কিন্তু পরে, মাথা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরে নিজের কাজের জন্য ওর কেমন একটা লেগেছে! নিশানকে বলতে পারার মধ্যে যেমন একটা আপনজনের ভাব আছে, তেমন এই ঘটনাটার মধ্যে ওর নিজের চারিত্রিক ইমব্যালেন্স আর দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে!
তাও নিশান আসবে শুনে ওর মনে হয়েছিল একবার যায়। নিশানের সঙ্গে একবার দেখা করে!
তেমন ভেবে রেডি হয়ে নিয়েছিল। মধুদাকে বলেছিল গাড়ি বের করতে। কিন্তু তারপর বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়েও মনে পড়েছিল, আরে, মোবাইলটা তো ফেলে এসেছে বসার ঘরে।
আর এটাতেই বিপদটা হয়েছিল। মোবাইলটা নিতে গিয়ে দেখেছিল বাবা ওর মোবাইল খুলে দেখছে!
“কী রে! তুই দাঁড়িয়ে পড়লি যে, আয়!” পলি ওকে হাত তুলে ডাকল।
রাধিয়া অপ্রস্তুতের মতো হেসে এগিয়ে গেল। বাকিদেরও দেখল এবার। পলির পাশে একটা ছেলে বসে রয়েছে। বসে থাকলেও বোঝা যাচ্ছে ছেলেটার চেহারা ভাল। ছেলেটাকে চেনা মনে হল ওর। আর বুদাও এসেছে। এ কী! বুদার এ কী হয়েছে! আর বুদার পাশে এটা কে!
সুম্পা বসেছিল নিশানের পাশে। রাধিয়াকে দেখে উঠে গিয়ে জয়তীর পাশে বসল।
বলল, “নে, তোর জায়গা ছেড়ে দিলাম। বোস।”
রাধিয়া দেখল সবাই হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে যেন! রাধিয়া কী করবে বুঝতে না পেরে বসল নিশানের পাশেই। এই নিয়ে কথা বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না।
ও দেখল আজও নিশান সেই কুসুম রঙের পাঞ্জাবি পরে এসেছে। পাশে বসতেই খুব সুন্দর একটা গন্ধ পেল ও। কিন্তু নিশানের দিকে তাকাতে পারছে না! সেদিন গাড়ির মধ্যের ঘটনাটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে!
পলি বলল, “তোকে আলাপ করিয়ে দিই। ও হল মাহির। আমাদের ওল্ড এজ হোমের যে-ফান্ড আমরা পেয়েছি সেটা ওর জন্য। রিতুদা নামে একজন পলিটিক্যাল লিডার আছে। এমপি। মাহির সেই রিতুদাকে বলে এটা করিয়ে দিয়েছে। আর মাহির, ও হল রাধিয়া। তোমায় তো ওর কথা বলেইছি!”
রাধিয়া হেসে মাথা নাড়াল। মাহিরকে দেখল এবার ভাল করে। ছেলেটাকে চেনা লাগছে ওর। বোঝা যাচ্ছে যে, ছেলেটার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। এখানে এসে খুব একটা শান্তিতে নেই। কিন্তু হাসিটা সুন্দর। বাচ্চাদের মতো! একটা ডিসআর্মিং ব্যাপার আছে!
“আর, বুদার ব্যাপারটা শুনেছিস তো?” জয়তী এবার মাঝখান থেকে কথা বলল।
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। বুদা ঠিকমতো তাকাচ্ছে না ওর দিকে। ওর মাথায় সিঁদুর দেখে বেশ ঘাবড়েই গেছে রাধিয়া! বিয়েটা করল কখন ও? আর ওদের একবারও জানাল না? এটা কেমন ব্যাপার!
বুদা তাকাল সকলের দিকে। তারপর বলল, “তোরা এমন করে আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন? আমি বললাম তো, এভাবে বিয়ে করতে আমি বাধ্য হয়েছি!”
জয়তী বলল, “ঠিক আছে। আমরা কি কিছু বলেছি? বলিনি।”
বুদা আবার বলল, “তোরাও তো খবর নিসনি আমার! নিয়েছিস? কী রে রাধি, নিয়েছিস?”
“আরে! তুই রাধিকে বলছিস কেন?” জয়তী বিরক্ত হল এবার, “ওর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিলি ভুলে গিয়েছিস? আর আমরা সবাই তোকে ফোন করেছি। মেসেজ করেছি! একটারও কিন্তু রিপ্লাই দিসনি। তোর কী হয়েছে? এমন বিটার হয়ে আছিস কেন?”
এবার ওর পাশে বসা ছেলেটা কথা বলল, “আসলে বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে টেনশন ছিল খুব। এখনও আছে। তাই হয়তো বুদা একটু অ্যাজিটেটেড হয়ে আছে!”
“কেন, কীসের টেনশন! বুদা যে প্রেম করত, আমরা তাই তো জানি না!” পলি অবাক হয়ে তাকাল।
“প্লিজ়,” নিশান আচমকা কথা বলে উঠল মাঝে, “আমি ঠিক তোমাদের গ্রুপের তো নই। সুম্পার দাদার বন্ধু। প্লাস ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ছিলাম। তাই আমার সামনে তোমরা এসব না বললেই বোধহয় ভাল। বুদা মে ফিল ডিসকমফর্ট!”
“না, না” বুদা উত্তেজিত হয়ে উঠল সামান্য, “আমি কিছু অন্যায় করিনি যে, ওরকম ফিল করব। আমি বলছি সায়ন।”
সায়ন! ছেলেটার নাম তা হলে সায়ন! রাধিয়া বুঝতে পারছে না ওর সামনে কী হচ্ছে! বুদা কাউকে না বলে বিয়ে করেছে। সেটা বুদার ডিসিশন। সেটা নিয়ে এমন করছে কেন ও!
সায়ন বলল, “প্লিজ় বুদা, আজ আমরা এসেছি সেলিব্রেট করতে! ডোন্ট স্পয়েল ইট!”
“তুই চুপ কর,” সায়নকে ধমকে বুদা এবার তাকাল ওদের দিকে, “কেন তোদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি জানিস? কারণ… কারণ, আমি সায়নকে যে বিয়ে করেছি, ও আমার দূর সম্পর্কের হলেও মাসতুতো দাদা! বুঝেছিস? আমার বাবা-মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমরা এখন নাকতলার কাছে একটা বাড়িতে আছি। একটা রুম। ইউনিভার্সিটিতে আর যাব না। সায়ন বেহালা বাজায়। ক্লাবে। তাও রোজ কাজ পায় না। আমি টিউশনি করি! আমাদের বাড়ির কেউ আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। বুঝলি এবার কেন যোগাযোগ রাখিনি কারও সঙ্গে? বুঝলি?”
কথা শেষ করে আচমকা বুদা টেবিলে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে! রাধিয়া ঘাবড়ে গেল। আর শুধু রাধিয়াই নয়, সবাই থতমত খেয়ে গেল। সায়ন বুদার পিঠে হাত রাখল আলতো করে। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “সরি।”
“কী হয়েছে?” পেছন দিক থেকে একটা প্রশ্ন এল এবার।
রাধিয়া তাকিয়ে দেখল স্মরণ। আর ঠিক তখনই চিনতে পারল। আরে, সেই ফুটপাথে এই ছেলেটাই তো দাঁড়িয়ে ছিল ওই খেলনাওয়ালার সঙ্গে! এই তো সেই শার্ট! তাই দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা চেনা লাগছিল।
