মনের মধ্যে সামান্য হলেও একটা কাঁটা ফুটে আছে ওর। বুদা আসবে। সেই যে বুদা ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল, তারপর থেকে আর ওদের কথা হয়নি। ইউনিভার্সিটিতে বুদা আসছে না মাসখানেক। জয়তীর কাছে ও শুনেছে, বুদা নাকি কোথাও একটা গেছে। কেউ ঠিক বলতে পারছে না বুদার কী হল। তবে সেই জন্য কেউ বুদার বাড়িতে যায়নি খবর নিতে। কেউ যদি যোগাযোগ না রাখতে চায়, তা হলে কেন কেউ তাকে বিরক্ত করবে!
কিন্তু বুদা যোগাযোগ করেছে। গতকাল পলি ফোন করেছিল রাধিয়াকে আজ রেস্তরাঁয় আসতে বলার জন্য। তখনই বলেছে যে, বুদা ফোন করে পলির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, “কেমন আছে বুদা? কী খবর ওর?”
পলি বলেছিল, “কী জানি কী খবর! তবে বলল আমাদের সবার সঙ্গে ওর দরকার আছে কী একটা, তাই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি আর কথা বাড়াইনি বুঝলি। আজকে নেমন্তন্ন করে ডেকেছি। বলেছি সবাই আসবে, তুইও আয়।”
“আসবে?” রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল।
“বলল তো আসবে,” পলি বলেছিল, “দেখ, আমাদের তো ওকে নিয়ে কোনও প্রবলেম হয়নি। ও নিজেই আচমকা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই আমি আসতে বলব না কেন! ঠিক না?”
“ঠিকই তো,” সামান্য হেসেছিল রাধিয়া। তবে বাইরে হাসলেও মনের মধ্যে সামান্য একটা কাঁটা ফুটেছিল ওর। বুদা এসে আবার কী বলবে কে জানে!
পলি ফোন রাখার আগে বলেছিল, “আটটার মধ্যে চলে আসবি পজ়িটিভলি! যদি দেরি করেছ না…”
এই রাস্তাটার নাম পণ্ডিতিয়া রোড এক্সটেনশন। রাস্তাটা বেশ সরু। তার মধ্যে একদিকে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের বড় গাড়িটা নিয়ে মধুদা বেশ নাকাল হচ্ছে!
সামনেই একটা নতুন তৈরি হওয়া বাড়ি। তার আগেই বাঁ হাতে একটা রাস্তা ঢুকে গিয়েছে! মধুদা গাড়িটাকে সামনে ফুটপাথের পাশ ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে বলল, “গাড়িটা ওই রাস্তায় ঢুকবে না। তাই…”
রাধিয়া বলল, “ঠিক আছে মধুদা। তুমি এখানেই দাঁড়াও। আর এটা রাখো। বিকেলে কিছু যে খাওনি সেটা আমি জানি।”
একটা একশো টাকার নোট মধুদার দিকে বাড়িয়ে দিল রাধিয়া। মধুদা দ্বিধার সঙ্গে টাকাটা নিল। আজ মধুদার কী হয়েছে কে জানে! কেমন একটা মনমরা ভাব। অন্যদিন কত কথা বলে! আজ কেমন যেন নুয়ে আছে!
গাড়ি থেকে বেরিয়ে জানলায় ঝুঁকে দাঁড়াল রাধিয়া, “তোমার কী হয়েছে মধুদা? শরীর খারাপ?”
“না, না” মধুদা জোর করে মাথা নাড়ল।
“বাড়িতে সব ঠিক আছে? শিখামাসি ঠিক আছে?”
“সবাই ঠিক আছে,” মধুদা আবার জোর করে হাসল।
রাধিয়া আর কথা বাড়াল না। বুঝতে পারছে মধুদা বলতে চাইছে না। মানুষের ব্যক্তিগত কথা থাকতেই পারে। ও গলিতে ঢুকে গেল।
খুব গরম আর এখন নেই। রাতের দিকটায় সামান্য চিনচিনে ঠান্ডা পড়ে। মুখে পিপারমিন্ট লজেন্স রাখার মতো একটা ঠান্ডা। এইদিকের রাস্তায় বড়-বড় হলুদ সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প লাগানো রয়েছে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় আলোর গায়ে লাগানো কাচের ঢাকনায় অসংখ্য মৃত পোকা জমে কালো হয়ে আছে! ফলে আলোর মধ্যেও কেমন যেন একটা বাদামি আভা! রাস্তাগুলোয় কেমন একটা ছমছমে রং!
অনেক ফুল পড়ে আছে পথে। চারপাশে বেশ গাছ। লোকজনও কম। দক্ষিণ কলকাতাটা বেশ সুন্দর। বিশেষ করে লেকের আশপাশটা। একা-একা হাঁটতে ইচ্ছে করে রাধিয়ার।
রেস্তরাঁটা গলির ওই মাথায়। ডান হাতে। রাস্তা থেকে এক ধাপ উঠে। রাধিয়া দেখল, সামনে দিয়ে একটা ড্রেন গেছে। তার ওপর চেকার্ড প্লেট পাতা। সেখানে পা দিয়ে উঠে গেল রাধিয়া। রেস্তরাঁটার সামনে সরু বাঁশের কাজ করা একটা ডিজ়াইন রয়েছে। পাশেই কাচের পাল্লাওয়ালা দরজা। একজন গেটকিপার দাঁড়িয়েছিল। রাধিয়াকে দেখে সে মাথা ঝুঁকিয়ে “গুড ইভনিং!” বলে পাল্লাটা খুলে ধরল।
রাধিয়া ভেতরে ঢুকে একটু থমকে গেল! রেস্তরাঁটা ছোট। দেখেই বোঝা যায় পুরনো বাড়ির নীচের তলাটা নিয়ে সেটাকে ঠিকঠাক করে এটা করা হয়েছে।
গোটা রেস্তরাঁটা লাল আর কালো রং দিয়ে সাজানো। অল্প আলোয় সবটাই বেশ মায়াময় লাগছে। আজ সপ্তাহের মাঝখান বলেই কি না কে জানে, এখানে ভিড় নেই একদম।
একজন ওয়েটার এগিয়ে এল এবার। ছেলেটা ইয়ং। রোগা। মুখে হাসি লেগে রয়েছে। রাধিয়া ছোট করে বলল ও কেন এসেছে। ছেলেটা রাধিয়াকে সামনের দিকে আসতে বলল।
এদিকটায় দুটো ভাগে চেয়ার-টেবিল সাজানো আছে। ছেলেটা রাধিয়াকে নিয়ে এই জায়গাটা পেরিয়ে ডান দিকে ঘুরল। আর তখনই দেখল সবাইকে। রাধিয়া নিমেষের জন্য থমকে গেল।
এদিকে একটা বড় জায়গা। সেখানে তিনটে টেবিলকে জোড়া দিয়ে রাখা আছে। আর সেগুলো গোল করে ঘিরে বসে রয়েছে সবাই। কিন্তু সবার মধ্যে রাধিয়ার চোখ পড়ল নিশানের দিকে। ওকেও বলেছে পলি! এটা জানত না তো! কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে ওর মন পালটা প্রশ্ন করল, জানলে কী করত? আসত না? নাকি আসত? ওর মনে পড়ে গেল নিশানের সঙ্গে সেদিন ওই নার্সিং হোমে কী হয়েছিল! মনে মনে সংকুচিত হয়ে গেল হঠাৎ। আর নিজেরই রাগ হল নিজের এই দুর্বলতার জন্য!
কেয়াআন্টিকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল সেদিন। ফলসা এসেছিল বেঙ্গালুরু থেকে। রাধিয়া জানত যে, নিশান যাবে। ও তাই যেতে চেয়েছিল। যত দিন যাচ্ছে, নিশানের কাছাকাছি থাকতে, ওর কথা শুনতে ইচ্ছে করছে রাধিয়ার। এটা কতটা সিরিয়াস ও জানে না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, এমন ইচ্ছেটা বেড়েই চলেছে। নিশানই এমন একজন যাকে, কেন ও জানে না, ওর মনের সবচেয়ে অস্বস্তিজনক কথাটা জানাতে পেরেছে! নিশান বলেছিল, বাবার ব্যাপারটার খবর নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা আশা করে না রাধিয়া। ওর নিশানকে ভাল লাগে মানেই নিশানেরও যে ভাল লাগবে, তা তো নয়। ভাললাগা ব্যাপারটার মজা বা সাজা হল এই যে, কখনওই তা দু’জনের মধ্যে একই বেগে কাজ করে না! ফলে নিশান যে ওকে ওই কথাটা বলেছিল, সেটা ও ধরেনি। সেদিন খুব মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আর ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল রাধিয়া, তাই হয়তো বলে ফেলেছিল ওই কথাটা। আর ওর মনে হয় নিশানও ওকে সান্ত্বনা দিতেই ওরকম একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
