চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আইকার। মেয়ে দেখতে এসে এসব গান্ডেপিন্ডে গেলাটা জাস্ট সহ্য করা যায় না। কিন্তু কী করবে! পুটুমাসি পইপই করে বলে দিয়েছে, আইকা যেন মনে করে কিনে নিয়ে যায় এসব। বাড়িতে তেমন কিছু ঝামেলা করছে না!
পুটুমাসি মায়ের বান্ধবী। ওদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। পুটুমাসিরা আগে শ্যামবাজারে থাকত। কিন্তু বছরছয়েক হল ফ্ল্যাট কিনে চলে এসেছে এই ভবানীপুরে। আইকারাও তখনই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল! মা আর পুটুমাসি বলতে গেলে একসঙ্গে যুক্তি করে কিনেছে ফ্ল্যাট দুটো!
আইকার মনে পড়ে গেল আবার। ফ্ল্যাটটা তো কেনাই হত না যদি না ওর জীবনে আজকের দিনটা থাকত!
“মাইরি! কী রে?” দূর্বা এবার এগিয়ে এসে ঠেলল আইকাকে, “এমন স্পেসড আউট হয়ে আছিস কেন?”
“না তো, কই!” আইকা হাসার চেষ্টা করল।
দূর্বা বলল, “আমিও আজ তাড়াতাড়ি কাটব। মায়ের শরীরটা ভাল নয়। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হবে। ব্রতীন তো নেই কলকাতায়।”
আইকা দূর্বার দিকে তাকিয়ে হাসল। আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। দূর্বা ওর খুব বন্ধু, তাই কিছু বলতেও পারছে না। কিন্তু এক-একদিন থাকে যখন কিছুই ভাল লাগে না। রোদের রং, হাওয়ার ওড়না, আকাশ থেকে নেমে আসা আলো, সবেতেই কেমন একটা মনখারাপ লেগে থাকে যেন। যেন মনে হয় সবই অনর্থক! সবই শূন্য! সব কিছুই কেবল থাকার জন্যই রয়েছে!
আইকা আবার একবার জানালার দিকে তাকাল। আলো নরম হয়ে এসেছে অনেক! শহরের শিরা-ধমনির মতো রাস্তাগুলো অনেকটাই ম্রিয়মাণ। কিন্তু পিঁপড়েরা চলেছে! মনখারাপ আর অন্ধকার ভেঙে তাদের সারি এগিয়ে চলেছে। একসঙ্গে। একাকী।
“কী হয়েছে তোর?” দূর্বা পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল এবার, “এমন মুখ করে আছিস কেন? সত্যি মাইরি! তোকে নিয়ে আর পারি না! আর কত বোঝাব বল তো? ছত্রিশ বছর বয়সটা কি তোর হাওয়ায় হল? আরে বাবা, বর কি কারও মারা যায় না? তবে? এবার একটা বিয়ে কর। কত ছেলে তো লাইন দিয়ে রেখেছে! একজনকে বেছে তারপর বিয়ে করে নে।”
আইকা হাসল। কী বলে মেয়েটা! আসলে সবটা তো আর জানে না। কাউকে বলেও না। কী হবে বলে? পুরনো কথা মাটি খুঁড়ে বের করে আনলে দুর্গন্ধই বেরোবে! এখনকার আপাতশান্ত জীবনটা বিঘ্নিত হবে। তার চেয়ে যা অলক্ষ্যে ও অতীতে রয়েছে, তা অলক্ষ্যেই থাকুক।
দূর্বা বলল, “দেখ আইকা, এভাবে মুখ বুজে থাকলে হবে না। আমার তো চল্লিশ হল। আমি কম ঘাটের জল খাইনি! তোর মতো আমারও ছোট থেকে বাবা নেই। সবটা আমাকে আর মাকে করতে হয়েছে। ব্রতীন আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। ওকেও কিন্তু দেখতে হয় আমাকেই। হতে পারে মাল্টিন্যাশনালের ভিপি, কিন্তু জানিস তো ডান দিকে ফিরলে বাঁ দিকটা ভুলে যায়! আগেই জানতাম ও এমনটাই। মা বলেওছিল, অফিস করে এমন ছেলেকে সামলাতে পারবি তো! কিন্তু আমি দূরের সময়টা দেখেছিলাম। ফিউচার ইজ় মাই কনসার্ন। তাই ওকে বিয়ে করব ঠিক করছি। এখনও বয়স আমাদের দিকে। শরীরে, মনে জোর আছে। কিন্তু সারা জীবনটা তো এমন যাবে না! আঠাশে তোর হাজ়ব্যান্ড চলে গেল। তারপর আট বছর কেটে গিয়েছে বস! এবার কিছু কর। বেকার কষ্ট পেয়ে কী লাভ?”
আইকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাউসটা ধরে নাড়াল সামান্য। তারপর বলল, “তুই এত কথা বলিস কেন?”
“যাঃ শালা!” দূর্বা ওর খোলা চুলটাকে আঙুল দিয়ে কানের পিছনে নিয়ে গিয়ে বলল, “বলছি তোর ভালর জন্য রে!”
আইকা হেসে একবার দ্রুত ইনভেন্ট্রি লিস্টটায় চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বন্ধ করে বলল, “আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু যাকে-তাকে বিয়ে করে নেব? এতটা ডেসপারেট হইনি এখনও।”
দূর্বা হাসল, “যাকে-তাকে কী বলছিস! তোর জন্য যা লাইন, তা পেট্রোলের দাম বাড়ার আগের রাতের পেট্রোল পাম্পকেও হার মানাবে।”
আইকা জানে দূর্বা ইয়ারকি করছে! ও ওরকমটা করে। মেয়েটা খুবই ভাল। পরিশ্রমী। তাই কোম্পানিতে ভাল পোস্টে আছে। আর আইকাকে ভালওবাসে খুব। কিন্তু তা হলেও আইকা ওকেও সবটা বলতে পারেনি! কাউকেই পারেনি কোনওদিন। পারে না। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়া আর তার পরবর্তী জীবনের কষ্ট আর সংগ্রামটাই কোথায় যেন পালটে দিয়েছে ওকে। রাগী, অভিমানী আর জেদি করে দিয়েছে। আর তাই তো আজ ওর জীবনটা এরকম হয়ে গেল! জীবনে টাকা আর স্থিতিশীলতার জন্য একের পর এক যা করেছে, তা ওকে আজ এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই স্কুলজীবন থেকেই ও টিউশনি করত। তারপর কলেজে উঠে পার্টটাইম কাজ করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে। এমনকী মায়ের যখন শরীর খারাপ হল, জীবনবিমার এজেন্ট হিসেবেও কয়েকমাস কাজ করেছিল বাড়তি রোজগারের জন্য। আর অল্পবয়সি, সুন্দরী মেয়ে বলে কম নোংরামো তো ওকে সামলাতে হয়নি! কাজ যেমন হত, তেমন মানুষজন নানা খারাপ কথা, ইঙ্গিত আর প্রস্তাবও দিত। জীবন দোধারী তরোয়ালের মতো। একদিকে ওর বাঁধনগুলো যেমন কেটেছে, তেমন ওকেও কেটেছে অন্য দিকে!
কম্পিউটারটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল আইকা। এবার যেতেই হবে, না হলে পুটুমাসি রাগ করবে। আর সত্যি তো, ছেলের বাড়ির লোকজন এসে যাওয়ার আগেই ওর যাওয়া উচিত। রাঙামেসো আর পুটুমাসি ঠিক সামলাতে পারে না কিছু। তাই আইকাকে থাকতেই হয়।
পুটুমাসি মায়ের ছোটবেলার বন্ধু। তবে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। মায়ের বিয়ের চার বছরের মধ্যে দু’বছরের জন্য বাবার বদলি হয়ে গিয়েছিল মধ্যপ্রদেশ। তখন থেকেই আর যোগাযোগ ছিল না। ফলে ওদের ওই ভয়ংকর সময়টার কথা পুটুমাসিরা জানত না। তবে মায়ের ওই সময় পুটুমাসির কথা মনে থাকলেও মা সেখানে যায়নি। সাহায্য চায়নি। কারও কাছেই যায়নি। দু’জনেই যতটা পেরেছে সব সামলেছিল!
