আইকা দেখল ব্রতীন বিশেষ কথাই বলল না। সারাক্ষণ দূর্বার পেছনে-পেছনে ঘুরে গেল। এমনকী, যাওয়ার সময়ও গুড বয়ের মতো দূর্বার পেছন-পেছন লিফটে করে নেমে গেল।
আইকা ভেবেছিল ওরাও একসঙ্গে যাবে, কিন্তু দেখল মা এগোচ্ছে না। অর্থাৎ মা ওদের সঙ্গে এক লিফটে নামতে চায় না।
“এবার চল,” মা এগিয়ে এসে দাঁড়াল আইকার সামনে।
“কী হয়েছে তোমার?” আইকা জিজ্ঞেস করল।
মা লিফটের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “হাঁটুর বয়সি ছেলেকে বিয়ে করছে! সেটা আবার নেচে-নেচে সবাইকে দেখাচ্ছে! বেহায়াপনার কোনও মানে হয়?”
“মা!” আইকা বিরক্ত হল। এসব কী বলছে মা!
মা কিছু না বলে লিফটের কল বাটনটা টিপল।
অক্টোবরের শেষ এখন। গরম খুব। আজকাল শহরে এত গরম পড়ে! আসলে এটাই স্বাভাবিক। এত পলিউশন! এত মানুষ! গরমের আর দোষ কী!
লবিতে বেশ গরম লাগছে। আইকা বুঝতে পারছে শরীরের ভাঁজে ঘাম জমা হচ্ছে। নীচে গিয়ে একটা গাড়ি ধরতে পারলে এখন বাঁচে। গাড়িটা আজ আনেনি। এখানে একটা বড় স্কুল আছে। ভিড় থাকে বেশ রাস্তায়। গাড়ি পার্ক করা খুব ঝামেলা।
লিফট দিয়ে নামতে-নামতে মা বলল, “তবে এলেম আছে মেয়েটার। তোর তো তাও নেই! কিন্তু তোকে ওর চেয়ে কত ভাল দেখতে! সেখানে তুই কিছুই করতে পারলি না। আজকাল বিধবাদের বিয়ে হয় যখন-তখন। সেখানে তুই গাধাই রয়ে গেলি।”
“মা, কী বলছ তুমি!”
মা নাক দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, “কেবলি একটা। একটা কিছু যদি পারিস!”
আইকা জানে কথাটা ঠিক নয়। বহু পুরুষ ওকে পছন্দ করে, ওর দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ও কাউকে পাত্তা দেয় না। ঋষিকে যা একটু পাত্তা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে।
বহুদিন পরে পুশকিনকে দেখে মনে একটা নরম ভাব এসেছিল ওর। কিন্তু ক্রমশ বুঝেছে যে, পুশকিন ওর সামনে এলেই কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়। কেমন যেন পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। ব্যাপারটায় বেশ অপমান হয়েছে আইকার। তাই আজকাল পুশকিনের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখে ও। আইকার কাছে সম্মানের চেয়ে বড় কিছু হয় না।
আইকা মোবাইলের অ্যাপ থেকে একটা গাড়ি ডেকে নিয়েছিল লিফট থেকে নামতে-নামতেই। নীচে নেমে গাড়িকে ফোন করে আইকা বলল ওরা কোথায় আছে।
রাস্তায় বেশ ভিড়। স্টুডেন্ট আর তাদের বাবা-মায়েরা ছানা কাটার মতো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। কিন্তু বড় বাস দুটো আর নেই। বেরিয়ে গিয়েছে নিজের-নিজের স্টুডেন্ট তুলে নিয়ে।
মা কেমন একটা রাগী মুখ করে আছে। দূর্বাকে দেখার পর থেকেই মা কেমন যেন হয়ে গেছে। আইকা কথা বাড়াল না। আজ দিনটা ভাল নয়। সবার সঙ্গে ওর ঝামেলা লাগছে!
আইকা অ্যাপে দেখল, গাড়িটা প্রায় এসে গেছে দেখাচ্ছে। ও ডান দিকে তাকাল। আর দেখতে পেল গাড়িটাকে। সাদা একটা হাচব্যাক। গাড়িটা কাছে আসতেই হাত তুলে সেটাকে থামাল আইকা। তারপর দরজা খুলে মাকে উঠতে বলল। মা গাড়িতে উঠে ড্রাইভারের পেছনে বসল। আইকা কাঁধের ব্যাগটাকে সিটের ওপর রেখে নিজেও এবার উঠতে গেল। কিন্তু আচমকা কী একটা চোখে পড়ায় থমকে গেল ও।
নোঈ না? আইকা একটু দূরে উলটো দিকের ফুটপাথে তাকাল। সত্যি তো! ওই তো নোঈ! লোকজনের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। কী করছে ও? তারপর সামান্য দৃষ্টি ঘুরিয়ে গাড়িটা দেখতে পেল আইকা। নীল রঙের হাচব্যাক। টিন্টেড গ্লাস। দেখল, গাড়িটা পার্ক করে সেটা থেকে নামল পুশকিন। এখানে কাজে এসেছে ওরা।
আইকা থামল এক মুহূর্ত। নোঈরা ওকে দেখতে পাচ্ছে না। এদিকে ওদের খেয়ালই নেই। ও দেখল, নোঈ হাসছে খুব। পুশকিন কিছু বলছে আর নোঈ হাসছে। সামনে একটা রেস্তরাঁ। সেইদিকে এগোল ওরা দু’জনে। কিন্তু ঢুকল না। পুশকিন দাঁড়িয়ে গেল রেস্তরাঁর দরজার সামনে। আর নোঈ আচমকা এগিয়ে গিয়ে পুশকিনের গাল থেকে লেগে থাকা কিছু একটা সরিয়ে দিল!
এক মুহূর্ত। নোঈ আর পুশকিন কাছে এল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু ওইটুকু সময়ের জন্যই কী যে হল, বুঝতে পারল না আইকা। মনে হল সামান্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ তৈরি হল। আর তা ওই পার থেকে ছিটকে এসে গেঁথে ফেলল আইকাকে।
এভাবে পুশকিনের গালে হাত দিল কেন নোঈ? পুশকিন না ওর বস? তার সঙ্গে কী করে এমন করে নোঈ? আর পুশকিন সেটা হতে দিল? কেন? নোঈ কি ভুলে গেছে পুশকিনের সঙ্গে ওর কী করে আলাপ? ভুলে গেছে পুশকিন ওর চেয়ে কত বড়। চোয়াল শক্ত করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল আইকা। তারপর কেন কে জানে ওর হঠাৎ কষ্ট হল খুব। মনে হল মা ঠিক বলেছে। ও একটা কেবলি! ওর কেউ নেই। নিজের বলতে কিছু নেই। আইকার আচমকা মনে পড়ে গেল সকালের একটা কথা। আচ্ছা, রুপিন ওকে কেন খুঁজছিলেন? কীসের দরকার ছিল ওর সঙ্গে! ওর মনে হল রুপিনের কাছ থেকে ওর জানাই হল না রুপিন কী ব্যাপারে ওর সাহায্য চাইছিলেন। আচমকা রুপিনের মুখটা সামনে ভেসে উঠল আইকার। মনে হল জর্জ ক্লুনি তাকিয়ে রয়েছেন ওর দিকে! মনে পড়ল দূর্বার রুপিনকে নিয়ে বলা কথাটা। সত্যি আর মিথ্যেগুলো কেমন যেন গুলিয়ে গেল ওর। যেন বুঝতেই পারছে না কোনটা বিশ্বাস করবে আর কোনটা বিশ্বাস করবে না। গাড়ির কাচে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল আইকা। বিকেলের নরম হয়ে আসা আলোয় মনে হল, এই মেয়েটাকে ও আর চেনে না!
