বিজনকে মা ঢুকতে দেয় না আর বাড়িতে। তাই ঠাকুরদার দোকানে বিজনকে একদিন ধরেছিল পেখম। একমাত্র ওইখানে গেলেই মা কিছু বলে না।
পেখম বলেছিল, “তোকে যে করেই হোক একবার কাজুদাকে রাজি করাতেই হবে বিজু। আমার জীবন-মরণ সমস্যা। তুই একটু দেখ ভাই। এটা খুব দরকারি।”
বিজন সেই কাজটা করেছে। দোকানেই গতকাল পেখমের সঙ্গে দেখা করে বলে গেছে আজ সন্ধেবেলা ওদের বাড়িতে আসবে কাজুদা। বাড়িতে কেউ নেই। সবাই রাত দশটা নাগাদ ফিরবে। তার মধ্যে যেন দেখা করে নেয় ওরা।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে খুব। রাস্তাটাও নির্জন। সামান্য ভয়-ভয় করছে পেখমের, কিন্তু তাও ও যাচ্ছে। ফেরার পথে না হয় বড়রাস্তা ঘুরে রিকশা করে চলে আসবে।
কিন্তু হাঁটার পক্ষে পাড়ার ভেতরের রাস্তাটাই সবচেয়ে ভাল।
কাজু কি আসবে? এই যে চারদিকে মিথ্যে বলে এতটা ঝুঁকি নিয়ে এল, সেটা কি ঠিক করল? কাজু তো কথাই বলতে চাইছে না ওর সঙ্গে। আর ছোটকার কাছে এও শুনেছে যে, কিছুদিন আগে ফ্যাক্টরি গেটে নাকি বিশাল মিটিং হয়েছে। কাজু নাকি ফ্যাক্টরি স্ট্রাইক করার কথা বলছে!
সবাই মিলে রাতের খাবার খাচ্ছিল একসঙ্গে। ছোটকা তখনই কথাটা তোলে। আগে ছোটকা জুট মিলের ফোরম্যান ছিল। কিন্তু গত একমাস হল, ছোটকার প্রোমোশন হয়েছে। মালিকরা ছোটকাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোডাকশন ম্যানেজার করে দিয়েছে। এসব যে কেন হচ্ছে, সেটা ভালই বুঝতে পারছে পেখম। এমনকী, এটাও শুনছে, মালিকদের হাত নাকি এতটাই লম্বা যে, ওরা বাবাকে এই থানার বড়বাবু করার জন্যও সরকারের কাছে কলকাঠি নাড়ছে! কোন কথা কতটা সত্যি পেখম জানে না। কিন্তু এটা বোঝে যে, ওদের গোটা পরিবারকে গ্রাস করে ফেলছে মালিকরা!
ছোটকা বলেছিল, “জানো বউদি, ওই কাজু সেদিন ফ্যাক্টরি গেটে মিটিং করেছে। সবাইকে উসকাচ্ছে, যাতে সবাই স্ট্রাইক করে। আমাদের বিপাকে ফেলতে চাইছে, জানো! কী বদ ছেলে ভাবতে পারছ? নিজে তো করিস টিউশনি। রোজগার করার মুরোদ তো নেই একফোঁটা। সেখানে তুই অন্যদের ভাত মারবি? মালিকদের একটা ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে কিছু যাবে-আসবে না। ওদের অনেক ফ্যাক্টরি আছে, ব্যাবসা আছে। কিন্তু এখানে গরিব লোকগুলোর কী হবে ভাবতে পেরেছে?”
মা রুটি দিচ্ছিল বাবাকে। সেটা মাঝপথে থামিয়ে বলেছিল, “তবেই বোঝো কেমন জানোয়ার ছেলে! আর একেই কিনা বাড়িতে ঢুকিয়েছিলে তুমি! আমার মেয়ের মাথা খেতে চেয়েছিল! ভাবতে পারো! কী ভাগ্যে আপদ নেমেছে ঘাড় থেকে!”
ছোটকা মাথা নেড়ে বলেছিল, “আমি বুঝতে পারিনি যে, শয়তানটা এতদূর যাবে। আমাদের মিলের ক্ষতি করতে চায়। কীসের রাগ এত সেটা কি আর জানি না! দাড়ি রাখলেই ভাবে সব চে গেভারা হয়ে যাবে!”
পেখম অবাক হয়ে যাচ্ছিল। এসব কী বলছে ওরা! কাজু এমন নয় সেটা ওর চেয়ে ভাল আর কে জানে! আর এই ছোটকাই তো কয়েকমাস আগে মালিকদের গালাগালি করত। বলত মাইনে ভাল নয়। ওভারটাইম নিয়ে কারচুপি করে। লোকজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তারা আজ ভাল হয়ে গেল! এই মিল এখন ছোটকার ‘আমাদের মিল’ হয়ে গেল!
মানুষ এতটা লোভী আর নীচ হতে পারে! এই বাড়িতে জন্মেছিল বলে ওর আজকাল ঘেন্না হয়। ঠাকুরদাও কেমন যেন হয়ে গেছেন। সব কিছু থেকে যেন দূরে থাকেন আজকাল। বাড়িটা যেন আর পেখমের বাড়ি নেই। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, ব্লেড চালিয়ে নিজের মুখটা ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এই রূপ দেখেই তো সুজিত ভুলেছিল। এই রূপের জন্যই তো এত কিছু। তা হলে এটাকে শেষ করে দিলেই তো আপদ চুকে যায়।
আবার চমকে উঠল বিদ্যুৎ। সামনে ভটচাজ গলির মোড়। আর-একটু গেলেই চ্যাটার্জিপাড়া। বিজনদের বাড়ি। সত্যি আসবে তো কাজু? কতদিন দেখেনি! ওর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল আচমকা। চোখে জল এসে গেল। কাজুর মুখটা মনে পড়লেই ওর বুকের মধ্যে কেমন একটা করে। মনে হয় সব ছেড়ে চলে যায় কাজুর কাছে। ওদের ওই দু’কামরার ঘরেই ও থাকবে। মাটিতে শোবে। আধপেটা খেয়ে থাকবে। কাজু যেভাবে রাখবে, সেভাবে থাকবে। নিজেও দরকার হলে কাজ করবে। কিন্তু কাজুকে ছেড়ে কিছুতেই থাকতে পারবে না। ও আকাশের দিকে তাকাল। লালচে আকাশে কালো-কালো ছায়ার মতো গাছেরা মাথা নাড়াচ্ছে। সামনের বড় বটগাছটাও আজ এই হাওয়ার রাতে সব ভুলে যেন পাগল হয়ে উঠেছে! এমন রাতে কি কাজু আসবে না? কাজু কি এতটা ভুল বুঝল ওকে? এতটা পর করে দিল! জানে না কি যে, ওর বাড়ির লোকজন কেমন! কীভাবে সবাই মিলে ওকে আটকে রাখে! কষ্ট দেয়! এতটা ভুল কী করে বুঝল কাজু!
“আরে পেখম, তুই?”
পেখম চমকে গেল খুব। আবছায়ায় আচমকা এভাবে ডেকে ওঠায় প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি কে এটা। তারপর দেখল ফুলুদাদু। ফুলুদাদুরা ওদের বাড়ির পাশে থাকে। ঠাকুরদার খুব বন্ধু। সেই ছোটবেলার বন্ধু যাকে বলে। এক সঙ্গেই দু’জনের পরিবার পার্টিশানের পরে এসেছিল এই সোনাঝুরিতে। ফুলুদাদুদের এখনও কিছু আত্মীয়স্বজন রয়ে গিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে। ফুলুদাদু সেখানেই গিয়েছিল।
পেখম কী বলবে বুঝতে পারল না। ফুলুদাদু পূর্ব পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছে।
ফুলুদাদু বলল, “তুই এখন কোথায় যাচ্ছিস?”
পেখম ইতস্তত করে বলল, “এক বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছি। কিছু বই দরকার।”
