.
২৭. নিশান
নার্সিং হোমটা চার তলা, বড়। বেশ সাজানো-গোছানো। খুব আধুনিক দেখতে। নিশান গেটের সামনে এসে একটু থমকে দাঁড়াল। বিকেল চারটে থেকে ছ’টা অবধি ভিজ়িটিং আওয়ার্স। ও দেখল নীচের লবিতে বেশ ভিড়। আজ রবিবার। এই দিন বাচ্চাদেরও নিয়ে আসা যায়। কিছু কুচোকাঁচা নার্সিং হোমের লবিকে হোটেলের লবি ভেবে দৌড়োদৌড়ি করছে।
নিশান এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর দেখতে পেল মেয়েটাকে। ওই তো ফলসা বসে রয়েছে। কেয়াদির মেয়ে ফলসা। এখন বেঙ্গালুরুতে থাকে। মায়ের অপারেশন হয়েছে বলে এসেছে।
কেয়াদির দু’বার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দুটোই ভেঙে গেছে। প্রথম বিয়ে থেকে কোনও সন্তান হয়নি। ফলসা কেয়াদির দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে। ফলসার বাবার সঙ্গে সেভাবে আর যোগাযোগ নেই কেয়াদির। ভদ্রলোক এখন ফ্রান্সে থাকেন। সেখানে একজন আলজিরিয়ান মহিলাকে বিয়ে করেছেন।
ফলসাকে ভাল করেই চেনে নিশান। এখন নিয়মিত আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু তাও দেখা হলে ভালই কথাবার্তা হয়।
নার্সিং হোমের লবিটার একটা দিক কাচের দেওয়াল দেওয়া। সেখানে কিছু সিট লাইন দিয়ে বসানো আছে। কোণের দিকে টবে রাখা একটা বড় পাতাবাহার গাছ। তার পাশের সিটে বসে রয়েছে ফলসা।
সামনে ছড়ানো মানুষদের কাটিয়ে ফলসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিশান। মেয়েটা গত চারদিন আগে এসেছে এখানে। গত দু’দিন আগে কেয়াদির অপারেশন ছিল। ইউটেরাস বাদ গেছে। কেন, কী হয়েছে সেসব আর ডিটেলে শোনেনি নিশান। মেয়েদের ব্যাপার এসব, ও কী আর শুনবে!
“বাব্বা, এই তোর আসার সময় হল?” ফলসা চোখ বড় করে উঠে দাঁড়াল।
নিশান হাসল। বলল, “কেন, দেখা করার সময় তো এখনই।”
“সেটা মাকে গিয়ে বলিস। সকাল থেকে বলছে নিশান কই! ডাক্তার বলছেন বেশি কথা বলবেন না, কিন্তু জানিস তো মা কারও কথা শোনার পাত্রী নয়। সে ডাক্তারকেই ধমক-চমক দিয়ে একশা করে রাখছে! নার্সরা মায়ের জ্বালায় অস্থির হয়ে গেছে!”
নিশান হাসল। কেয়াদি কেমন সে ভাল করেই জানে। ওকেই কি কম বকুনি দেয়? দেখা হলেই শাসন!
ও জিজ্ঞেস করল, “এখন তো সাড়ে চারটে বাজে। তুই নীচে কেন?”
ফলসা হাসল। সামান্য লজ্জাও পেল যেন। বলল, “না মানে, আমার হবু শ্বশুর আর শাশুড়ি গেছেন ওপরে। মায়ের কাছে আছেন ওঁরা। প্লাস তুই আসবি। তাই আমি তোকে রিসিভ করতে নীচে আছি।”
“আমায় রিসিভ করতে?” নিশান হাসল, “মাইরি! তুই শিয়োর যে, তুই কেয়াদির মেয়ে!”
“মারব শালা! ওপরে চল,” ফলসা হাতের মুঠো পাকিয়ে বলল।
“দ্যাটস মোর লাইক ইট! তা, কতজন দেখা করতে পারে একসঙ্গে?”
“সেভাবে কিছু রেসট্রিকশন এখানে নেই। প্লাস কেবিন নেওয়া হয়েছে। তুই চল না!”
নিশান ঘড়ি দেখল। তারপর দরজার দিকে তাকাল। এখনও এল না তো! বলেছিল চলে আসবে। দেরি হচ্ছে কেন? একবার কি ফোন করবে? নাঃ, সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। নিজে থেকে এতটা উতলা হওয়া ওর মানায় না।
“আরে, আসবে আসবে, অত ভাবছিস কেন? আমাকেও ফোন করেছিল রাধিয়া। বলেছে আসতে একটু লেট হবে। কিন্তু আসবে। হাঁপিয়ে মরে যাস না!” ফলসা চোখ টিপল।
নিশান ভুরু কুঁচকে বলল, “তোর মা কিন্তু এখানে ভরতি। শরীর খারাপ। একটু সিরিয়াস হ ফলসা।”
“ইস, জ্ঞান দিচ্ছে! নিজে হেদিয়ে মরছে! আমি জানি না ভেবেছিস?”
“আমরা ভাল বন্ধু,” নিশান গম্ভীর গলায় বলল।
“ওইসব ঢপবাজি কাকু ‘সেভ সোনাঝুরি’-র লোকেদের দেবেন! আমরা ভাল বন্ধু!” ফলসা ওকে নকল করে বলল, “যেন বিরাট কোহলি! শালা মারব কানের গোড়ায়!”
“আরে! আর কনফিউশন নেই!” নিশান আশপাশে দেখল, “মা-মেয়ে পুরো সমান। বেঙ্গালুরুতে থাকিস কী করে! সেখানে থেকে তো একটুও উন্নতি হয়নি দেখছি তোর!”
“উনি আমার বন্ধুর সঙ্গে প্রেম করবেন আর আমরা কিছু বললেই দোষ!” ফলসা আলতো করে মারল নিশানের হাতে।
নিশান হাসল। দেখল, আশপাশ থেকে কয়েকজন তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কেউ সামান্য হাসছে আবার কেউ খুব বিরক্ত মুখ করে বোঝাতে চাইছে এইসব করার জায়গা এটা নয়!
ফলসা কনুই দিয়ে আলতো করে মারল নিশানকে, “প্রপোজ় করেছিস?”
“ভাগ!” নিশান সামান্য লাল হয়ে গেল নিজের অজান্তেই। সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল ওর! নিজেরই অবাক লাগল।
“এখনও বলিসনি? আমায় তো রাধিয়া বলে তোর কথা। তুই কত ভাল। কত হেল্পফুল! প্রথম থেকেই নাকি ওর মনে হয়েছে, তোকে সব কথা বলা যায়! এটসেট্রা এটসেট্রা। তাও তুই প্রপোজ় করিসনি? কেন?”
“আচ্ছা, আমি কেয়াদিকে দেখতে এসেছি। এখানে এসব কথা না বললেই নয়? কেয়াদি এমন অসুস্থ! সেখানে তুই কী শুরু করলি!” নিশান এবার সিরিয়াস গলায় বলল।
“মা অসুস্থ ছিল, আর নেই। অপারেশন ভাল হয়েছে। সেটা হিল হতে যা সময় নেবে। ব্যস, আর কিছু নয়। বুঝলি? এখন উত্তর দে।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় দাঁড়াল নিশানরা। করিডর চলে গেছে দু’দিকে। সামনে একটা কাউন্টার। দু’জন নার্স বসে রয়েছে। পাশের লম্বা বেঞ্চে দু’জন ওয়ার্ড বয় বসে মোবাইল নিয়ে কীসব গুজগুজ করছে।
নিশান এদিক-ওদিক তাকাল। কোনদিকে যেতে হবে!
ফলসা নাছোড়বান্দা গলায় বলল, “কী রে বল! তারপর যাব। আগে বল, তুই এখনও কিছু বলিসনি কেন?”
নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভুলে গেছি বলতে! খুশি!”
“মারব এবার, বল!” ফলসা ঠোঁট কামড়ে হাত মুঠো করে ঘুসি পাকাল আবার!
