রাধিয়ারও এমন হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারে না। কীসের যে এক ভয় ওকে চেপে ধরে কে জানে! কিছুতেই নিজের মন খুলে ও কিছু করতে পারে না। সারাক্ষণ কেমন যেন মাথা নিচু করে থাকে! অন্যায্য কেউ কিছু বললেও প্রতিবাদ করতে পারে না। উচিত কথা বলে দিতে পারে না। শুধু রাগ হয়, চাপা একটা কষ্ট হয় মনে মনে। বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ অনুভব করে ও। উলটো দিকে একটা ভয় এসে আঁকড়ে ধরে ওকে। ভাবে, উচিত কথা বললে যদি খুব অশান্তি হয়! তার চেয়ে বাবা এই চুপ করে থাকাই ভাল!
এই তো আজকেই বেরোনোর আগে মা রাগ করছিল।
মা বলছিল, “এখন কোথায় যাচ্ছিস তুই? আবার সেই ভুলভাল বন্ধুদের কাছে যাচ্ছিস? তোর কি একটুও স্টেটাস-জ্ঞান নেই! আমি আর তোর বাবা কোথায় যাই, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করি! আর তুই! কতবার বলেছি আমাদের সঙ্গে পার্টিতে চল, ক্লাবে চল। সেখানে কত ব্রাইট ছেলেমেয়েরা আসে। তাদের সঙ্গে ঘোর। না, সেসব তো করবি না! সারাক্ষণ পেটি কিছু ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মাখামাখি। আমি তোর বাবাকে তখনই বলেছিলাম মেয়েকে লন্ডনে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু তার কি আমার কথা শোনার সময় আছে! একদম ঠাকুমার রক্ত পেয়েছিস তুই! যত ছোটলোকদের সঙ্গে মেলামেশা!”
ছোটলোক! রাধিয়ার রাগ হয়ে গিয়েছিল। ও বলেছিল, “ওরা খুব ভাল মা!”
“কীসের ভাল? আমি দেখিনি! যেমন ড্রেসিং সেন্স, তেমন চেহারা সব! কী করে তুই ওদের টলারেট করিস?”
রাধিয়া কিছু না বলে পার্স খুলে দেখছিল কত টাকা আছে ব্যাগে। কার্ডগুলো সব ঠিক আছে কি না।
মা বুজুকে ডেকে বলেছিল, “বুজু আমি বেরোব। ক্লাবে যাব। সুপ্রতীকও চলে যাবে ওখানে। আমার ড্রেস রেডি কর!” তারপর রাধিয়ার দিকে ফিরেছিল, “আমাদের সঙ্গেও তো যেতে পারতিস। ইউ ক্যান মিট নিউ ফ্রেন্ডস দেয়ার। সুশীল নিয়োগীর ছেলে এসেছে স্টেটস থেকে। আমি ছবি দেখেছি। একদম রণবীর কপূরের মতো দেখতে! ও তোর সঙ্গে মিট করতে চায়। ফেসবুকে তোকে দেখেছে। সুশীলের ওয়াইফ নীতা আমায় বলছিল। সেখানে না গিয়ে কোন না কোন পলি কী এক হোম চালায়, তার সঙ্গে কোন একটা বাজে রেস্তরাঁয় খেতে যাবি! সত্যি!”
রাধিয়া কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল। মায়ের আগে এমন মনোভাব ছিল না। কিন্তু ইদানীং কী হয়েছে মায়ের কে জানে! সারাক্ষণ এসব বলে চলেছে!
গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে সিগন্যালে। পরের সিগনালটাই ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক। সেখান থেকে ডান দিকে বাঁক নিতে হবে।
রাধিয়া পাশে তাকাল। একটা বড় হাসপাতাল। সামনে অনেক মানুষ। পাশে একটা মন্দিরও রয়েছে। সেখানে একটা লোককে দেখে সোজা হয়ে বসল রাধিয়া। আরে, সেই বইওয়ালাটা না! ও ভাল করে তাকাল। ফুটপাথে আজকাল এত দোকানপাট হয়ে গেছে যে, ভাল করে কিছু দেখার উপায় নেই। তবু পথচলতি মানুষ আর দোকানের ফাঁক দিয়ে লোকটাকে দেখল রাধিয়া। হ্যাঁ, ঠিক, সেই বইওয়ালাটাই। তবে হাতে বই নেই। তার বদলে খেলনা বিক্রি করছে! আর তার সামনে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু মুখটা স্পষ্ট হচ্ছে না! ছেলেটাকে খুব চেনা লাগছে রাধিয়ার। ওর মনে হল গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যায়। লোকটা খেলনা বিক্রি করছে যখন, সেখানেও নিশ্চয় অমন কিছুটা একটা স্পিচ দেবে! মনে পড়তেই হাসি পেয়ে গেল রাধিয়ার। কত অদ্ভুত মানুষ যে আছে! রাধিয়ার এমন মানুষজন দেখতে খুব মজা লাগে। ও সমাজের যে-স্তরে থাকে সেখানে সব কিছু বড়ই সাজানো-গোছানো। মাটির অনেকটা ওপরে। ফলে নানা ধরনের লোকের সঙ্গে সেখানে দেখা হওয়ার সুযোগ হয় না। সেখানে সব কিছুই কেমন যেন স্কেল দিয়ে মাপা। কাগজ দিয়ে মলাট দেওয়া। রাধিয়া ভাবতেই পারে না, ওর বাবা রাস্তায় বসা লোকের কাছ থেকে কুলের আচার কিনবে ওর জন্য। ভাবতেই পারে না ট্রামে করে ওকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। স্টেশনে ফটাস জল খাবে। এসব গল্প যখন বন্ধুদের থেকে শোনে, রাধিয়ার লোভ হয় খুব। মনে হয়, এমনটা কেন ওর সঙ্গে হল না!
ঠাকুরমা বলে, ভাবতে নেই। কী হল না, ভাবতে নেই। কী হল সেটা দেখলে জীবন অনেক ভাল হয়ে যায়। এই যে ওদের টাকার অভাব নেই, নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা নেই, এই যে ও যা চায় কিনতে পারে, খেতে পারে, বিদেশে হলিডে কাটাতে যেতে পারে, সেসব ক’টা লোকের কপালে জোটে! যে-লোকটা লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে ওঠার আগে সারা দিনের ক্লান্তি আর তেষ্টা কমাতে ওই স্টেশনের ফটাস জল খায়, সে তো মনে মনে রাধিয়ার মতো এমন একটা জীবনই চায়। ঠাকুরমা বলে, “আমার বাবা বলতেন নিরাপত্তা খুব দরকারি। তুই সেটা পেয়েছিস রাধি।”
রাধিয়ার জানতে ইচ্ছে করে, ঠাকুরমাও তো নিরাপত্তা পেয়েছে, তা হলে ঠাকুরমা এমন গম্ভীর আর চুপচাপ কেন? কেন ঠাকুরমাকে দেখলে মনে হয় এখানে থেকেও মানুষটা এখানে নেই! সব আছে কিন্তু আসলে যেন কিছুই নেই! নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ঠাকুরমার বাবা বলেছিলেন, কিন্তু রাধিয়ার জানতে ইচ্ছে করে ঠাকুরমার নিজের এই নিয়ে কী মত!
রাধিয়া ভাবল, একবার মধুদাকে বলে যে, ও গাড়ি থেকে নামতে চায়। কিন্তু তার আগেই একটা বাস এসে গাড়িটার বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মধুদাও ঠিক তখনই সামনের সিগন্যালটা খোলা পেয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।
রাধিয়া একবার পেছনের দিকে তাকাল। না, দেখা যাচ্ছে না কিছু! নিজের মনে মাথা নেড়ে হাতঘড়িটা দেখল রাধিয়া। প্রায় আটটা বাজে। ডিনারের নেমন্তন্ন আজ। কারও নেমন্তন্নে খালি হাতে যায় না রাধিয়া। পলির জন্য একটা পার্স কিনেছে।
