আইকা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, “এসব আমায় বলেননি কেন? আমার গোটা চেষ্টাটাই তো বৃথা হয়ে গেল! আমি তো এমনও বন্দোবস্ত করেছিলাম যে, অন্য কোম্পানি কী টাকা দিয়ে জায়গা কিনবে, মানে কত কোট করবে সেটাও জেনে নেব।”
“লিস্ন আইকা, লিস্ন, আমাদের ম্যানেজমেন্টে চেঞ্জ এসেছে, এটা তো জানো। আমি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম আমরা যে মিলটা ডেমলিশ করে বাড়ি করব, সেটা ওদের ভাল লাগছে না। প্লাস এখানকার পার্টির এক মাথা আমার সঙ্গে কথা বলেছে। রিতু না কী যেন নাম। আমাকে বলা হয়েছে, সরকার চায় না জুটমিল বন্ধ হয়ে যাক। সামনে ভোট আসছে। তাই গোটা ইকোয়েশনটাই পালটে গেছে। তারক যদি…”
কিন্তু এবার রুপিনকে থামিয়ে দিয়েছিল আইকা, “আপনি জানেন কী ভাষায় লোকটা কথা বলেছে! বলেছে, আমায় নাকি ওর পছন্দ তাই আমায় এসব বলছে! হি ইভন ইউজ়ড স্ল্যাং ওয়ার্ডস!”
“স্ল্যাং!” রুপিন মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন।
“আমি, আমি…” আইকার আচমকা জল এসে গিয়েছিল চোখে! তারকের বলা কথাগুলো সময়ের সঙ্গে যেন আরও কঠিন আর তীক্ষ্ণ হয়ে ফিরে এসেছিল ওর মনে। আইকা নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিল, ও কেন এমন কেঁদে ফেলল রুপিনের সামনে!
আইকা মাথা নিচু করে বসেছিল। কোলের ওপর টপটপ করে জল পড়ছিল ওর চোখ থেকে!
“আরে, কাঁদছ!” রুপিন কী করবেন যেন বুঝতে পারছিলেন না! তারপর নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আইকা সেটা না নিয়ে হাত দিয়ে চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল, “সরি স্যার! আই লস্ট কন্ট্রোল। কিন্তু আপনি যদি চান, আমি রিজ়াইন করতে পারি!”
রুপিন বলেছিলেন, “তুমি নিজের ডেস্কে যাও। বালির কাজটা শেষ করো। আমি সোনাঝুরি নিয়ে হেড অফিসে কথা বলছি। দেখি, তারা শেষমেশ কী ডিসিশন নেয়। তবে একটাই কথা, যা পরিস্থিতি তাতে অন্য যারাই এতে ইনভেস্ট করবে, তাদের প্রফিট বের করতে মুশকিল হবে খুব! আর ওয়াশ ইয়োর আইজ়! কোহল স্মাজ করে গেছে!”
ঘর থেকে বেরিয়ে আইকা দেখেছিল, সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওর এত লজ্জা লেগেছিল! মনে হচ্ছিল একটুও পালটায়নি ও। স্কুলেও এমন দুমদাম কাণ্ড করত!
আইকা নিজের সিটে না ফিরে লু-তে গিয়েছিল। আর হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই মনে পড়েছিল স্কুলের ওই ঘটনাটায় পুশকিন কেমন কষ্ট পেয়েছিল!
পুশকিন! নামটা মনে পড়তেই কেমন একটা লেগেছিল আইকার! ওদের রিকো গ্রুপ-ও তো ওই প্রজেক্টে আছে! কিন্তু ওদের প্রপোজ়াল আলাদা। তবে এই নিয়ে পুশকিন বা নোঈর সঙ্গে কোনও কথা বলেনি আইকা। কারণ, সেটা তো এথিকাল নয়। কাজ কাজের জায়গায় আর নিজের সম্পর্ক নিজের জায়গায়।
“স্যারের ঘরে চিৎকার করলি, স্যার কিছু বলেননি?” দূর্বা তাকাল ওর দিকে।
আইকার অপ্রস্তুত লাগল। এর কী জবাব দেবে? ও যেটা করেছে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু তখন এমন মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল! সকালে মায়ের সঙ্গে ঝামেলার পরে ও এমনিতেই খুব উত্তেজিত হয়েছিল, তাই তারকের কথাটা আর নিতে পারেনি। রুপিনের ঘরে গিয়ে অমন একটা সিন ক্রিয়েট করে ফেলেছে।
আইকা জানে রুপিন কিছুই বলেননি ওকে। বরং বোঝার চেষ্টা করেছেন কেন আইকা এমন করল। কিন্তু সেটা তো আর অন্য কলিগরা বুঝবে না! বরং সেটা জানলে নানা জলঘোলা হবে। রুপিনের অথরিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সেটা আইকা হতে দিতে পারে না।
ও বলল, “না, আমায় শো কজ় করেছেন। আসলে আমারই ভুল। তাই…”
দূর্বা চোখ বড়-বড় করে শুনল কথাটা। তারপর বলল, “দূর, তোকে কিছু বলবেন না।”
“কেন?” অবাক হয়ে তাকাল আইকা।
“ন্যাকা খুকু আমার! জানে না!” দূর্বা চোখ টিপে বলল, “মালটা তোর প্রেমে পড়ছে তো!”
“মাইরি… তুই না…” আইকা হেসে পাশে দাঁড়ানো ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এর সঙ্গে প্রেম করছ কী করে? আর বিয়েও করবে! মানুষ পায়ে কুড়ুল মারে! তুমি যে কুড়ুলে পা মেরে বসেছ!”
“এই, আমার বিয়েতে ভাংচি দিচ্ছিস কেন রে?” দূর্বা আলতো করে চিমটি কাটল আইকার হাতে।
আইকা আরও কিছু বলত, কিন্তু তার আগেই দেখল বড় কাচের দরজা ঠেলে মা বেরিয়ে এল এবার।
“কাকিমা!” দূর্বা এমন করে মায়ের দিকে দৌড়ে গেল, যেন কতদিন পরে হারানো কিছু ফিরে পেয়েছে!
আইকা দেখল ব্যাপারটা। আসলে এসব বোঝে ও। কেউ যখন খুব খুশি থাকে, তখন সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি রি-অ্যাকশন দিয়ে ফেলে।
মায়ের সামনে গিয়ে দূর্বা হাত ধরে টানল ব্রতীনকে। তারপর বলল, “কাকিমা, এই যে ব্রতীন। ওর সঙ্গেই…”
শূন্যস্থান বলে তো পৃথিবীতে কিছু থাকে না। তাই এটাও থাকল না। মা ঠিক বুঝে নিয়ে হাসল। ব্রতীন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে মা “থাক, থাক,” বলেও প্রণামটা নিল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আইকার দিকে।
আইকা মায়ের তাকানোটা বোঝে। এটাও বুঝল। আর তখনই ওর মনে হল, ফিরোজকাকুর সঙ্গে কী নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করেছে মা।
মা দূর্বার সঙ্গে কথা বলল সামান্য। আইকার মনে হল মা খুব একটা কথা বলতে চাইছে না। অন্যের মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আইকা একা রয়ে গেল, সেটা কোথাও মাকে মনে মনে খারাপ লাগা দিচ্ছে।
দূর্বা কী বুঝল কে জানে। বলল, “ঠিক আছে রে, আমরা আসি। আসলে ভাবলাম, এখানেই যখন আছিস একবার ব্রতীনকে দেখিয়ে নিয়ে যাই। তাই তোকে ফোন করেছিলাম। আমি নেক্সট উইক নাগাদ তোদের ফ্ল্যাটে যাব নেমন্তন্ন করতে, কেমন!”
