আইকা তাকিয়েই থাকে। সামনে খোলা কম্পিউটার, ডায়েরি, পেন, পাশে রাখা চায়ের কাপ— সব কিছু থেকে কীভাবে যেন আলাদা হয়ে যায় ও। একা হয়ে যায়। মনে হয় ও নিজেও তো তাই। পিঁপড়ে! পেটের ভিতর ওরও তো একটা চুম্বক রয়ে গিয়েছে! আর তার প্রবল টানে ও নিজেও তো ঘুরে মরছে!
টুংটুং করে বেজে ওঠা মোবাইলের শব্দে আইকার সংবিৎ ফিরল এবার। স্ক্রিনটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। ও ফোনটা হাতে তুলে দেখল। মেসেজ। সার্ভিস প্রোভাইডারের! মেসেজটা ডিলিট করে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চোখ রাখল আইকা। ফেব্রুয়ারির শেষ এখন। তাতেই কী গরম! নেহাত এসি রয়েছে তাই বাঁচোয়া। ইয়ার এন্ড হতে আর মাসখানেক মতো বাকি। এখনই খুব একটা চাপ নেই কাজের। তাও আইকা কাজ ফেলে রাখে না। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিয়েলটরস’-এর সিনিয়র ম্যানেজার স্টোরস-এর পদটা তো আর কোম্পানি ওর মুখ দেখে দেয়নি! কাজ করে বলেই সব হয়েছে।
জীবনে কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝেনি আইকা। এর জন্য সব ছেড়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ও তো দেখেছে কী হয়েছিল ওদের সঙ্গে! জেঠুরা তো প্রায় কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিল বাড়ি থেকে। ওদের পাওনা দেয়নি। মাকে খুব কষ্ট করতে হয়েছিল। বাবার সামান্য পেনশন আর মায়ের প্রাইমারি স্কুলের চাকরি ভরসা করে যাদবপুরে খুব ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল ওরা! ক্লাস সেভেনে পড়ত তখন। ছোট্ট দুটো ঘর। একটুখানি একটা বেসিন। আবছা অন্ধকার একটা বাথরুম। দু’মিনিট টানা কল খুলে রাখলে বাড়িওয়ালি জেঠিমা দোতলার বারান্দা থেকে মুখ বাড়িয়ে গালাগাল করত। কাপড় কাচলে বলত, “এটা বস্তি নয় যে, এমন আওয়াজ করছ!” কথায়-কথায় জেঠিমা জিরাফের মতো গলা বাড়াত। চিৎকার করত। উঠে যাওয়ার হুমকি দিত। এমনকী, একদিন তো মাকে বেশ্যা পর্যন্ত বলেছিল, ঠিকমতো মেন গেট আটকায়নি বলে। তবে এই শেষ কথাটা মেনে নিতে পারেনি আইকা। তখন ও ক্লাস নাইনে পড়ে। যা ঝগড়া সেদিন ও করেছিল! জেঠিমা তো শেষপর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিল! কোনওদিনই অন্যায় মেনে নিতে পারে না ও। সেদিনও পারেনি। আজও পারে না! সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে কোথায় যেন একটা ভাললাগা এখনও মনে আসে! জেঠিমার ওই ভয় পেয়ে যাওয়া মুখটা এখনও চোরা একটা তৃপ্তি দেয় ওকে। তবে সত্যি বলতে কী, সেসব দিনগুলো আর ভাবতে চায় না আইকা।
কম্পিউটারের দিকে মনোযোগ দিল এবার আইকা। ইনভেন্ট্রির লিস্ট পাঠানো হয়েছে ওকে। এসব ওর আর নিজে না দেখলেও চলে। কিন্তু তাও দেখে ও। স্টোরের লোকজন চুরি করে। সাইটে মাল পাঠানোর সময় দরকারের চেয়ে বেশি মাল নিয়ে যায়, কিন্তু চালান-এ সেটা দেখায় না। তাই আপ টু ডেট ইনভেন্ট্রি লিস্ট মিলিয়ে নিতে হয়। কতটা মাল গেল আর কতটা থাকল দেখে নিতে হয়।
স্টোরের বড়বাবু রমেন মণ্ডল লোকটা ঘোড়েল। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, তেল দিয়ে পালিশ করা চুল, লাল বেদানার মতো দাঁত নিয়ে দরকারের চেয়ে বেশি হেঁ হেঁ করে! এমন হেঁ হেঁ করা মানুষ দেখলে বড্ড রাগ হয় আইকার। উপরের প্লাস্টিকের হাসির তলায় লুকোনো দাঁত-নখগুলো ভালই চিনতে পারে ও। জীবন ওকে এইসব জিনিস চিনিয়ে দিয়েছে।
আগে লোকটার উপর ভরসা করত আইকা। কিন্তু এখন আর করে না। লোকটা যে জিনিস সরায়, সেটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু হাতেনাতে ধরতে পারেনি। কিছু বললেই বলে, ওয়েস্টেজ বেশি। লেবাররা শয়তানি করে। কনস্ট্রাকশানে নানা ঝামেলা। তাই এমন বাড়তি ব্যয় হচ্ছে! আরে বাবা, দিব্যি ভাল ওয়্যার হাউস। লেবারদের খবরও অন্যদের থেকে পায়! সেখান থেকে ওয়েস্টেজ কী করে বেশি হবে?
কিন্তু এসব তো আর মুখের কথায় হয় না। প্রমাণ চাই। তাই আজকাল নিজেই আচমকা মাঝে মাঝে ওয়্যার হাউসে যায় আইকা। মাঝে মাঝে সাইটেও যায়! আর ওকে সামনে দেখলে রমেন এখনও হেঁ হেঁ করে। কিন্তু আজকাল ওই হাসির আড়ালে বসে থাকা শয়তানটাকে চিনতে পারে ও।
আইকার সাড্ন ভিজ়িটের জন্য চুরি কিছুটা কমেছে। ও নিজে গিয়ে সব মালপত্তর মিলিয়ে রমেনবাবুকে দিয়ে ইনভেন্ট্রি লেজারে সই করিয়ে নেয়। লোকটা পাঁকাল মাছের মতো, ঢিলে দিলেই কিছু একটা করে বসবে।
আইকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা আজ কেন কে জানে ছিটকে যাচ্ছে বারবার। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে! একটা ফড়িং ঢুকে গিয়েছে যেন মাথার ভিতর। যতই টেনেটুনে মনটাকে বসানোর চেষ্টা করছে, ততই মনটা কীরকম যেন পিছলে যাচ্ছে! কাজ করতেই ইচ্ছে করছে না। এখানে বসে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। কিছুই ইচ্ছে করছে না। আজ দিনের সব কিছুই ‘না’ দিয়ে তৈরি! কারণ, শুধু মনে পড়ছে আজকের তারিখটার কথা! আজই ওর বিয়ে হয়েছিল না! বিয়ের তারিখটা আজই তো!
“কী রে আইকা? বাড়ি যাবি না?”
মুখ তুলে দূর্বাকে দেখল আইকা। মেয়েটা তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কিন্তু সেটাও বুঝতে আজ সামান্য সময় লাগল ওর। তারপর বলল, “বাড়ি?”
দূর্বা হেসে বলল, “ক্যালানে হয়ে গেলি? ক’টা বাজে দেখেছিস? সওয়া পাঁচটা। আজ তোর নোঈ-এর ওই ব্যাপারটা আছে না? বলেছিলি তো আমায় নিজেই। তোকে তো যেতে হবে।”
আরে, তাই তো! আইকা চমকে উঠল। সব ভুলে যাচ্ছে! কী কাণ্ড! ও চট করে ঘড়ি দেখল। ছ’টায় ছেলের বাড়ির লোকরা আসবে। এখন সওয়া পাঁচটা বাজে। ওর তো মিষ্টি কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা। তিনরকম মিষ্টি আর দু’রকম নোনতা। কী কাণ্ড!
