টোস্ট শেষ করে ডিমের পোচটা টেনে নিয়ে ও বলেছিল, “তুমি সাড়ে তিনটের সময় রেডি হয়ে থেকো।”
“তোকে আসতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব!” মা মুখ গোঁজ করে বসে ছিল সামনের চেয়ারে!
আইকা বলেছিল, “আচ্ছা মা, একটা কথা বলো তো, সব কিছুতেই এত এফর্ট দিতে হয় কেন আমাকে? যাই করতে যাই, কেউ না-কেউ কিছু না-কিছু একটা ফ্যাকড়া বের করে ফেলে! সারাক্ষণ কি আমি লোকজনকে কনভিন্স করে যাব নাকি এটা করে দাও, ওটা করে দাও! আমার নিজেরও তো একটা ভাল লাগা খারাপ লাগা আছে না কি? কোনও কাজ সহজে হয় না কেন! সবাই সব কিছুতে এত ব্যাগড়া দেয় কেন!”
“আমি ব্যাগড়া দিচ্ছি?” মায়ের ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল, “তুই এভাবে কথা বলিস কেন আমার সঙ্গে? তোকে নিয়ে যেতে হবে না! আমি একা যেতে পারব না ভেবেছিস?”
আইকার মনে হচ্ছিল খাবার ছেড়ে উঠে যায়! মা সকাল-সকাল কী শুরু করেছে!
মা বলেছিল, “শোন, আমার জন্য তোকে কিছু করতে হবে না। সত্যি, এই তো ছিল আমার কপালে। যাকে বুক দিয়ে আগলে বড় করলাম এখন তার লাথি-ঝ্যাঁটা খেতে হবে!”
“মা,” আইকা কী বলবে বুঝতে পারছিল না, “কীসব বলছ! তোমাকে বলেছি না ওই সিরিয়ালগুলো দেখা বন্ধ করো! একদম ওদের মতো বিহেভ করছ তুমি!”
“বেশ করেছি, তোকে চিন্তা করতে হবে না!” মা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।
খাবার শেষ করে উঠে মুখ ধুয়ে মায়ের সামনে দাঁড়িয়েছিল আইকা। মাকে ভাল করে চেনে ও। জানে, এমন সময়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে লাভ হয় না। মা একদম বাচ্চাদের মতো!
ও মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, “ঠিক আছে, আর রাগ করতে হবে না। সাড়ে তিনটের সময়ে রেডি থেকো।”
“না, তোকে কিছু করতে হবে না আমার জন্য!”
মায়ের গলা শুনে আইকা বুঝেছিল এই কাঁদল বলে! ও আলতো করে ঝুঁকে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল। বলেছিল, “এমন কোরে না মা। আমি আসব ঠিক সময়ে। তোমার এত অভিমান কেন! আমি কি নিয়ে যাব না বলেছি?”
মা আর কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। শব্দ শুনে বুঝেছিল মা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
সময় দিয়েছিল আইকা। ও জানে মাকে এমন সময় আটকালে বিপদ। তাতে হিতে বিপরীত হবে! আইকা শুধু মাকে ধরে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। কিছুক্ষণ পরে মা চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, “তুই অফিসে যা। দেরি হয়ে যাবে। পরে আবার বলবি আমার জন্য দেরি হয়েছে!”
আইকা অসহায়ভাবে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। বুঝতে পারছিল কিছু-কিছু খেলায় ওর হার অনিবার্য!
অফিস যাওয়ার ড্রেস করে, ব্যাগটা নিয়ে বেরোনোর আগে তাও একবার শেষ চেষ্টা করেছিল ও। মা বসার ঘরে বসে খবরের কাগজটা উলটোচ্ছিল! ও বলেছিল, “মা, এখন রাগ করছ করো, আমি কিন্তু আসব ঠিক সাড়ে তিনটের সময়! রেডি হয়ে থাকবে বলে দিলাম।”
মা তাকিয়েছিল খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে, তারপর বলেছিল, “আমি বুঝতে পারছি, তুই এমন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছিস কেন!”
“মানে?” আইকা বুঝতে পারছিল না মা আবার নতুন কী থিয়োরি বের করছে। ও দরজার কাছে গিয়ে থমকে গিয়েছিল।
মা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে বলেছিল, “তোর একটা বিয়ে দিতে হবে এবার। তোর একটা সঙ্গী দরকার। বুঝতে পারছি, এই জন্য তুই এমন খিটখিটে হয়ে গিয়েছিস!”
বিয়ে! সঙ্গী! কী বলবে বুঝতে পারছিল না আইকা! ও খিটখিটে হয়ে গেছে। আর সত্যি যদি হয়েও যায়, তার মানে কি ওকে বিয়ে দিতে হবে? এটা কোনও সমাধান নাকি? কেউ খিটখিট করলে তাকে বিয়ে দিতে হবে? সেই যুক্তিতে তো মাকেও বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত!
মা বলেছিল, “বিয়ে হলে তোর ঢ্যাঁটামো ঠিক হয়ে যাবে! তখন দেখব কোথায় থাকে তোর এত গুমর!”
আইকা চুপ করে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। ভাবছিল, মা ঠিক কেন ওকে বিয়ে দিতে চাইছে! ওর একজন সঙ্গী হবে বলে, নাকি ওকে শাস্তি দেবে বলে! ওর তথাকথিত গুমর ভাঙবে বলে!
মা বলেছিল, “আমি দেখছি কী করা যায়।”
আইকা আর কথা বাড়ায়নি! দরজাটা টেনে বেরিয়ে এসেছিল। কিছু বললে বিপদ বাড়ত। মা যে মুডে ছিল তাতে বলা যায় না তখনই হয়তো পাত্র দেখতে বেরিয়ে যেত!
অফিসের দিকে যেতে-যেতে আইকার হাসি পেয়েছিল মায়ের কথা ভেবে! মধ্যবিত্ত বাঙালিদের একটা মজা আছে। কিছু হলেই দুটো অপশন দিয়ে দেয়। হয় বলে, কোথাও থেকে ঘুরে আয়! নয়তো বলে, একটা বিয়ে করে নে! আইকার মনে হয় এখন সারা বিশ্বের যা অবস্থা, তাতে এদের হাতে ক্ষমতা দিলে এরা সারা পৃথিবীকে হয় ঘুরতে পাঠিয়ে দিত, নয়তো বিয়ে দিয়ে দিত!
ঘড়ি দেখল আইকা। পাঁচটা বাজতে যায় প্রায়। মা কী করছে ভেতরে কে জানে। যতক্ষণ চোখ দেখানো হচ্ছিল আইকা ভেতরেই ছিল। কী ড্রপ দিতে হবে, কী টেস্ট করাতে হবে সব ও জেনে নিয়েছে। কিন্তু তারপরেই মা বলেছিল, “বুড়ি, তুই বাইরে যা তো, ফিরোজদার সঙ্গে আমার কথা আছে!”
বাইরে! অবাক হয়ে গিয়েছিল আইকা। বাইরে যাবে কেন ও! মা আবার কী বলবে ফিরোজকাকুকে! ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে।
মা চোখ বড় করে ইশারা করেছিল। যার মানে, কথা শোন, বাইরে যা!
সেই বাইরে এসেও প্রায় চল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। চেম্বারে আরও জনাপাঁচেক পেশেন্ট বসে রয়েছে। তারাও উসখুস করছে। আইকার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে! ওর কী যে বাজে লাগছে! তাই তো চেম্বার ছেড়ে বাইরে এই করিডরটায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই বিল্ডিংটার একদিকের দেওয়াল পুরো কাচের। তাই রাস্তা দেখা যায়। উঁচু জায়গা থেকে রাস্তা দেখতে বেশ মজা লাগে আইকার! অফিসেও নিজের ডেস্ক থেকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। ছোটবেলায় ওরা ঝুলন সাজাত। উঁচু থেকে কলকাতার দিকে তাকিয়ে ওর মনে হয় তেমনই কোন এক ঝুলনের শহরে এসে পড়েছে! পার্থক্য একটাই যে, এরা সব সচল!
