পাড়ার ভেতরের রাস্তাটা ইটের। মাঝে মাঝে ভাঙা। তাড়াতাড়ি হাঁটা খুব অসুবিধের। কিন্তু তাও যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটতে চেষ্টা করল পেখম। ন’টার আগে বাড়ি ফিরতে হবে ওকে। মা আজ মিতুকাকিমার সঙ্গে পাঠ শুনতে গিয়েছে। বাবাকে অনেক করে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নয়নার কাছে যাবে বলে। ন’টার মধ্যে না ফিরতে পারলে মা আস্ত রাখবে না। বাবা বারবার এটাই বলছিল ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়।
পেখম আহত হয়ে তাকিয়েছিল বাবার দিকে। এভাবে কেন বাবা গুটিয়ে যাচ্ছে মায়ের সামনে? যে-বাবা ওকে আগলে রাখত, সে কী করে সরে যাচ্ছে ওর কাছ থেকে!
পেখম বলেছিল, “বাবা, তুমি এমন করে বলছ? আমায় আর একটুও ভালবাসো না, না?”
বাবা চেয়ারে বসে একটা কাগজ দেখছিল। ওর কথায় অসহায়ের মতো মুখ করে তাকিয়েছিল। বলেছিল, “কেন রে মা? এমন বলছিস কেন?”
পেখম তাকিয়েছিল বাবার দিকে। ঘরের বাল্ব জ্বলছিল। তার আলোয় বাবাকে কেমন তামাটে আর ভেঙে পড়া লাগছিল। যেন বাবা আর পারছে না এই জীবন বইতে!
পেখম বলেছিল, “আমার সঙ্গে যা হচ্ছে, তা তুমি মেনে নিচ্ছ কী করে বাবা?”
বাবা বলেছিল, “কী হচ্ছে মা? আমি সাধারণ একজন কর্মচারী। কত টাকাই-বা পাই বল! সেখানে এমন বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসছে, আমি না বলব কোন সাহসে? আমি কি এত ভাল ঘরে তোর বিয়ে দিতে পারব কোনওদিন?”
“আমি তো তা চাইনি বাবা,” পেখমের গলায় অভিমান জমা হয়ে উঠছিল, “আমি কি বলেছি কোনওদিন আমায় বড়লোক বাড়িতে বিয়ে দাও?”
“কিন্তু আমি তো জানি রে মা,” বাবা মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, “সারা জীবন তুই কিছু চাসনি বলেই তো আমার আরও খারাপ লেগেছে। আমি তো কিছুই করতে পারিনি, পারি না। সবাই কত কিছু করে নিজের সন্তানদের জন্য! আমার কি ইচ্ছে করে না আমার মেয়ে ভাল করে থাকুক? জীবনে আরও অনেকটা পথ যাবি তুই, তখন বুঝবি টাকার গুরুত্ব কতটা!”
“টাকাটাই সব বাবা?” পেখমের গলা দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল যেন। এতদিন ধরে চেপে থাকা সব কষ্ট আর যন্ত্রণা আজ মায়ের অনুপস্থিতিতে বেরিয়ে এসেছিল বাবার সামনে।
“সব না হলেও অনেকটা, অনেক-অনেকটা রে মা!” বাবা যেন নুইয়ে পড়েছিল আরও। বাবাকে আরও বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল। কেমন একটা খয়াটে লাগছিল যেন। যেন এইসব কথা আসলে বাবার মনের কথা নয়। কেউ যেন জোর করে বলিয়ে নিচ্ছিল বাবাকে দিয়ে!
বাবা বলেছিল, “আমি যা কোনওদিনও দিতে পারিনি তোকে, সেই সব কিছু তুই পাবি এখানে রে মা।”
“আমি তা চাইনি বাবা, আমি মরে যাব এখানে বিয়ে হলে!” পেখম অসহায়ের মতো তাকিয়েছিল বাবার দিকে।
বাবা উঠে এসেছিল এবার। ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “তুই এভাবে বলিস না। জানিস, তোর যখন ছ’বছর বয়স, একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলি তুই। ডাক্তাররা কিছুই করতে পারছিল না। শেষে মানিকতলার এক ডাক্তার, অনেক বয়স তার, সে সারিয়ে তুলেছিল তোকে। টানা দু’মাস ভুগেছিলি। আমার যে কী গেছিল, সে আমিই জানি। আমার যে কতটা কষ্ট হয় তোর জন্য, কতটা অসহায় লাগে তোর বিপদ হলে তুই জানবি না! তোকে আমরা হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিচ্ছি না! মালিকরা নিজে এসেছে। সেদিন দেখলি তো সুজিতের মা আর সুজিত দু’জনেই এল। কত কিছু নিয়ে এল। তোকে পাশে বসিয়ে কত আদর করল ওর মা। তোর আজ যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, সেটা কিন্তু কাল আর থাকবে না। এমন করে ভাবিস না।”
“কিন্তু আমি যে ভাল থাকব না বাবা! এটা কেন তোমরা বুঝছ না?” পেখম শেষ চেষ্টার মতো করে বলেছিল, “আমার মন বলে কিছু নেই? জোর করে আমার ওপর এসব চাপিয়ে দিচ্ছ কেন তোমরা?”
বাবা বলেছিল, “কারণ, তুই এখনও নিজের ভাল বুঝতে শিখিসনি মা। আর এসব বলেই সময় নষ্ট করবি? বললি যে বেরোবি!”
পেখম বুঝতে পারছিল, বাবা কথা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাই নিজেই ওকে বাইরে যাওয়ার কথা বলছে। ও বুঝতে পারছিল, আসলে মায়ের কথা বা ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাবা যাবে না। বাবা যেতে পারবে না। বাবা মাকে এতটাই ভালবাসে যে, সেখানে পেখমও তুচ্ছ!
ও আর কথা বাড়ায়নি। শুধু এটা বুঝেছিল, যা করতে হবে ওকে নিজেকেই করতে হবে। কেউ কিছু করে দেবে না ওর জন্য!
হাতঘড়িটা দেখল পেখম। ছোট ঘড়ি। নতুন। ডায়ালে অক্ষরগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। সুজিতের মা এটা দিয়ে গেছেন। ওঁরা এসেছিলেন কিছুদিন আগে। বিশাল বড় গাড়িটা ওদের ছোট পাড়ায় যেন আঁটছিল না। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়েছিল গাড়িটা।
সবার মাঝে পুতুলের মতো বসেছিল পেখম। ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বসেছিলেন সুজিতের মা। তখনই এই ঘড়িটা পরিয়ে দিয়েছিলেন উনি।
আজকের আগে এই ঘড়িটা পেখম হাতে দেয়নি। কিন্তু আজ উপায় ছিল না। ও যে ঘড়িটা পরত সেটা মা কাজের দিদিকে দিয়ে দিয়েছে। পেখম আপত্তি করলেও শোনেনি। পেখম বুঝতে পেরেছিল, মা জোর করে এসব করছে! নানাভাবে পেখমকে কোণঠাসা করে ঠেলে দিচ্ছে মালিকদের দিকে।
পৌনে সাতটা বাজে এখন। এখান থেকে চ্যাটার্জিপাড়া হেঁটে যেতে দশ মিনিটের মতো লাগবে। বিজনদের বাড়িতে আজ কেউ নেই। সেখানে আজ দেখা করবে ও কাজুর সঙ্গে।
কাজু প্রথমে রাজি হয়নি। বিজনকে বলেছিল দেখা করতে পারবে না। কিন্তু বিজন খুব জোর করেছে।
