রাধিয়া দেখল ওর সঙ্গে টেবিলের সবাই চুপ করে গেছে। ওর হাসি পেল খুব।
“খালি হাবিজাবি…” নিস্তব্ধতা ভেঙে পলিই প্রথম কথা বলল। কিন্তু শেষ করতে পারল না বাক্যটা।
“রাধি!” বলে একটা চেনা গলার চিৎকার চাবুকের মতো সপাং করে আছড়ে পড়ল সবার মাঝে!
রাধিয়ার হাতে একটা ফ্রেশ লাইমের গেলাস ছিল। ও এত ঘাবড়ে গেল যে, হাত থেকে কিছুটা পানীয় চলকে ওর জামায় পড়ে গেল। ও দ্রুত ঘুরল। আর সঙ্গে-সঙ্গে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর! বাবা! এখানে বাবা কী করছে!
বাবা হনহন করে এসে রাধিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কী করছ এখানে তুমি? হাউ ক্যান ইউ মিঙ্গল উইথ পিপ্ল লাইক দিজ়! কাম, কাম উইথ মি!”
“বাবা,” রাধিয়া উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল।
“শাট আপ!” বাবা ফেটে পড়ল যেন, “চলো! আর কোনওদিন যদি এই প্যারাসাইটটার সঙ্গে আমি তোমায় দেখেছি তবে দেখো কী করি!”
বাবা যে নিশানকে বলছে, সেটা বুঝতে কারও বাকি রইল না।
নিশান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কী বললেন?”
“ইউ স্লাইমি ফাক, কে বলেছে তোমায় কথা বলতে!” বাবা ঘুরে দাঁড়াল নিশানের দিকে, “আমি ভাল করে গাড়িতে ডেকে কথা বলেছিলাম, ভাল লাগেনি, না? আজও তুই মিছিল করেছিস? তোর হুলিগানরা ফ্যাক্টরি গেটে ইট ছুড়েছে! আমি দেখাচ্ছি মজা! তারপর আবার আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিস! ইউ আর ব্লাডি ফিনিশড!”
নিশান বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলুন।”
রাধিয়ার হাত-পা কাঁপছে। ওর মনে হচ্ছে, যে-কোন সময়ে ও পড়ে যাবে মাটিতে। রেস্তরাঁর লোকজন এগিয়ে এসেছে।
ম্যানেজার গোছের লোকটি বলল, “স্যার, প্লিজ় ডোন্ট ক্রিয়েট আ সিন।”
“শাট দ্য ফাক আপ ইউ বাস্টার্ড!” বাবা এবার লোকটির দিকে ঘুরল, “তোদের এই রেস্তরাঁ আমি এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কিনব। রাধিয়া চলো। চলো!”
বাবা আর না দাঁড়িয়ে রাধিয়াকে টানতে-টানতে এগোতে লাগল। রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। নিশান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে এখনও।
বাবা বলল, “ভাগ্যিস, মধু আমায় খবর দিল যে, জানোয়ারটা এখানে আছে! আই টোল্ড হিম টু কিপ অ্যান আই অন ইউ।”
রাধিয়া টলতে-টলতে বাবার সঙ্গে এগোতে লাগল। ওর চোখের সামনে সব কিছু কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে! মধুদা বাবাকে খবর দিয়েছে! মধুদা এমন করল! তাই আজ মধুদা… কিছু আর ভাবতে পারছে না রাধিয়া।
ও দেখল নিশানও এগিয়ে আসছে।
বাবা শেষবারের মতো পিছনে ঘুরল। বলল, “তোকে দেখ জানোয়ার কী করি আমি! দেখ! জাস্ট ফাকিং ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!”
নিশানও গলা তুলল এবার। তারপর রাধিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই জন্য। এই জন্য আমি ফোন করিনি তোমায়! আমি জানতাম তোমার বাবা কী ধরনের মানুষ! বুঝলে!”
রাস্তায় হলুদ আলোর মধ্যে আরও বেশি করে বাদামি ছোপ পড়েছে যেন। সব কিছু কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে চারদিকে। চাপ-চাপ অন্ধকার ক্রমে মুড়ে নিচ্ছে চারিদিক। মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলোর গায়ে যেন জমে উঠছে বীভৎস পোকা! পচা গলা টিকটিকি আর ইঁদুর যেন ছড়িয়ে আছে চারিদিকে! সামনের বাড়িগুলোর গায়ে অজস্র ফাটল। রাক্ষসের মুখের মতো হাঁ করে সব দাঁড়িয়ে রয়েছে সার-সার! জলের ওপর থেকে ভেসে আসা হাওয়ায় যেন সোরা আর গন্ধকের ঘ্রাণ। রাস্তার পিচ যেন হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরছে ওর পা। এ আর কোনও সুন্দর শহর নয়। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা!
রাধিয়া টলমলে পায়ে গাড়ির দিকে এগোল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, গাড়িটা নেই ওর সামনে। বরং বিশাল বড় একটা ড্রাগন যেন ওকে গিলে নেবে বলে মুখ খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে! সে তার অস্থির ডানা ঝাপটাচ্ছে! লেজের আছড়ানিতে ফাটিয়ে দিচ্ছে মাটি! চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরোচ্ছে তার! রাধিয়া বুঝল ছোটবেলার কিছু জিনিস অন্যভাবে হলেও ঠিক বেঁচে থাকে বড়দের এই পৃথিবীতে!
৩০. মাহির
ও যতবার ভালবাসতে যায়, জীবন ওকে হারিয়ে দেয়। আচ্ছা ও কি মানুষ না জ়িম্বাবোয়ে ক্রিকেট টিম! কিছুতেই কিছু করতে পারে না! সারাক্ষণ ‘হেরো’ লেখা একটা অদৃশ্য জামা যেন পরে থাকে ও। হাজার চেষ্টাতেও সেটা খুলতে পারে না।
আবছা অন্ধকার হয়ে আছে ঘরটা। সন্ধে হয়েছে কিছু আগে। তার ওপর ঘরের আলোও নেভানো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না মাহির। এই ঘরে ও আসে মাঝে মাঝে, কিন্তু তাই বলে অন্ধকারে সব ঠিকমতো বুঝে নেবে তেমন পরিচিতও নয়।
বিছানায় উঠে বসে পায়ের কাছে হাতড়ে প্যান্টটা খুঁজল মাহির। কোথায় যে ফেলেছে বুঝতে পারছে না। বিছানাতেই তো রেখেছিল, কিন্তু এখন পাচ্ছে না কেন! মহা মুশকিল তো।
মাহির ভাল করে হাতড়ে দেখতে চাইল।
“কী হল? কী করছিস?” অন্ধকারের মধ্যে তুয়াদির গলা পেল মাহির।
“আমায় যেতে হবে তুয়াদি। আজ রিতুদা ফিরেছে দিল্লি থেকে। সেই দুপুরে ফিরেছে। আমার দেখা করতে যাওয়ার কথা। খুব আর্জেন্ট কাজ আছে! একজন আসবে। তাই…” মাহির এবার বিছানার পাশে রাখা টেবিলের দিকে ফিরল। সেই রাবার ব্যান্ড বাঁধা মোবাইলটা রাখা আছে। পরান সারিয়ে দিয়েছে আবার। তবে কতদিন চলবে কে জানে। মাহির ভাবল, মোবাইলটার স্ক্রিনের সামান্য সাদা আলোয় যদি খুঁজে পাওয়া যায়।
“তাই কী?” আবছায়ার মধ্যে তুয়াদি মাহিরের হাতটা ধরল, “আমার আবার ইচ্ছে করছে।”
