“কাম কাম! কাম ইনসাইড! সামনের সিটে বোসো…” সুপ্রতীক নিশানকে হাত দিয়ে দেখাল।
নিশান ঘুরে গিয়ে সামনের সিটে উঠল। দেখল, ও ওঠামাত্র ড্রাইভারটি নেমে গেল গাড়ি থেকে। বুঝল, এদের সব কিছু বলা থাকে! রাধিয়াও পেছনের সিটে নিজের বাবার পাশে গিয়ে বসেছে।
সুপ্রতীক হাসল নিশানকে দেখে। তারপর রাধিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আই ওয়াজ় আমেজ়ড টু নো দ্যাট ইউ টু আর ফ্রেন্ডস! দারুণ ব্যাপার! আমি আজ আচমকা জানলাম ব্যাপারটা। তুমি আগে বলোনি কেন যে, আমার মেয়েকে চেনো!”
নিশান ভাল করে দেখল সুপ্রতীকের মুখটা। কী বলতে চাইছে মানুষটা? এইসব কথার পেছনে অভিসন্ধি কী? ও দেখল, রাধিয়া মাথা নামিয়ে বসে রয়েছে!
সুপ্রতিক হাসল, “যাক, ভালই হল এটা। রাধির ফ্রেন্ড মানে সে আমার কাছেও স্পেশ্যাল!”
নিশান হাসার চেষ্টা করল। রাধিয়া এই লোকটা সম্বন্ধে ওকে বলেছিল কিছু কথা। নিশান নিজে বলেছিল খবর নিয়ে জানাবে। কিন্তু ও যা জেনেছে, সেটা এখনও রাধিয়াকে বলতে পারেনি। কীভাবে যে বলবে, সেটাই বুঝতে পারছে না। আর আজ সেই লোকটার সামনেই এসে পড়েছে।
সুপ্রতীক বলল, “সেদিন তো অনেক কথা বলছিলে, আজ এত চুপ কেন? তুমি তো আমার কাছে এলে না!”
নিশান নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করল মনে মনে। বলল, “আমি কিন্তু গিয়েছিলাম। একবার না, দু’বার। কিন্তু আমাকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি নাকি দেখা করতে চাননি!”
“আমি? চাইনি?” সুপ্রতীক আকাশ থেকে পড়ল যেন। একবার রাধিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল, “কী বলছে রে! আমার অফিস থেকে এমন বলল! স্ট্রেঞ্জ!”
নিশান কিছু না বলে সামান্য হাসল।
সুপ্রতীক বলল, “আর সেই রাগে তুমি কাল মিছিল-মিটিং করলে!”
নিশান অবাক হল না। এটা তো জানবেই সুপ্রতীক। কাল জমায়েত হয়েছিল ভাল। সোনাঝুরির মানুষজন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই যোগ দিয়েছিল মিছিলে। খবরটা যে সুপ্রতীকের কানে পৌঁছবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সুপ্রতীক আবার বলল, “আচ্ছা, যা হয়েছে ভুলে যাও। তারক আমায় বলল, তোমায় নাকি শিক্ষা দেবে। কিন্তু আমি ওকে বলে দেব তোমায় যেন কিছু না করে। আমার মেয়ের বন্ধু তুমি। আমার বাড়ির লোকই তো হলে প্রায়। তাই আমি যেমন তোমার দিকটা দেখছি, তুমিও আমার কাছের লোক হিসেবে আমার দিকটা দেখবে নিশ্চয়! দ্যাখো, এইসব মিটিং, মিছিল, ডেমনস্ট্রেশন ব্যাড প্রেস অ্যাট্রাক্ট করে। আমরা একটা বিরাট ভেঞ্চার নিচ্ছি। সেখানে প্রেস নেগেটিভ লিখলে কেউ কি আর আসবে এখানে? তাই আমি তোমায় বলছি, এসব কোরো না। আমার মেয়ের বন্ধু তুমি। আমার একটা দায়িত্ব আছে তোমার প্রতি। তাই তুমি এসব থামিয়ে দাও। আমি তোমায় দেখব। ভালভাবে দেখব। কেমন?”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। ওকে দেখবে মানে?
সুপ্রতীক আবার বলল, “আমাদের বাড়িতে এসো। রাধিয়া হ্যাজ় সো লিট্ল ফ্রেন্ডস। জীবনে বন্ধু খুব দরকার মাই ডিয়ার! আমাকেও বন্ধু করে নাও, দেখবে দারুণ হবে! শুধু আমার ব্যাপারটা একটু ভাবো। ওভাবে লোক জুটিয়ে হুজ্জুতি কোরো না। কেমন?”
নিশান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকল। দেখল, রাধিয়া মুখ নামিয়ে বসে আছে। ফরসা মেয়েটা লাল হয়ে গেছে লজ্জায়!
“তো, সেই কথাই রইল। তোমার পাওনা তুমি পেয়ে যাবে। কেমন? আর, একদিন লাঞ্চ করো আমাদের সঙ্গে। ওকে! ঠিক আছে? এখন এসো। আমাদের যেতে হবে!” সুপ্রতীক ঝুঁকে পড়ে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল।
নিশান নেমে গেল গাড়ি থেকে। ড্রাইভারটি গাড়িতে উঠে পড়ল আবার। স্টার্টও দিয়ে দিল। নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। সারা শরীরের রক্ত যেন ফুটছে ওর! ওকে কিনতে চাইছে লোকটা! এত টাকার গরম হয়ে গিয়েছে! মানুষকে আর মানুষই মনে করছে না! ওর মনে হল রাস্তা থেকে একটা আধলা ইট তুলে গাড়িটার পেছনের কাচে ছুড়ে মারে!
কিন্তু কিছু না করে নিশান গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। দেখল, গাড়িটা গড়িয়ে চলে যাচ্ছে সামনের দিকে। আর জানলার কাচ নামিয়ে মাথা বের করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে রাধিয়া। নিশান দেখল, বিকেলের শেষ আলোর মধ্যে মোমবাতির শিখার মতো রাধিয়ার মুখে টলটল করছে লজ্জা আর কষ্ট।
.
২৮. পেখম
আর দু’সপ্তাহ, মাত্র দু’সপ্তাহ! তার মধ্যেই বিয়ে হয়ে যাবে ওর! এই ঘর, এই বাড়ি, বাড়ির সামনের রাস্তা, বড় পুকুর, বাঁশবন, আর পেছনের ওই ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জোনাকিদের ছেড়ে ওকে চলে যেতে হবে। কেন হবে? কীসের জন্য হবে? কে এই সুজিত মালিক? কবে দেখল ওকে? কোথা থেকে দেখল? এই কি রাহুর দৃষ্টি? ওর গোটা জীবনকে কেন গ্রাস করে নিল এইভাবে? কী অপরাধ করেছে ও?
ঘুমোতে পারে না পেখম! খেতে পারে না! এক অদ্ভুত বিষাদ ঘন মেঘের মতো ঝুলে থাকে মনের ওপরে! কিছু ভাল লাগে না ওর। কেউ সাহায্য করার নেই ওকে। মা নয়, ঠাকুরদা নয়, এমনকী বাবাও নয়।
বাবাও কেমন যেন চুপ করে গেছে আজকাল। বাবাকে সবচেয়ে ভালবাসে পেখম। কিন্তু সেই মানুষটা যে এমন চুপ করে যাবে, সেটা ভাবতে পারেনি ও।
শাড়ির আঁচলটাকে চেপে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগল পেখম। সন্ধে নেমেছে সবে। তবে হাওয়া দিচ্ছে খুব। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সারাক্ষণ। যেন আজ সব কিছু এলোমেলো করে দেবে এই হাওয়া!
