কাজু নিজেও ভাঙতে চায় আজ। এই কাজুটাকে ভেঙে বের করে আনতে চায় অন্য একটা কাজুকে। যে-কাজু ভালবাসে না। যে-কাজু কষ্ট পায় না। যে-কাজু শুধু শরীর বোঝে। যে-কাজু জানে, বিষ বুকে নিয়েও কীভাবে বেঁচে থাকা যায়।
ও নিজেকে আর আটকাল না। নয়নাকে আঁকড়ে ধরে কামড়ে ধরল ওর ঠোঁট! তারপর কোলে উঠিয়ে শুইয়ে দিল মেঝেতে। আর বর্শার মতো, বল্লমের মতো নিজে নেমে আসতে লাগল নয়নার শরীরে! আসতেই লাগল ক্রমাগত!
আর ওই ছাদ থেকে নীচে দূরের বাগানে জ্বলে-নিভে-জ্বলে, আলো আর অন্ধকারকে, ঠিক আর ভুলকে, প্রেম আর অপ্রেমকে, আলো আর পতঙ্গকে একাকার করে দিতে লাগল আলোকবিন্দুর মতো জোনাকিরা!
.
২৬. আইকা
যেন পিঁপড়ে! যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা খেলনা! যেন ছিঁড়ে গড়িয়ে যাওয়া পুঁতির মালা! ওপর থেকে রাস্তার মানুষজনকে অদ্ভুত দেখতে লাগছে! স্কুল ছুটি হয়েছে। দুটো বড় বাস ততটাও বড় নয়, তাও গলিতে ব্যাক করাতে গিয়ে কেমন একটা ছত্রভঙ্গ অবস্থার সৃষ্টি করেছে চারিদিকে! লোকজনের মধ্যে কাজ শেষের মন্থরতা। পুজোর ছুটির পরের আলস্য। অনিচ্ছে। সামনের দিকে তাকাল এবার ও। কেমন একটা রক্তহীন আকাশ এই সব কিছুর মাথায় টাঙানো আছে যেন। যেন কাচের, নির্লিপ্ত চোখ নিয়ে এই শহর তাকিয়ে আছে অগণন মানুষের দিকে। আচ্ছা, এই শহরটা কি ক্রমে-ক্রমে শেষ হয়ে যাচ্ছে! মারা যাচ্ছে!
ছ’তলার ওপর থেকে শহরটার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা মায়া হল আইকার। আজ সকাল থেকেই মেঘ করে ছিল। আর এখন এই বিকেলের দিকে সেটা যেন জাঁকিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ঘন প্যাস্টেল ঘষে আকাশের রংটাকে আরও গাঢ় করে দিচ্ছে!
আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে আইকা। মাকে চোখের ডাক্তার দেখানোর ছিল। বাবার একজন পুরনো বন্ধু আছে। ফিরোজকাকু। আই স্পেশ্যালিস্ট। বরাবর মা তাকেই দেখায়। ওদের বিপদের সময় যে দু’-একজন ওদের সামান্য হলেও সাহায্য করেছে তাদের মধ্যে ফিরোজকাকু অন্যতম।
ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সে বসে ফিরোজকাকু। ছ’তলার ওপর চেম্বার। ভিড় হয় বেশ। সবাইকে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে হয়। কিন্তু আইকাদের সেসব করতে হয় না।
গত কয়েকদিন ধরেই মায়ের চোখে জল পড়ছিল। মাথাব্যথা করছিল। আইকা বারবার বলছিল, যেন ডাক্তার দেখিয়ে নেয়। মা যথারীতি পাত্তা দেয়নি। কিন্তু কাল রাতে ব্যথাটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তাই আজ আসতেই হয়েছে।
সকালে মা নিজেই বলেছিল, “ফিরোজদাকে একবার ফোন কর বুড়ি, আজ একবার যাব।”
সপ্তাহের মাঝখানে এমন হুট করে বললেই কি অফিস থেকে ছুটি করতে পারবে? মনে মনে খানিকটা বিরক্ত হয়েছিল আইকা। সেই কবে থেকে বলে যাচ্ছে মাকে, ডাক্তার দেখাও। কিন্তু মা শুনলে তো! আর এখন যখন শিরে সংক্রান্তি, ডাক্তার দেখাতে হবে এখনই!
আইকা বিরক্তি না-লুকিয়ে বলেছিল, “আমি তো আগেই বলেছিলাম, দেখিয়ে নাও। শুনলে না তো! আজ বুধবার। প্লাস অক্টোবর মাসের শেষ হতে চলল। এই সময় কী করে অফিস কামাই করব! জানো না, মাসের শেষে অফিস থেকে টাইম ম্যানেজ করতে আমার মুশকিল হয়!”
মা টোস্টারে পাঁউরুটি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তোর আজকাল সবেতেই এমন বিরক্তি কেন রে? এত রাগ কীসের তোর? সারাক্ষণ সবাইকে মুখ নেড়ে যাচ্ছিস! আর, শরীর খারাপ কি মাসের শুরু, সপ্তাহের ছুটির দিন দেখে হবে?”
আইকা স্নান করে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল সে সময়। মায়ের কথা শুনে চিরুনি হাতে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল খাওয়ার ঘরের দরজায়। বলেছিল, “কতদিন ধরে তোমায় আমি বলছি ডাক্তার দেখাও! শুনছ আমার কথা? তুমি নিজের দোষটা দ্যাখো না কখনও!”
“এতদিন তো আমার খুব-একটা অসুবিধে হয়নি। শুধু-শুধু টাকা খরচ করে কী হবে? এখন হল তাই বললাম।”
মায়ের কিছু-কিছু যুক্তি কিছুতেই বুঝতে পারে না আইকা। মায়ের মনের কোনও একটা অংশে এখনও সেই যাদবপুর কলোনির বাড়িটা আটকে আছে! সারাক্ষণ এত টাকার চিন্তা করে কী করে কে জানে! মাকে কতবার বলেছে আইকা যে, এখন আর এসব ভাবার দরকার নেই। কিন্তু কে কার কথা শোনে! সারাক্ষণ পাই-পয়সার হিসেব করে যাচ্ছে!
আইকা বলেছিল, “আবার শুরু করলে তো! কতদিন বলেছি যে, এমন করে কথা বলবে না! আমাদের অভাব আছে কিছু? নিজে তো ভগবানে বিশ্বাস করো, জানো না, সারাক্ষণ নেই-নেই করে গলা শুকোলে ভগবান এক সময়ে সব কিছু কেড়ে নেয়!”
“গলা কোথায় শুকোচ্ছি?” মা বিরক্ত হয়ে পাঁউরুটিতে জ্যাম লাগাতে-লাগাতে বলেছিল, “বাস্তব কথা বলছি। তুই ভুলে গিয়েছিস, আমি যাইনি। পুরনো দিন ভুলে যেতে নেই। মাটিতে পা রেখে চলতে হয় আমাদের, বুঝেছিস!”
“মা!” আইকার মনে হচ্ছিল দেওয়ালে মাথা ঠোকে নিজের। মাকে কিছু বলা মানে নিজের মেজাজ খারাপ করা। ও ড্রেসিং ইউনিটের সামনে চিরুনিটা রেখে, খাওয়ার ঘরের বেসিনে হাত ধুয়েছিল। তারপর টেবিলে বসে জ্যাম-টোস্ট খেতে-খেতে ফোনটা নিয়ে কল করেছিল ফিরোজকাকুকে। চারটের সময় আসতে বলেছিল ফিরোজকাকু। আইকা চেষ্টা করেছিল ওটা ছ’টা করার। কিন্তু ফিরোজকাকু বলেছিল, ছ’টায় তো সল্ট লেকে চেম্বার আছে।
ফোনটা রেখে চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল আইকা। মনে মনে বিরক্ত লাগছিল এত! কিন্তু বুঝতে পারছিল মাকে নিয়ে যেতেই হবে। গতকাল রাতে মা কষ্ট পেয়েছে খুব।
