“কী রে, তুই এখানে! সরি আসতে দেরি হয়ে গেল!”
দূর্বার গলা পেয়ে পেছনের দিকে ফিরল আইকা। একটা জিন্স আর ডেনিমের শার্ট পরেছে আজ দূর্বা। মাথার চুলগুলো খোলা। মুখে সারাক্ষণের মতো এখনও হাসি।
আইকা হাসল। লেট করাটা দূর্বার কাছে কোনও ব্যাপার নয়! আইকা এতে অভ্যস্ত। ও দেখল পাশে গোলগাল ফরসা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চিনতে পারল ও। ব্রতীন।
দূর্বা আজ অফিসে আসেনি। আইকা জানত ও আসবে না। সামনেই বিয়ে ওদের। নভেম্বরের আঠারো তারিখ। তাই আজ শপিং-এ বেরিয়েছে। আইকার সঙ্গে ব্রতীনের আগে দেখা হয়নি। শুধু ছবিতে দেখেছে!
দূর্বা আজ একটা কাজের ব্যাপারে অফিসে ওকে ফোন করেছিল। কিন্তু যেই জেনেছিল যে, ও মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দেখাতে যাবে, সঙ্গে-সঙ্গে বলেছিল, “আমি যাব তোর সঙ্গে দেখা করতে। আমরা আজ গড়িয়াহাটেই যাব শপিং করার জন্য। তুই ক’টায় কোথায় থাকবি বল, আমি দেখা করতে যাব!”
আইকা অবাক হয়েছিল। বলেছিল, “আরে, আমরা তো ডাক্তার দেখাতে আসব।”
“তাও,” দূর্বা জেদ করেছিল, “আমরা যাব। অফিশিয়ালি তো যাবই তোর বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে, কিন্তু তার আগে এমনিও যাব আজ। পাঁচ মিনিট। প্লিজ়!”
দূর্বাটা পাগলি আছে। ওকে আটকানো যায় না। অগত্যা আইকা রাজি হয়ে গিয়েছিল।
আইকা ব্রতীনকে দেখল। ফরসা গোলগাল ছেলেটার মুখ লাল হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দূর্বা ঘুরিয়ে মেরেছে বেচারাকে।
দূর্বা বলল, “এই হল ব্রতীন।”
“হাই,” ব্রতীন হাত বাড়াল।
আইকা আলতো করে ব্রতীনের বাড়ানো হাতটা ধরল। হাসল একটু।
ব্রতীন বলল, “এভাবে এখানে দেখা করাটা একটু অকোয়ার্ড। আমরা একদিন কোথাও আড্ডা মারব, কেমন!”
আইকা মাথা নেড়ে হাসল। কিন্তু সম্পূর্ণ মনটা এখানেও দিতে পারছে না। মা কী করছে এখনও চেম্বারে! একটা করে মিনিট কাটছে আর ওর অস্বস্তি বাড়ছে!
দূর্বা এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে বলল, “অফিসে নাকি তুই আজ ঝামেলা করেছিস! আমায় রাণুদি ফোন করে বলল। এটাই নাকি আজকের হট টপিক! কেন রে? ঝগড়া করেছিস কেন?”
আইকা মাথা নাড়ল। রানুদি ওদের পারচেজ় দেখে। কিন্তু আসলে অফিসের রিপোর্টার! কিছু হল কী, চারদিকে ফোন করে খবর দিতে শুরু করবে! আজ দূর্বা অফিসে আসেনি— ওকে ফোন করে এসব বলার কী মানে!
এতক্ষণ অফিসের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিল না আইকা। মন থেকে একরকম জোর করেই সরিয়ে রেখেছিল। আবার দূর্বা সেটা মনে করিয়ে দিল!
আজ সকালে অফিসে যেতেই তারক চক্রবর্তীর কাছ থেকে মোতি নামে লোকটি ফোন করেছিল। আইকা নিজে তখন ঠিকমতো বসেওনি চেয়ারে। লোকটি মোবাইলে ফোন করে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছিল।
আইকা বাধা দিয়েছিল। এভাবে হুট করে কথা হয় নাকি! ওর সকালে একটু কাজ ছিল। ভেবেছিল সেটা সেরে ফোন করবে! তাই ফোনটা ধরে বলেছিল, “আমি আপনাকে মিনিটদশেক পরে ফোন করছি। আমি জাস্ট অফিসে ঢুকলাম।”
“মিনিট দশেক!” মোতি লোকটি খিকখিক করে হেসেছিল, “আরে ম্যাডাম, এক মিনিটের জন্য মানুষের জীবনে কত কী ঘটে যায়! এক সেকেন্ডের জন্য কত কী ঘটে যায়! সেখানে দশ মিনিট! তারকদাকে কী পেয়েছেন? উনি আপনার জন্য দশ মিনিট ওয়েট করবেন ভাবছেন?”
আইকা অবাক হয়েছিল, “উনি কথা বলতে চান?”
এবার ফোনে তারকের গলাই পেয়েছিল আইকা।
লোকটা ফোনের মধ্যেই অসভ্যের মতো একটা বিশাল ঢেকুর তুলে বলেছিল, “কী ম্যাডাম, সব ভুলে গেলেন যে! শুনলাম আপনাদের জিএম মালিকদের সঙ্গে ডাইরেক্ট যোগাযোগ করছেন! তা করুন, কিন্তু আমায় টপকে কিছু হবে না। জানবেন মালিকরাই আমায় বলেছে এতে নাক গলাতে। কারণ, এখানে অলরেডি আপনাদের এই সব কিছু কিনে ভেঙে ফেলে বাড়িঘর তৈরি করার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে! ফলে ঘোড়া টপকে ঘাস খেতে যাবেন না! পেছনে বাঁশ হয়ে যাবে!”
আইকা থমকে গিয়েছিল সামান্য। ব্যাপারটা কী? ও তারকের প্রস্তাব রুপিনকে জানিয়ে দিয়েছে মাসদুয়েক আগে। কিন্তু এর মধ্যে আর এই নিয়ে তেমন কোনও কথা হয়নি। আইকাকেও বালির দিকে একটা প্রজেক্টের ফিজ়িবিলিটি রিপোর্ট তৈরি করার কাজ দেওয়া হয়েছে! তারকের কথায় আবার নড়েচড়ে বসেছিল আইকা। এর মধ্যে মালিকদের সঙ্গে রুপিন কথা বলেছেন! সেটা তো ও জানে না!
তারক আবার ঢেকুর তুলেছিল একটা। তারপর জল খেয়েছিল। লোকটার এটিকেট বা ভদ্রতা বোধটাই নেই! সবই কেমন একটা হাটুরে রংবাজি যেন! সারাক্ষণ অন্যকে মাটিতে পিষে, তার মাথায় পা তুলে দিয়ে কথা বলা।
আইকা বলেছিল, “আমি আসলে অন্য কাজে ছিলাম, আমি খবর নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছি!”
“অন্য কাজ!” খ্যাকখ্যাক করে হেসেছিল তারক, “মাইরি! আমি প্রথম থেকেই জানি মেয়েছেলে দিয়ে কোনও কাজ হয় না!”
“মানে?” আইকা নিজেকে আর সামলাতে পারেনি! এটা কেমন ধরনের অসভ্যতা!
“মানে, মেয়েছেলে দিয়ে দু’-চাররকম কাজের বাইরে আর কোনও কাজ হয় না। আপনি দেখুন, কতদিন ধরে এই কাজটা নিয়ে ল্যাদ চালাচ্ছেন! আমায় তো মালিকরা বলল এসব ঢ্যামনা কোম্পানি দিয়ে হবে না। অন্য পার্টি দেখতে। শালা, আজকাল সব আমাদেরই করে দিতে হয়!”
“প্লিজ় এভাবে কথা বলবেন না,” আইকা শক্ত গলায় বলেছিল “আমি খবর নিয়ে জানাব বললাম তো!”
“ম্যাডাম, আমার মুখ আমি যেমন খুশি বলব! কোটি-কোটি টাকার ব্যাপার। ছেলেখেলা নয় এটা। প্রপার্টির সব কাগজ তো আপনারা সার্চ করে দেখেইছেন যে, সব ওকে আছে। তবে! এত লেট কীসের!”
