিতুদা ওকে দেখে হেসেছিল। তারপর সামনে রাখা বোতল থেকে জল খেয়ে বলেছিল, “আগেও একবার এমন করে কাঁপছিলি। সেই একই ঢ্যামনামো আর করবি না। নে, তোল ওটা। কিছু হবে না। ইউজ় করতে হবে না। জাস্ট দেখাবি। এটা হল ঠাকুরের সেই ফোঁস। বুঝলি?”
মাহির বুঝতে পারছিল, কুড়ি লাখ টাকা অনুদান আসলে একটা ফাঁদ। ও কী করবে বুঝতে পারছিল না। এ কোন পথে এগোচ্ছে ও!
রিতুদা ওকে দেখেছিল ভাল করে। তারপর পাশে রাখা একটা প্যাকেট থেকে লজেন্স বের করে মুখে পুরে বলেছিল, “শোন, এটা তোকে করতে হবে। ওখানে কেউ ঢুকতে পারছে না। যোগেন আমার সব ছেলেপিলেকে চেনে। তোকে আর টিটিকে এখনও চেনে না। লাস্ট ন’মাস একটা টাকাও ও ঠেকায়নি। জানবি সব কিছুর দাম আছে। ওই যে পলির ফরসা চামড়া দেখে পিছলে গিয়েছিস তুই, তার তো একটা দাম দিতে হবে বাবু! তোল ওটা। ইউজ় করবি না। জাস্ট রাখবি। কিছু হলে আমি তো আছি।”
পিস্তলটা নিয়ে বাড়িতে এসে কোথায় যে রাখবে, বুঝতে পারছিল না মাহির। অনেক ভেবে খেলার কিট ব্যাগে একটা তোয়ালে জড়িয়ে রেখে দিয়েছিল। সেদিন মাহির বুঝেছিল সত্যিকারের জীবনে হিরো হওয়ার দাম কী! বুঝেছিল, এই পৃথিবীতে বিনে পয়সায় দূষিত হাওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না!
যোগেন লোকটা দুবলা-পাতলা। পাঁচ ফুট দু’ইঞ্চি হাইট। সামনের একটা দাঁত নেই। দেখলে কেউ ভাবতেই পারবে না এই ভাঙাচোরা টাইপের লোকটার এমন প্রতাপ!
গঙ্গানগর জায়গাটার চারিদিকে মাছের ভেড়ি। আসল কাজে যাওয়ার আগে একদিন টিটি বাইক নিয়ে ঘুরে এসেছিল ওখান থেকে। তারপর রাতে বাড়িতে এসেছিল মাহিরের।
