কাজু দাঁড়িয়েছিল একা। চারদিকে ঘন গাছপালার মধ্যে কেমন একা আর দুঃখী লাগছিল কাজুকে। আবছায়া হলেও পেখমের মনে হল কাজু বেশ রোগা হয়ে গেছে।
পেখম এগিয়ে গেল এবার। পা কাঁপছে ওর! বুকের মধ্যে যেন চটকলের ভোঁ পড়েছে! কতদিন পর কাজুর কাছে ও এল! এভাবে সম্পূর্ণ নির্জনে কতদিন পরে দেখা করল দু’জন!
ওর পায়ের আওয়াজ পেয়ে কাজু মুখ তুলে তাকাল এবার। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন ডেকেছ?”
“কাজুদা, আমি… আমায় জোর করে…” পেখমের গলা আচমকা ডুবে গেল জলের তলায়। কোন এক অজানা সমুদ্র থেকে চোরাস্রোত এসে হঠাৎই যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল পেখমকে। কষ্টের সঙ্গে এক চূড়ান্ত অভিমান এসে দখল নিল ওর মনের! এত ভালবাসার পরেও ওকে বলতে হবে কেন ডেকেছে? কেন দেখা করতে চাইছে? কাজু কি একদম ভুলে গেল ওকে? সবটাই ভুলে গেল এই কদিনে! পেখম আর কোনও কথা না বলে মুখ নামিয়ে নিল।
কাজু চোয়াল শক্ত করে বলল, “জোর করে কাউকে কিছু করানো যায় না। এটা নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নয়!”
পেখমের ইচ্ছে হল বলে, এটা তার চেয়েও বেশি। এখানে শরীরে মারে না, মনে মারে। এই ক্যাম্পে মনে মেরে শেষ করে দেওয়া হয় মানুষকে।
কাজু এগিয়ে এল এবার সামান্য। বলল, “এভাবে কান্নাকাটি করার কিছু নেই। বিয়ে করো। সুখী থাকো। আর কী বলব! তবে তোমার হয়তো মনে নেই এই সম্পর্কটা তুমি নিজেই শুরু করেছিলে। আমি প্রথম থেকেই বলেছিলাম, এতে অসুবিধে হবে। তুমি শোনোনি কিছু। আর দ্যাখো, আজ তোমার কথা না শোনার খেসারত দিতে হচ্ছে আমায়। ভালবেসে আমার কী হল দ্যাখো পেখম। আমার আর তোমার কী সম্পর্ক সেটা তো কেবল আমরা জানতাম। সেটা কতটা গভীর সেটা তো আমরা বুঝতাম কেবল। আর, সেখানে তুমি এমন করলে! আমার সব কিছু তো নষ্ট হয়েই গিয়েছে। আর কেন ডাকলে আমায়? কী বলতে চাও আর?”
কাজুর গলার হাহাকার যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে মেঘ ডেকে উঠল যেন তার উত্তরে! ডাইনির চুলের মতো আঁকাবাঁকা বিদ্যুৎরেখা নিমেষে ছড়িয়ে গেল আকাশময়! পেখম মুখ তুলে সেই আলোয় দেখল কাজুকে। দেখল, কাজুর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কাঁদছে!
পেখম আর নিজেকে আটকাতে পারল না। কীসের এই টান ও নিজেও বুঝতে পারল না। শুধু দেখল, এক অমোঘ আকর্ষণ ওকে যেন টেনে এনে ছুড়ে ফেলল কাজুর বুকের ওপরে।
পেখম সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজুকে জড়িয়ে ধরল। ওর মনে হল লতানো গাছের মতো ওর মন আর শরীর থেকে অসংখ্য আকর্ষ যেন বেরিয়ে এসে কাজুকে মিশিয়ে দিতে শুরু করেছে ওর সঙ্গে!
“পেখম আমি… আমি ভাল নই পেখম… আমি এর মধ্যে… আমি…” ওই বন্ধনের মধ্যেও কাজু যেন কিছু বলতে চাইল।
কিন্তু কাজুকে আর কিছু বলতে দিল না পেখম। মুখ তুলে কাজুর ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরল ও। কাজুও যেন সামান্য দ্বিধা করল প্রথমে, তারপর ওর নিজেরও সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল এবার। নরম পাখির মতো পেখমকে প্রায় তুলে নিল মাটি থেকে। তারপর নিজের সমস্ত না পাওয়া দিয়ে পেখমের ভালবাসা শুষে নিতে লাগল ও।
আকাশে মেঘ ডাকল আবারও। হাওয়ার জোর বাড়ল। ক্ষণে-ক্ষণে ছিটকে উঠল বিদ্যুৎ। পেখম আর কাজু ক্রমশ তলিয়ে যেতে লাগল এক নরম অন্ধকারে। পৃথিবীর সমস্ত হিংসা, লোভ আর বিচ্ছেদ থেকে দু’জনকে আড়াল করে দিতে শুরু করল এই বাগান, এই গাছপালা, এই অন্ধকার। পেখম বুঝল আজকে, এতদিনে ও সম্পূর্ণ কাজুর হয়ে গেল। বুঝল সারা জীবনের মতো কাজুর সুবাস জমা হয়ে গেল ওর শরীরে। জমা হয়ে গেল ভালবাসা আর নির্ভরতা। পেখম বুঝল, এই বন্ধন থেকে ওর আর মুক্তি নেই। এই বন্ধন ওকে সারা জীবন বাঁচিয়ে রাখবে।
.
২৯. রাধিয়া
এই গাড়িটায় সান রুফ আছে। গাড়ির মাথার একটা চৌকোমতো অংশ কাটা। তাতে কাচ লাগানো রয়েছে। ব্যাপারটা খুব ভাল লাগে রাধিয়ার। ও পেছনের সিটে বসে মাঝে মাঝে মাথাটা ওপর দিকে তুলে ওই চৌকো জানলাটা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওদের গাড়ির ওই কাচটা ফোটোক্রোম্যাটিক। দিনে যেমন গভীর কালো রং হয়ে যায়, তেমনই রাতে আবার স্বচ্ছ সাদা হয়ে যায়। ফলে গাড়ির মধ্যে বসেই আকাশ দেখতে পারে ও।
আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাল লাগছে খুব। নভেম্বরের শেষ, তাই আকাশে মেঘের চিহ্ন নেই। শহর হলেও সামান্য কিছু জেদি নক্ষত্র দূষণের মাস্তানির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে। বাইরে গরম হলেও গাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। ছোটবেলায় ঠাকুরমার সঙ্গে টেরাসে বসে আকাশ দেখত ও। ঠাকুরমা গল্প বলত ওকে। রূপকথার গল্প। রাজা, রানি, রাজকুমার, রাজকুমারী আর দুষ্টু ড্রাগনের গল্প। আর সেই গল্প শুনতে-শুনতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রাধিয়ার মনে হত আকাশ থেকেও কি এমন কোনও ড্রাগন হাঁ করে ওকে গিলে নিতে নেমে আসবে নীচে? এখন মনে পড়লে হাসি পায় রাধিয়ার। ছোটবেলার অনেক কিছুই, দেখেছে, বড় হলে আর পাওয়া যায় না!
মধুদা গাড়ি চালাচ্ছে। বিবেকানন্দ পার্কের পাশের গলিতে একটা রেস্তরাঁয় যাচ্ছে রাধিয়া। নেমন্তন্ন আছে আজ। পলি নেমন্তন্ন করছে! ও যে ওল্ড এজ হোমটা চালায়, সেটা নাকি বড় একটা গ্র্যান্ট পেয়েছে। সেই জন্য ও আজ বন্ধুদের খাওয়াবে!
পলি মেয়েটা অদ্ভুত। খুব বড় মনের! রাধিয়া জানে যে এই ওল্ড এজ হোমটার হয়ে কাজ করার জন্য পলি নিজে কোনও টাকা পায় না। এই যে গ্র্যান্টটা পেয়েছে সেটা থেকে এক কানাকড়িও ও পাবে না। তাও মেয়েটা কী খুশি!
