“দেখুন, এত কোটি টাকা বলেই সব কিছু ভেবে কাজ করতে হয় আমাদের,” আইকা নিজের মেজাজটাকে খুব কষ্ট করে সামলে রেখেছিল।
তারক বলেছিল, “আমি আপনাকে স্পেশ্যাল পছন্দ করি বলে জানিয়ে রাখলাম এসব। আর বেশি কিন্তু লেট করবেন না। কেমন! মটকা আবার তাতছে আমার! রাখছি! আমি আর ফোনও করব না।”
ফোনটা কেটে মাথা নিচু করে বসেছিল আইকা। লোকটা কী সাংঘাতিক অসভ্য সেটাই ভাবছিল! ওকে কোন সাহসে বলে যে, ‘স্পেশ্যাল পছন্দ করে!’ আর মেয়েছেলে! এভাবে কেউ কোনওদিন ওর সঙ্গে কথা বলেনি! লোকটার স্পর্ধা দেখে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল ওর।
আইকা আর অপেক্ষা না করে উঠে সোজা রুপিনের ঘরের দিকে গিয়েছিল।
সবার আগে রুপিন অফিসে আসেন। এমনকী, ব্রেকফাস্টটাও অফিসেই করেন মানুষটা।
করিডর পেরিয়ে সোজা দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আইকা। তারপর হাতল ধরে ঘুরিয়ে দরজা ঠেলে খুলে বলেছিল, “মে আই কাম ইন!” স্যার কথাটা ইচ্ছে করেই বাদ রেখেছিল আইকা।
রুপিন মাথা নিচু করে কিছু একটা পড়ছিলেন। ওর কথায় মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন। তারপর সামান্য হেসে বলেছিলেন, “কাম কাম। প্লিজ় হ্যাভ আ সিট। আমি তোমাকেই ডাকব ভাবছিলাম। আই নিড আনাদার ফেভার!”
আইকা কিছু শোনার মতো অবস্থায় ছিল না! ও সোজা গিয়ে টেবিলে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল।
রুপিন বুঝেছিলেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। বইটা ভাঁজ করে রেখে তাকিয়েছিলেন আইকার দিকে, “কী হয়েছে?”
“আমি স্যার চাকরি ছেড়ে দেব, আই ওয়ান্ট টু রিজ়াইন!” কোনও ভণিতা না করে আইকা সরাসরি বলেছিল কথাটা।
“আরে!” রুপিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন, “হোয়াট হ্যাপেন্ড! এসব কী বলছ?”
“আমি স্যার অসম্মান নিয়ে চাকরি করতে পারব না। আমার যা প্রোফাইল, জব পেতে আমার অসুবিধে হবে না। আমি আর এখানে কাজ করতে পারব না।”
রুপিনের চেম্বারের এসিটা কুড়িতে করা থাকে। বেশ ঠান্ডাই লাগে অন্য সময়। কিন্তু আজ আইকার ঘাম দিচ্ছিল। মাথায় আসছিল না কিছু। শুধু পিন আটকে যাওয়া গ্রামোফোনের মতো ঘসঘস করে তারকের কথাগুলোই ঘুরেফিরে বাজছিল কানে। বুঝতে পারছিল না, ও চেঁচিয়ে কথা বলছে!
রুপিন চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে উঠে এসেছিলেন আইকার পাশে। তারপর আইকার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বলেছিলেন, “প্লিজ়, মাথা ঠান্ডা করো! এভাবে চিৎকার কোরো না। কী হয়েছে আমায় বলো।”
“আস্ক মি হোয়াট ডিডন্ট হ্যাপেন! আমি স্যার চাকরি করি বলে কেউ খারাপ কথা বলবে, সেটা আমায় সহ্য করতে হবে? যে-প্রজেক্টে আমি কাজ করছি সেখানে কী হচ্ছে, তার ইনফো আমার থেকে উইথহেল্ড করে রাখা হবে? এটা কেমন ওয়ার্ক কালচার! আমায় তারক চক্রবর্তী ফোনে ইনসাল্টিং কথাবার্তা বলছে কেন! আমি জানি না, কিন্তু রিসেন্টলি নাকি আপনি মালিকদের সঙ্গে গিয়ে নিজে কথা বলেছেন। আমায় প্রজেক্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেখানে, আমি জানি না এসব হচ্ছে। একটা লুম্পেনের কাছ থেকে আমায় জানতে হচ্ছে! তার টিটকিরি শুনতে হচ্ছে! আই ওয়ান্ট টু কুইট।”
রুপিন নিজে সামনের একটা চেয়ার টেনে বসে পড়েছিলেন এবার। তারপর আর-একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়েছিলেন আইকার দিকে।
“সিট।”
আইকা কথাগুলো এমন তোড়ের সঙ্গে বলেছিল যে, নিজেই হাঁপিয়ে গিয়েছিল। ও কথা না বাড়িয়ে চেয়ারটা টেনে বসে পড়েছিল।
রুপিন শান্ত গলায় বলেছিলেন, “আমি তোমার সিনিয়র। এভাবে কেউ সিনিয়রের সঙ্গে কথা বলে! একে ইনসাবরডিনেশন বলে, জানো তো?”
“সরি স্যার, কিন্তু আমায় ফিল্ডে নেমে কাজ করতে হয়। আপনি জানেন, তারক চক্রবর্তীদের মতো গুনস্দের সঙ্গে কীভাবে কাজ করি? তারা আমায় বাজে কথা বলছে। তার কাছ থেকে জানছি, আপনি মালিকদের সঙ্গে একা কথা বলে এসেছেন।”
রুপিন মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। কারণ, আই ওয়াজ় টোল্ড টু। আমাকেও ডাইরেক্টরদের জবাব দিতে হয়। আর তুমি তো বালির প্রজেক্টটা দেখছ আপাতত।”
“সোনাঝুরি আমার প্রজেক্ট। সেখান থেকে আমায় কি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? কেন আমায় জানানো হচ্ছে না? আমায় সাইড লাইন কেন করা হচ্ছে? এটা আমার কেরিয়ারকে সাবোটাজ করা নয়?”
“হোয়াট আর ইউ সেয়িং!” রুপিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন আইকার দিকে, “ডু ইউ বিলিভ আই, অফ অল পারসন, উইল ডু দ্যাট! সিরিয়াসলি!”
আইকা থমকে গিয়েছিল এবার।
রুপিন মাথা নিচু করে বসেছিলেন সামান্য সময়, তারপর বলেছিলেন, “সারা অফিস শুনল যে, ইউ আর শাউটিং অ্যাট মি!”
আইকা কিছু না বলে ভুরু কুঁচকে বসেছিল। তারকের কথাগুলো তখনও কানের মধ্যে ঘুরেফিরে বাজছিল ওর।
রুপিন বলেছিলেন, “এতদিন হয়ে গেল এই কাজে কোনও প্রগ্রেস নেই। আমাদের ফাইনান্সাররা ইন্টারেস্ট হারাচ্ছেন। চারদিকেই বিজ়নেসের অবস্থা ভাল নয়। সোনাঝুরি যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে যে-ফ্লাইওভারটা করার কথা ছিল, সেটা ঝুলে আছে। হাফ ডান হয়ে পড়ে আছে। কবে হবে ঠিক নেই। এখানে এত দামি ফ্ল্যাট যে কিনবে, সে কি ওই ভাঙা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করবে! লোকজনের ইন্টারেস্ট কমছে। তাই আমরা আবার রি-থিঙ্ক করছি। বাড়িঘর বানালেই তো হল না! তারপর ভূতের শহরের মতো ওটা পড়ে থাকবে। কেউ কিনবে না। সেটা কি ভাল হবে? বিজ়নেস ইজ় লাইক পলিটিক্স। এখানে কোনও ইন্টারেস্টই পারমানেন্ট নয়। সবটাই ক্রমাগত ইভ্যালুয়েট করতে হয়। ডায়নামিক্স পালটায় উইথ ইচ ডে। তার চেয়ে বালির দিকে আমাদের কাজটা হচ্ছে। কোন্নগরেও গঙ্গার ধারে আমরা অনেকটা জমি পেয়েছি। তাই আমরা ভাবছি।”
