“কাজুদা কে কেয়াদি? অনেকে নাম বলে। কিন্তু আর কিছু বলে না!” নিশান অবাক হল।
কেয়াদি আচমকা আবার ফিরে এল এই নার্সিং হোমের কেবিনে। বলল, “তা, মালিকদের সঙ্গে কথা হল? পেখমদির ছেলের সঙ্গে?”
নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির দিনের কথা। মণীশের কথা শুনে ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল নিশান।
তারকের সঙ্গে কথা বলে সুপ্রতীক সবে নিজের গাড়িতে উঠেছিল। তুখোড় বৃষ্টির ভেতরেও দূর থেকে সেটা দেখেছিল নিশান। এবড়োখেবড়ো রাস্তার পরোয়া না করে ও সাইকেল চালিয়ে দিয়েছিল জোরে। তারপর একদম বড় গাড়িটার সামনে তেরছা করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সাইকেলটা।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করেও থতমত খেয়ে আবার বন্ধ করে দিয়েছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সুপ্রতীক জানলার কাচ নামিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, “মরার ইচ্ছে হয়েছে? গাধা!”
সাইকেলটা কোনওমতে স্ট্যান্ড করিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল নিশান। তারপর মুখের জল হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলে বলেছিল, “আমার আপনার সঙ্গে খুব জরুরি দরকার আছে!”
“আমার সঙ্গে?” সুপ্রতীক অবাক হয়ে গিয়েছিল এবার।
নিশান বলেছিল, “আমি ‘সেভ সোনাঝুরি’ থেকে আসছি। আপনারা এভাবে সব কিছু বিক্রি করে সোনাঝুরিকে ধ্বংস করতে পারেন না! এটা অন্যায়! হাজার-হাজার মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে এতে। আপনাদের মূলধন আছে বটে, কিন্তু এত মানুষের সহযোগিতা ছাড়া আজ আপনারা এই জায়গায় পৌঁছতে পারতেন না। সেখানে তাদের সব কিছু এভাবে শেষ করে দিচ্ছেন কোন অধিকারে?”
“বাপ রে!” সুপ্রতীক হেসেছিল নিশানের কথা শুনে, “এই বৃষ্টিতে এভাবে কেউ আসে? এটা কি ভাই সিনেমা নাকি? সাউথের ফিল্ম দ্যাখো বুঝি খুব! এটা কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেটানোর কাজ? ঠিক আছে। আমি কথা শুনব। মিট মি। একদিন এসো আমাদের কাছে, অফিসে। সোনাঝুরি আমারও খুব প্রিয়। আমার মা এখানকারই মেয়ে। তুমি এসো। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজো না। ঠান্ডা লেগে যাবে। কেমন?”
নিশান রাগ করতে চাইছিল। কিন্তু সুপ্রতীক এমন করে কথা বলছিল যে, বুঝতে পারছিল না কী করবে। রাধিয়ার কথার সঙ্গে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না মানুষটাকে।
সুপ্রতীক বলেছিল, “আমিও এভাবে বিক্রির বিপক্ষে। কিন্তু… যাক গে। তুমি এসো একদিন। আমার কার্ড রাখো। অফিসে এসে বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাও। কেমন?”
নিশান ভেজা কার্ড হাতে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়েছিল। কী ভেবে এসেছিল আর কী হল! লোকটাকে খুব করে বলবে বলে যে সারাটা পথ রিহার্সাল দিয়ে এল তার সবটাই মাঠে মারা গেল যে!
কিন্তু সেই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। দু’বার ওদের অফিসে গিয়েছে নিশান। কিন্তু সেখানে সুপ্রতীকের দেখা পায়নি। বারবার ওকে ফিরে আসতে হয়েছে।
“কী রে, চুপ করে কেন, কী হয়েছে বল!” কেয়াদি জিজ্ঞেস করল।
নিশান বলল, “তোমায় তো বলেছিলাম আগে। ভুলে গেছ? আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাজের কথা হয়নি। তাই আমি আর ওয়েট করছি না। গতকাল থেকে ফুল ফ্লেজেড ডেমনস্ট্রেশন শুরু করেছি। আর রেয়াত নেই!”
কেয়াদি হাত বাড়াল। পাশেই একটা বে়ডসাইড টেবিল। সেখানে একটা ক্রিম রাখা আছে।
ফলসা এগিয়ে গিয়ে ক্রিমটা নিল। তারপর কেয়াদির মুখে মাখিয়ে দিল সময় নিয়ে।
বাঁ হাতে স্যালাইন চলছে। হাতটা বেশ ফুলে আছে। কেয়াদির যে কষ্ট হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে নিশান। কিন্তু তাও কেয়াদি কথা বলেই চলেছে।
কেয়াদি বলল, “যা করবি, বুঝে করবি। কেমন? আন্দোলন মানুষের কাজের জন্য। নিজের রোম্যান্স ফুলফিল করার জন্য নয়।”
নিশান ভাবল বলে আন্দোলন ওর কাছে নিছক রোম্যান্স নয়। কিন্তু তার আগেই পকেটের মোবাইলটা নড়ে উঠল। নার্সিং হোমে এসেছে বলে ও রিংটোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল!
“হ্যালো, বলো। হ্যাঁ, উপরে চলে এসো। করিডর… হ্যাঁ, ডান দিকের… লাস্ট কেবিন। এসো।”
“কে আসছে রে?” কেয়াদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“আসছে একজন!” নিশান মুচকি হাসল।
“রাধিয়া?” ফলসা ভুরু নাচিয়ে হাসল।
“তোর এক ভাঙা রেকর্ড! দেখ না কে আসছে।”
নিশানের কথা শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরে দরজায় শব্দ হল একটা।
“এসো,” নিশান যেহেতু দরজার দিকে তাকিয়ে বসেছিল, ও দেখতে পেল মানুষটাকে। ফলসা পেছনে ফিরল আর কেয়াদি বাঁ দিকে তাকাল। আর তাকিয়েই কেয়াদি কেমন যেন স্থির হয়ে গেল।
নিশান হেসে উঠে গিয়ে হাত ধরল মানুষটার। বলল, “এসো বিজনদা।”
বিজনদা খুব সংকুচিত হয়ে দাঁড়াল একপাশে। একমুখ দাড়ি। ঢোলা পাজামা। রংচটা কুসুমরঙের পাঞ্জাবি। পায়ে রাবারের একটা চটি। পাকা চুলগুলো এলোমেলো!
ফলসা বুঝতে পারল না কে লোকটা। ও তাকিয়ে রইল।
কেয়াদি নিজের অবাক হয়ে যাওয়া ভাবটা কাটিয়ে এবার কড়া গলায় বলল, “এ কী! তুমি? এখানে কী করছ?”
বিজনদা হাসল। তারপর স্বভাবগত দ্বিধা নিয়ে বলল, “না মানে, নিশানের কাছে শুনলাম তোমার অপারেশন হয়েছে। তাই…”
“আমি কি চিড়িয়াখানার জিনিস নাকি?” কেয়াদি রাগে গরগর করছে একদম।
বিজনদাকে একটা টুল এগিয়ে দিল ফলসা। ও বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে!
কেয়াদি বলল, “খবরদার বসবে না তুমি। বেরিয়ে যাও।”
বিজনদা হাসল, “আরে, সে তো যাব। কিন্তু আছ কেমন?”
“তাতে তোমার কী?” কেয়াদি চোখ পাকাল।
