ফুলুদাদু সহজ-সরল মানুষ, বেশি প্যাঁচঘোঁচ বোঝে না! বলল, “ও, ঠিক আছে। আমি বগলার কাছে যাচ্ছি এখন। তোদের দোকানে যাব।”
পেখম বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে বোলো না। মাকে তো জানো! জানলে… সামনে বিয়ে তো আমার!”
“তাই নাকি? বিয়ে?” ফুলুদাদু হাসল, “দারুণ খবর তো! ঠিক আছে তুই এখন যা, আমি কাউকে কিছু বলছি না…” ফুলুদাদু মাথায় হাত রাখল ওর।
পেখম হাসল। তারপর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। তবে ফুলুদাদু ভাল মানুষ, কিছু বলবে না।
পেখম ঘড়ি দেখল আবার। কাজু আসবে সাতটার সময়ে। বিজনদের বাড়িটা ঠিক চেনে না পেখম। বিজন বলেছে ও চ্যাটার্জিপাড়ার মোড়ে এসে সেখান থেকে নিয়ে যাবে পেখমকে। বলেছিল, “তুমি ভেবো না পেখমদি। আমি চলে আসব। তবে একটা কথা, তুমি নয়নাদিকে কিন্তু এসব কিছু বোলো না।”
“মানে?” পেখম বুঝতে পারেনি কী বলতে চাইছে বিজন।
“মানেটা খুব সহজ, নয়নাদিকে আমার ভরসা হয় না আজকাল। কেয়া সেদিন বলছিল, নয়নাদির কাছে নাকি ও কাজুদার ছবি দেখেছে!”
কেয়াকে চেনে পেখম। বিজনের স্যারের মেয়ে। ন’-দশ বছর বয়স। ছোট্ট একরত্তি একদম। কিন্তু কী পাকা, কী পাকা! সারাক্ষণ বিজনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। ওদের সঙ্গে আবার নয়নার খুব ভাল সম্পর্ক!
“কাজুদার ছবি দেখেছে, তো? তাতে কী হল? তুই জানিস না, আজকাল নয়না সারাক্ষণ ছবি তুলে বেড়ায়! তাতে কী হল?” পেখম আমল দেয়নি কথাটার।
বিজন ঠাকুরদার দোকানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। পেখমের প্রশ্নে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ও সরে এসেছিল এক কোণে। তারপর বলেছিল, “আরে, কেয়া বলে, নয়না নাকি কাজুদার লাভে পড়েছে!”
“মারব এক চড়!” পেখমের রাগ হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ, “ওইটুকু মেয়ে! এসব কে বলেছে ওকে? এত পাকা কী করে হয় ও?”
বিজন ঘাবড়ে গিয়েছিল সামান্য। রক্ষণাত্মক হয়ে বলেছিল, “না, না, রাগ কোরো না পেখমদি। আমি যা শুনেছি বললাম। তুমি কিছু মনে কোরো না।”
নয়না পেখমের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। এইসব বিজনের মতো পাকা ছেলেগুলো কী করে বলে এমন কথা? নয়নাকে ও বলে না, এমন কথা নেই। সেখানে বিজন এসব বলে কী করে?
নয়নার কাছ থেকে কিছু লুকোয় না পেখম। আজও কিছু লুকোয়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ও সোজা গিয়েছিল নয়নার কাছে।
নয়নাদের বাড়িটা সামান্য দূরে। চারিদিকে বাগান দিয়ে ঘেরা। ওর বাবা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। বাড়ির সামনে ডিসপেন্সারি। পেখম দেখেছিল আজ নয়নার বাবার কাছে ভিড় বেশ। অন্যদিনের মতো ফাঁকা নেই দোকান। পেখম ওই দিকে না গিয়ে সোজা দরজার কড়া নেড়েছিল।
সামান্য সময় পরে নয়না নিজেই এসে দরজা খুলে দিয়েছিল। পেখম দেখেছিল নয়না চুল বাঁধছে ফিতে দিয়ে। ওকে দেখে বেশ অবাকই হয়ে গিয়েছিল। চোখ বড়-বড় করে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই এখানে? কাকু-কাকিমা জানে? তোর না বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ?”
পেখম এদিক-ওদিক দেখে নয়নাকে হাত ধরে টেনে বের করে এনেছিল ঘরের বাইরে। তারপর সতর্ক গলায় বলেছিল, “শোন না, আমি কাজুদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। বাড়িতে বলেছি তোর কাছে এসেছি। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সেটাই বলিস কিন্তু।”
“কিন্তু তোর তো বিয়ে! সেখানে এখন কাজুদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস কেন? দেখ, ঝামেলা হয়ে যাবে কিন্তু জানাজানি হলে। কাজুদাকে গুলি মার। সামনে কত ভাল জীবন তোর। এসব করিস না পেখম।”
পেখম আহত হয়ে তাকিয়েছিল নয়নার দিকে, “তুইও ওদের মতো কথা বলছিস! তুই জানিস না আমার আর কাজুদার প্রেম কতটা খাঁটি। তা হলে? তোকে যা বললাম, সেটা শুধু মাথায় রাখিস!”
নয়না খপ করে হাত ধরেছিল পেখমের। তারপর সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি তোকে খুব ভালবাসি পেখম। কিন্তু কিছু জিনিস আছে যেগুলো ভালবাসার চেয়েও জরুরি। তুই যা করছিস তাতে কারও ভাল হবে না।”
“আমি জানি আমি কী করছি। তোকে যেটা বললাম সেটা বুঝেছিস তো?” পেখম নয়নার হাতটা আঁকড়ে ধরে বলেছিল, “একটু সাহায্য কর নয়না। আমার যে আর কেউ নেই… কাকে আমি বলব বল!”
আবছা হয়ে আসা আলোয় নয়না তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর ধীরে-ধীরে কেটে-কেটে বলেছিল, “কাজুদা তোর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হল? আর, কোথায় যাচ্ছিস তুই দেখা করতে?”
“বিজনদের বাড়ি। চ্যাটার্জিপাড়ায়। বাড়ি আজ ফাঁকা ওদের। যাব আর আসব। তুই প্লিজ় আমার কথাটা রাখিস!”
কথা শেষ করে আর দাঁড়ায়নি পেখম। আসলে ওর আর দাঁড়ানোর সময় ছিল না।
“আমার বাড়িটা সামনেই, তাড়াতাড়ি চলো। কাজুদা এসে গেছে।” চ্যাটার্জিপাড়ার মোড়েই দাঁড়িয়েছিল বিজন। পেখমকে দেখে নিজেই এগিয়ে এল।
বিজনদের বাড়িটা সত্যি মোড়ের কাছে। বাড়িটা বেশ বড়। ইটের। মাথায় টিন দেওয়া। বাড়ির সামনে একটা উঠোন। তুলসী-মঞ্চ। আর বাড়ির চারদিকে প্রচুর গাছপালা। বিজনদের টাকাপয়সা থাকলেও সেটা কিন্তু বাহ্যিক আড়ম্বরে দেখা যায় না। বোঝাও যায় না।
বিজন বলল, “বাড়ির পেছনের দিকে চলে যাও। ওখানে একটা বাগান আছে। কাজুদা আছে ওখানে দাঁড়িয়ে। আমি বাড়ির সামনে আছি। মানে, ঘরগুলো বন্ধ করে দিয়ে গেছে তো… আমি পাশে মামার বাড়িতে দুপুরে খেয়েছি। তাই…”
পেখম আর শুনল না। অত শোনার মতো মনের অবস্থা ওর নেই। হাত-পা কাঁপছে ওর। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কতদিন পরে কাজুর সামনে দাঁড়াবে গিয়ে! কী বলবে কাজু! কথা বলবে তো নাকি…
