নিশান বলল, “আমি বাস্তবের পৃথিবীতে থাকি ফলসা। ও মালিক গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র মেয়ে। আর আমি? আমার জীবন কেমন তুই জানিস না? আমাদের খাওয়া পরার অভাব নেই। কিন্তু আমরা তো মধ্যবিত্ত। সেখানে ওরা… এটা তো সিনেমা নয় রে বাবা! প্লাস আমার জীবন কেমন সেটা আমি জানি। ধরাবাঁধা কাজে আমি থাকি না। জানি আমাকে আমাদের ব্যাবসা দেখতে হবে একসময়। কিন্তু পাশাপাশি আমি মানুষের জন্য যে-কাজ করি, সেটাও তো করতে চাই। ওকে আমি কী বলব বল?”
“ওকে তোর ভাল লাগে সেটা বলবি!”
“পাগল নাকি! তারপর না করে দিক! তখন তো যোগাযোগটাও যাবে!”
“ও না করবে না,” ফলসা এমন করে বলল, নিশানের মনে হল গড়িয়াহাটে বোধহয় জ্যোতিষের চেম্বার খুলেছে মেয়েটা।
“তোকে বলেছে?” নিশান হাসল।
“সব কিছু বলতে হয় না। আমি নিজে মেয়ে না? আমি বুঝি!”
নিশান ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই মেয়ে? শিয়োর জানিস?”
“শালা, চল!” ফলসা এবার নিশানকে ধাক্কা দিয়ে ডান দিকের করিডরে এগিয়ে গেল নিজে।
মোটামুটি চওড়া করিডর। দু’পাশে ঘর। মাথার ওপর নরম আলো। মেঝেও ঝকঝক করছে। নরম মাখনরঙা দেওয়াল। এদিকটা যে কেবিন, বুঝতে পারল নিশান। ফলসা গিয়ে থামল একদম শেষের ঘরটায়। করিডরটা সেখান থেকে ডান দিকে বেঁকে গেছে। অপারেশন থিয়েটার ওইদিকে। সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ড দেখে বুঝল নিশান।
কেবিনের ভেতরে সোজা ঢুকে গেল ফলসা। কিন্তু নিশান একটু ইতস্তত করল। ভেতরে দু’জন বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, এবার তাঁরা বেরিয়ে যাবেন। নিশানের মনে হল, এটা কেয়াদিদের খুব ব্যক্তিগত একটা মুহূর্ত। ওর বোধহয় একটু বাইরেই থাকা উচিত!
“তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? কাছে আয়!”
কেয়াদির গলাটা ক্লান্ত লাগলেও দাপট যে একই রকম আছে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না নিশানের। ও হেসে এবার ঘরে ঢুকল।
ঘরটা বেশ বড়। একপাশের দেওয়ালের গোটাটা জুড়েই জানলা। তাতে লম্বা ব্লাইন্ডস লাগানো। জানলা থেকে বিছানার মাঝখানেও বেশ কিছুটা ফাঁক। সেখানে চার জন বসতে পারে এমন সোফা রাখা আছে। বিছানার এদিকেও দুটো চামড়ায় বাঁধানো টুল রয়েছে। নিশান গিয়ে সোফায় বসল।
কেয়াদি বয়স্ক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “ও খুব ভাল ছেলে। এই সময়ে সবাই যখন নিজের কেরিয়ার আর নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিজের কথা না ভেবে ও মানুষের জন্য কাজ করে।”
ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে। খুব গদগদ হয়ে এসে নিশানের হাত ধরে ঝাঁকালেন! বললেন, “আমার ছেলেও তো তাই করে। মানুষের হয়ে কাজ করে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার!”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না।
ভদ্রলোক এবার কেয়াদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা তা হলে আসি। আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। কেমন?”
কেয়াদি মাথা নাড়ল শুধু। ভদ্রমহিলা ফলসার মাথায় হাত বুলিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর দু’জনে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নিশান বলল, “ফলসা, তুই গেলি না ওঁদের সঙ্গে? একটু এগিয়ে দিতিস।”
ফলসা বলল, “কেন? আমার বাড়িতে এসেছিল নাকি ওরা? মাকে দেখতে এসেছে। নিজেরাই ঠিক বেরিয়ে যাবে।”
কেয়াদির খাটটা ভেঙে আধশোয়া করা আছে। কেয়াদিকে সারাক্ষণ মেক আপ করা অবস্থায় দেখেছে নিশান। এখন কেমন যেন লাগছে। বয়সটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে!
কেয়াদি বলল, “তুই কী দেখে এই ফ্যামিলির ছেলেকে বিয়ে করবি ভাবলি রে ফলসা! এসে থেকে সারাক্ষণ টাকার কথা বলে গেল। যেন আর কিছু নেই এই পৃথিবীতে! এত টাকার গরম কেন! এসব তো ছোটলোক আর হাড়হাভাতেদের থাকে!”
ফলসা বলল, “মা, প্রণীত এমন নয়। তুমি ওকে দেখলে বুঝতে পারতে। সিঙ্গাপুর থেকে নেক্সট মান্থে তো আসছে। দেখবে।”
কেয়াদি মাথা নেড়ে নিশানের দিকে তাকাল, “তুই আজ এলি! আগে এলি না কেন রে? অপারেশন টেবিলে যদি মরে যেতাম তা হলে? আর তো দেখা হত না। আজ এসেছিস কেন?”
“কেয়াদি তুমি এমন কথা বোলো না! আসলে কাল আমাদের একটা ডেমনস্ট্রেশন ছিল। মিছিল। অবস্থান। সেই নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম!”
কেয়াদি ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “ও বাবা, তুই সত্যি এসব করছিস এখনও!”
নিশান সোজা হয়ে বসল, “হ্যাঁ, কেয়াদি। তুমি-আমি মিলেই তো সব শুরু করেছিলাম। তুমি শরীর খারাপের জন্য সরে গেলে। কিন্তু আমাকে তো করতেই হবে। উপায় কী বলো? গরিব লোকগুলোর হয়ে কে কথা বলবে? ওদের বাড়ি, দোকান সব ভেঙে দেবে। মিল বন্ধ করে দেবে। ওরা যাবে কোথায়? কলকাতার ফুটপাথে? যেখানে অলরেডি কয়েকহাজার লোক এসে বসে পড়েছে! ওদের কথা কে বলবে কেয়াদি?”
কেয়াদি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বিকেলের নরম, সুখী কলকাতা। শীত আসার আগের অভিমানী কলকাতা। নিশান দেখল, হঠাৎ যেন কেয়াদি নেই এখানে! যেন চলে গেছে অন্য কোথাও!
নিশান অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল, “কী হল কেয়াদি?”
কেয়াদি কেমন একটা আবছা গলায় বলল, “আমি তখন অনেক ছোট, জানিস। এত কিছু বুঝি না। কিন্তু বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম ফ্যাক্টরি গেটে। এমনি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কাজুদা কথা বলছিল বলে বাবা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমি সাইকেলের সামনে বসে শুনছিলাম। এরকমই বলত কাজুদা। আর সবাই শুনত। কী সুন্দর দেখতে ছিল! মাথাভরতি কোঁকড়া চুল। হালকা দাড়ি। আমার শরীরে তখনও নারীভাব আসেনি, কিন্তু তাও কেমন একটা ভাললাগা আসত!”
