রাধিয়া দেখল, স্মরণ অবাক মুখ করে বুদাকে দেখছে।
“কিছু না,” জয়তী বুদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “পাগলি একটা! চুপ কর। মাথা তোল। এত ওয়ার্কড আপ হয়ে থাকিস কেন? আমরা তোর বন্ধু না? আমরা কেন তোকে জাজ করতে যাব? এসব করিস না। পাগলি নাকি তুই! মুখ তোল।”
জয়তীর কথায় বুদা মুখ তুলল। পলি নিজের ব্যাগ থেকে একটা টিসু বের করে গিয়ে দিল বুদার দিকে। বুদা সেটা নিয়ে চোখ মুছল। তারপর সামান্য সময় নিল। সামনে রাখা গেলাসটা থেকে জল খেল একটু। তারপর ভেজা গলায় বলল, “সবাই আমাদের বয়কট করেছে! আমি ভাবলাম তোরাও… সরি রাধি। আমি তোর সঙ্গে খুব খারাপ বিহেভ করেছি। আই ওয়াজ সো টেন্সড!”
স্মরণ এসে বসল রাধিয়ার পাশে। তারপর কাঁধের ঝোলা থেকে প্রায় আট-দশটা নানা রকমের খেলনা বের করে রাখল সামনে। সবই খুব সাধারণ, সস্তা খেলনা। ভেঁপু, গাড়ি, খেলনা মোবাইল ধরনের। সবাই অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।
স্মরণ সামনে চলা কান্নাকাটি পাত্তা না দিয়ে বলল, “একটা লোক খেলনা বিক্রি করছিল। যা স্পিচ দিল না, শাহরুখ খান ফেল! তাই কিনে নিলাম। যে যেটা খুশি নিয়ে নাও। শুধু এটা আমি নেব!” বলে একটা ছোট পুতুল তুলে নিল। বলল, “আমি এটা প্যাঁওকে দেব।”
পলি ছড়ানো খেলনা থেকে প্লাস্টিকের মোবাইলটা তুলে নিয়ে বলল, “এই যে স্মরণ, এখানে নিশানও আছে কিন্তু। তোমাদের এগেনস্টে প্রোটেস্ট করছে ও। কিন্তু সেই নিয়ে এখানে কোনও কথা হবে না। বুঝেছ?”
স্মরণ হাত তুলে বলল, “আমি কেন বলতে যাব। যে যার কাজ করছে। শুধু এটাই বলব যে, নিশানভাই, আমরা কিন্তু মিলটা চালাতে চাই। জোনাক-বাড়ি ভাঙতে চাই না। কিন্তু সেই নিয়ে আমি কিছু বলবই না!”
নিশান হাসল, “সবাই ওই বলেই ঢোকে তারপর আসল রং দেখায়।”
“কিন্তু আমরা তা নই। আমাদের আসল নকল, সবটাই একটা রং। কিন্তু আমি তো এই নিয়ে কিছু বলবই না!” স্মরণ এমন করে বলল কথাটা যে, হেসে ফেলল সবাই।
রাধিয়া দেখল, স্মরণ কথা বলার সময় সামান্য হাসল মাহিরের দিকে তাকিয়ে। আর মাহিরও ফিরিয়ে দিল সেই হাসি। কী হল! রাধিয়া কি ভুল দেখল? দু’জন দু’জনকে চেনে কি? তা হলে কেন এখানে সেটা লুকিয়ে গেল!
টেবিল ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলো এবার ধীরে-ধীরে সহজ হয়ে এল। পলিই দায়িত্ব নিয়ে খাবারের আর ড্রিঙ্কের অর্ডার করে দিল। আস্তে-আস্তে সবাই ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কথাও শুরু করে দিল।
রাধিয়া চোয়াল শক্ত করল। পাশে বসে থাকলেও নিশান এখনও কথা বলেনি ওর সঙ্গে। রাধিয়ার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু যা হয়েছে, সেটা তো ওর জন্যই হয়েছে!
রাধিয়া সবার কান আর দৃষ্টি বাঁচিয়ে নিচু গলায় বলল, “আমি সরি!”
নিশান হাসল সামান্য, “কেন?”
রাধিয়া বলল, “ইউ নো ইট। তাই জন্য তো তুমি আর আমায় মেসেজ বা ফোন কিছুই করো না!”
নিশান হাসল, “সেই জন্য নয়।”
রাধিয়া সামান্য অভিমানী গলায় বলল, “তবে কী জন্য?”
নিশান হাসল শুধু, কিছু বলল না।
রাধিয়া আবার বলল, “সেদিন বাবা আমার মোবাইলে তোমার কিছু মেসেজ দেখে আমায় চেপে ধরেছিল। আমি তো মোবাইলে কোনও সিকিয়রিটি রাখি না! বাবা এমন করে বলেছিল যে, আমি বাধ্য হয়ে বলেছিলাম তোমার কথা। বাবা সব শুনেছিল মন দিয়ে। তারপর বলল, তোমায় চেনে। যখন আমার বন্ধু হও, তা হলে যেন মিট করাই। আমি তখন বললাম যে, আজই তো দেখা হবে। তখন বাবা ইনসিস্ট করল, আমি যেন তখনই তোমার সঙ্গে দেখা করাই। খুব নাকি দরকার তোমার সঙ্গে! আমার বাবা খুব পারসুয়েসিভ। আমি খুব ভয় পাই বাবাকে। তাই আমি না করতে পারিনি। আই ওয়াজ় সো টেন্সড। ফলসার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারলাম না! কেয়াআন্টির নার্সিং হোমের সামনে দিয়ে ঘুরে গেলাম। আয়াম সো কাওয়ার্ড! কিন্তু বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারিনি বাবা এমনটা করবে। তোমায় যে এভাবে অপমান করবে, আই সোয়্যার, আমি বুঝতে পারিনি। পারলে আমি এমন করতাম না। নিয়ে যেতাম না বাবাকে!”
“কী রে, তোরা এমন নিচু গলায় কী কথা বলছিস?” সুম্পা টেবিলের অন্যদিক থেকে খিকখিক করে হাসল।
রাধিয়া লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেল।
নিশান বলল, “প্রাইভেট কথা। তোমাদের শুনতে হবে না!”
“তবে তো আমি শুনবই। আমিও শিখে নিয়ে প্যাঁওকে বলব! প্যাঁও খালি বলে আমি নাকি কোনও প্রাইভেট কথাই বলতে পারি না। সব কিছু নাকি পাবলিক হয়ে যায়! বাই দ্য ওয়ে পলি, প্যাঁওয়ের জন্য একটা খাবার প্যাক করে দেবে। ও চাইনিজ় খুব ভালবাসে। দেবে?”
পলি ভুরু কুঁচকে বলল, “ইস, কী করে বলছে দ্যাখো! আচ্ছা, সত্যি প্যাঁও বলে কেউ আছে?”
“কী বলে!” স্মরণ এমন করে বলল যেন আগ্রায় তাজমহল আছে কি না সেই নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ও বলল, “প্যাঁও দারুণ মেয়ে! ছোট্ট মুকুট কপাল। মুক্তোর মতো দাঁত। হাত-পা যা সুন্দর না! থুতনিতে সামান্য একটা টোল আছে। নাকে দু’পাশে দুটো ছোট্ট-ছোট্ট তিল। আর রঙ্গন ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট! যা দেখতে না! তবে হ্যাঁ। খুব রাগী। সারাক্ষণ রেগে থাকে আমার ওপর। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কী ঝাড় দেয় আমায়! বলে, ‘স্মরণ সরকার, বেশি বাড় বাড়বি না!’ আমিও তাই বাড়ি না বেশি। দেখছিস না আমার হাইটটাও কেমন কম করে রেখেছি! প্যাঁও-এর কথা আমি অমান্য করি না কখনও। ও যখন বলে, ‘দূরে থাক, দূরে থাক।’ আমি দূরে থাকি। যা বলে তাই করি। বুঝলি। আই লাভ হার এনাফ টু লেট হার গো। বুঝেছ!”
