বিজনদা এবার ফলসার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমার মায়ের পুরনো শত্রু। তাই আমায় দেখে এমন করছে। তা, তোমার মা নিয়ম মানছে তো?”
ফলসা হাসল, “নিয়ম? মা কি কারও কথা শোনে?”
বিজন এবার এগিয়ে গেল কেয়াদির দিকে। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট বই বের করে রাখল সামনে। বলল, “এই যে বিনয় মজুমদারের কবিতার বই। তুমি পড়তে ভালবাসতে। আর কী আনব বুঝতে পারলাম না।”
কেয়াদি মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। নিশান দেখল কেয়াদির মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ দুটো ছলছল করছে। ও বুঝল এখানে আর ওর বা ফলসার থাকা ঠিক হবে না!
নিশান উঠে দাঁড়িয়ে ফলসাকে বলল, “চল তো বাইরে একটু। কেয়াদিরা কথা বলুক।”
ফলসা বুঝল যে, কিছু একটা ব্যাপার আছে। ও আর দ্বিধা করল না। অবাক হয়ে একবার দেখল দু’জনকে, তারপর বেরিয়ে এল।
নিশান ঘরের বাইরে যেতে যেতে শুনল কেয়াদি বলছে, “সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসতে পারছ না!”
বিজনদা বলল, “তুমি যে বেরিয়ে যেতে বললে!”
“আমি কিছু বললেই সেটা শুনতে হবে? তোমার নিজের বিবেচনা নেই? সারা জীবন এমন থাকবে? আমি একবার না করেছিলাম বলেই…”
ঘরের বাইরে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল নিশান।
ফলসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নিশানের দিকে। তারপর ওর মুখে আস্তে-আস্তে ফুটে উঠল হাসি। বলল, “ও আচ্ছা। এই বিজন… মায়ের ফরেস্ট গাম্প!”
নিশান হাসল। কী বলবে বুঝতে পারল না। কিন্তু একটা জিনিস দেখে ভাল লাগল যে, ফলসা ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি নিয়েছে। এই নিয়ে কোনও বাঁকা কথা বলেনি। বিজনদাকে দেখলে তো আর কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। কিন্তু কেয়াদি ওইটুকু সময়ের মধ্যে এমন করল যে, ফলসা বুঝতে পেরে গিয়েছে।
নিশান বলল, “প্রেম বেকার জিনিস রে ফলসা। তুইও কেন যে প্রেমে পড়লি!”
“ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার গুরু, না পড়ে উপায় আছে?” ফলসা হাসল।
নিশান চোখ বড়-বড় করল।
ফলসা বলল, “দেখ ভাই, আমার সোজা কথা। শুধু প্রেম মারিয়ে জীবন যাবে না। মাল্লু চাই মাল্লু। ম্যাক্সিমাম মেয়েরই তাই। দেখবি, এমনি সাধারণ ভাল ভদ্র ছেলেদের মেয়েরা দয়ার পাত্রর মতো ট্রিট করে। কিন্তু অনেক টাকা, ভাল চাকরি, বড় গাড়ি থাক, মেয়েরা ঠিক সব ঝামেলা সহ্য করে নিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে চলবে!”
“ভাগ, কী বাজে কথা! একটা মেয়ে হয়ে এসব বলছিস তুই?” নিশান অবাক হল।
“আমি জানি তাই বললাম। সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে দেখবি। ম্যাক্সিমাম মেয়েরা এমন। সবাই নয়। কিন্তু ম্যাক্সিমাম। ভাল ভদ্র ছেলে হলে হবে না। আরও চাই আমাদের। সবাই আমরা মনে মনে এলিজাবেথ বেনেট। ডারসিকে দেখে লিজি যতটা না প্রেমে পড়েছিল, সেই প্রেম আরও দশগুণ হয়ে উঠেছিল পেম্বারলির সেই সম্পত্তি দেখে! সেই নাইটিন্থ সেঞ্চুরিতে লিখে গিয়েছিলেন জেন অস্টেন, অবস্থা কিচ্ছু পালটায়নি খোকা!” ফলসা হি হি করে হাসল, “মা এই বিজন লোকটিকে তাড়িয়ে দিয়েছিল কেন? বিশাল রেস্তদার বাপের ছেলে হলে তাড়াত? তাড়াত না! এখন অভিমান দেখাচ্ছে! হাউ কনভিনিয়েন্ট! আর দেখবি, তোর বিজনদাও সেটা গিলে নেবে। গলে যাবে। শোন, আমরা মেয়েরা অনেক প্র্যাকটিক্যাল। তোদের মতো অমন মূর্খ নই। আমরা চাইল্ড বিয়ার করি! আমাদের সফটওয়্যারটাই এমন হয় যে, মেটকে সব দিক থেকে এব্ল হতে হবে। না হলে বেবি সামলাবে কী করে? শুধু প্রেমের খঞ্জনি বাজালেই হবে? জীবন কি হাওয়ায় চলবে?”
নিশান মাথা নেড়ে বলল, “পরের বার ‘সেভ সোনাঝুরি’-র যে-মিটিংটা আছে সেটাতে তুই কিছু বলবি?”
কিছু বলার আগেই এবার ফলসার মোবাইলটা বাজল। মোবাইলটা বের করে নামটা দেখে সেটা নিশানের দিকে ফেরাল ফলসা। তারপর ভুরু নাচিয়ে হাসল। নিশান দেখল কলারের নাম। রাধিয়া!
“হ্যাঁ রে, বল। ও আচ্ছা। না, না, ঠিক আছে, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি… না, না, ইটস ওকে। আরে বাবা, ঠিক আছে! কোনও প্রবলেম নেই। রাখলাম রে,” ফোনটা কেটে ফলসা ভুরু কুঁচকে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী হল রে?” নিশান অবাক হল।
“তোকে রাধিয়া নীচে ডাকছে। গলাটা বেশ টেনস্ড লাগছে ওর। বলল, আজ আসতে পারবে না। কীসব কাজ আছে। খুব জরুরি। তোকে একবার নীচে ডেকেছে। গাড়িতে ওয়েট করছে ও। পাঁচ মিনিটের জন্য ডেকেছে। যা দেখা করে আয়।”
নিশানের অবাক লাগল খুব। এ আবার কেমনতরো কথা! এখানে আসার কথা ছিল কিন্তু আসবে না! নীচে এসেও গাড়ি থেকে নামবে না! কী হয়েছে? বিপদ হল নাকি কিছু?
নিশান আর সময় নষ্ট না করে নীচে নেমে এল।
রোদ নেই আর এখন। বরং একটা মনমরা আলো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। নীচের লবিতে ভিড় বেড়েছে আরও। বাচ্চাদের ছোটাছুটি দেখে মনে হচ্ছে কোনও স্কুলের অনুষ্ঠান হচ্ছে!
ও যতটা সম্ভব দ্রুত মানুষজন কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। আর বেরিয়েই থমকে গেল একদম। আরে, সেই বড় গাড়িটা! সুপ্রতীক মালিকের গাড়ি! রাধিয়া কি আজ এটা করে এসেছে?
ও দ্বিধার সঙ্গে গাড়ির দিকে এগোল। দেখল, ওকে দেখেই হয়তো রাধিয়া গাড়ির দরজা খুলে নামল। অন্যদিন রাধিয়া ওকে দেখে হাসে। আজ কিন্তু মুখটা বেশ সিরিয়াস। কিছুটা ভীতও!
নিশান এগিয়ে গিয়ে রাধিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গেল। কিন্তু তার আগেই রাধিয়া চোখের ইশারায় গাড়ির মধ্যে দেখাল। নিশান তাকাল। কে আছে গাড়িতে। ও সামান্য ঝুঁকে গাড়ির ভেতরটা দেখল এবার। আর চমকে উঠল সঙ্গে-সঙ্গে। দেখল, গাড়ির মধ্যে বসে রয়েছে সুপ্রতীক মালিক!
