যাদবকাকা এবার যেন বুঝল। নিজের মনে কিছু ভেবে নিয়ে বলল, “কিন্তু বিমলদা যদি আপত্তি করে?”
“বিমলদা তোমাদের টাকা দেবে? সংসার চালাবে? তোমাদের যা সমস্যা সেটা মেটাতে কি লোকটা কিছু করছে! আমার তো মনে হয় সুদর্শন ওকেও খাইয়ে রেখেছে। তুমি কাল বা পরশু মিটিং ডাকো। আমি কথা বলব। তুমিও তো ওদের নেতা, না কি? বিমলদা দু’পাতা বই পড়েছে। ইংরেজি জানে। তার মানে এই নয় যে, শ্রমিক স্বার্থ তোমার চেয়ে বেশি দেখবে। তুমি চাকরি করো মিলে। তোমার ফ্যামিলি আছে। ওর সেই সব আছে কিছু? আর আমায় কিছু বললে? আমি ভয় পাই না যাদবকাকা। আমার হারানোর কিছু নেই। তুমি একটা মিটিং ডাকো।”
“কী যে বলছিস!” যাদবকাকা পিঠে হাত দিল ওর, “ঘরমে সবহি তো হ্যায়।”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। চোখ জ্বালা করছে ওর। বুকের ভেতর জাহাজ উলটে গেছে আজ। চারিদিক থেকে জলের চাপ বাড়ছে। আধো আবছায়া গলিজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিদেশি গাড়িটা ওকে যেতে দিচ্ছে না! পৃথিবীতে কেউ কোনওদিন বুঝতে পারবে না, সব থেকেও কখন মানুষের কিছু থাকে না!
যাদবকাকা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। বলল, “তু ঠান্ডা রাখ বাবু। আমি দেখছি। পরশু গেটে মিটিং ডাকছি একটা। এখন তুই ঘর যা। মৌসম খুব খারাপ। ঘর যা।”
যাদবকাকা চলে যাওয়ার সামান্য পরে কাজুও এগোল। মনটা এমন খারাপ করছে যে, কিচ্ছু ভাল লাগছে না। ভেবেছিল পার্টি অফিসে যাবে, কিন্তু ওই গাড়িটা পেখমদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখার পর থেকে সবকিছু অর্থহীন লাগছে ওর!
সুজিত কি এসেছে পেখমের সঙ্গে দেখা করতে? ওরা কি কথা বলছে এখন? কী কথা বলছে? দৃশ্যটা মনে করতেই বুকের মধ্যে কে যেন মাটি খুঁড়ে পারদ ঢেলে দিল! আর মাইলের পর মাইল মরে যেতে লাগল গাছ। নষ্ট হয়ে যেতে লাগল মাটি। বিষ এসে মিশে যেতে লাগল জলে।
কাজু শুনেছে, আজকাল নাকি পেখম কলেজেও যাচ্ছে না। বিজন বলছিল সেদিন। ও পেখমদের বাড়িতে গিয়েছিল। পেখমের মা আর কাকিমা বিজনকে দেখাই করতে দেয়নি! বলেছে, ক’দিন দেখা করা যাবে না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজেদের ঘরের দরজায় দাঁড়াল কাজু। কিন্তু ভেতরে ঢুকল না। বাড়িতে ও পারতপক্ষে ঢোকে না আজকাল। রাতে খেতে আর শুতেই আসে। অসুস্থ বাবা ওকে দেখলেই খিটখিট করে! শুধু আন্টি বাডু যা ওর হয়ে কথা বলে। তা ছাড়া মা, ভাই, বোন। ভাল করে বসারই জায়গা হয় না!
ও দেখল, ছোটভাইটা পড়ছে মাটিতে বসে। বোন চৌকিতে বসে রয়েছে। ভেতরের ঘর থেকে আন্টি বাডু ছাড়াও কার যেন গলার আওয়াজ আসছে। কাজুর মনে হল এখন ওকে একা থাকতে হবে। ঘরে ঢুকতে পারবে না কিছুতেই।
বাড়িতে কারও সঙ্গেই যেন কথা বলার নেই! ও যেন অতিথি! সংসারে টিউশনের টাকা দেওয়াটা ওর কাজ। ব্যস, ওইটুকুই যেন সম্পর্ক! আগে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তাও কথা হত। পড়াশোনায় খুব ভাল ছেলেটা। গাছ বলতে পাগল। সারাক্ষণ ওই নিয়েই কথা বলে যেত। কিন্তু আজকাল তাও হয় না। নিজের বুকের ভেতর বিষের একটা নদী তৈরি হয়েছে কাজুর। সেই ঘূর্ণিতেই ডুবে মরেছে ও! আর মৃত মানুষের সঙ্গে কার আর কথা হয়! যোগাযোগ হয়!
ও পেছন ফিরে সিঁড়ির দিকে এগোল। ছাদে যাবে। ওই একটাই জায়গা আছে, যেখানে ও ছাড়া আর বিশেষ কেউ যায় না। ওই নির্জনতাটা খুব ভাল লাগে কাজুর! ছাদ থেকে পেছনের বড় বাগানটা দেখা যায়। আর বাগান ছাড়িয়ে দেখা যায় সামান্য দূরের গঙ্গা!
ছাদে পা দিতেই হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল ওকে। একটা ঘর আছে ছাদে। ভাঙা জিনিসে ভরতি! ও মাঝে মাঝে যায় সেখানে। কিন্তু আজ ভাল লাগছে না।
ও পায়ে-পায়ে ছাদের পেছনের দিকে গেল। এই জায়গা থেকেই বাগান দেখা যায়।
ছাদের পাঁচিলটা বেশ চওড়া। নিচু। ইচ্ছে করলে বসাও যায়। কিছুটা দূরে-দূরে পাঁচিলের ওপর সিমেন্টের ঘটের মতো ডিজ়াইন করা। বাড়িটা অনেক পুরনো, তাই বেশ কিছু ঘট ভেঙে গেছে। রাতের অন্ধকারে ওই ঘটগুলোকে কেমন যেন ভাঙাচোরা মুখের মানুষ মনে হচ্ছে!
কাজু পাঁচিলে বসে চারিদিকে তাকাল। দূরে ছড়িয়ে থাকা আরও তিনটে ব্লক দেখা যাচ্ছে। সব কেমন নিঝুম। শুধু নীচের বড় বাগানটায় সবুজ-হলুদ আলো জ্বেলে পিটপিট করে জেগে আছে জোনাকিরা।
কাজুর মনে হল, আজ থেকে অনেকদিন পরে একদিন এইসব বাগান, বাড়ি কিছুই থাকবে না। এইসব বিক্রি হয়ে যাবে। এখানে হয়তো নতুন বাড়ি উঠবে। কেউ আর হয়তো মনেও রাখবে না কাজুকে। পেখম চলে যাবে কোথায়। ও-ও কি আর মনে রাখবে এসব? মনে রাখবে, একটা ছেলে ছিল, যে সবটা দিয়ে ভালবেসেছিল ওকে। মনে রাখবে অন্ধকারে জোনাকিদের এই বাড়িটাকে। মনে রাখবে সেইসব জ্যোৎস্না। সেইসব বিকেলের মাঠ। নদীর ধার। সেইসব মুহূর্ত, যা ছিল শুধু ওদের। যা শুধু ওরা দু’জন জানত।
সব হারিয়ে যায়। ভালবাসা হারিয়ে যায়। বিশ্বাস হারিয়ে যায়। কথা হারিয়ে যায়। সময়ের দুর্লঙ্ঘ্য খাদে তলিয়ে যায় স্মৃতি। সোনাঝুরির এই হাওয়ায়, এই আলোয়, এই অন্ধকারে অমোঘ নিয়মে একদিন হারিয়ে যাবে কাজুও। কেউ ওকে মনে রাখবে না। পেখম ওকে মনে রাখবে না আর।
জীবনের অনিত্যতার চেয়েও এই শেষের কথাটুকু, ‘পেখম ওকে আর মনে রাখবে না’, এটা মনে হতেই কী যেন একটা হয়ে গেল কাজুর! আর বহুক্ষণ উলটে থাকা জাহাজটার কাঠামো ফাটিয়ে হু হু করে ঢুকে এল জল! আর সেই জলের তোড়ে এই সন্ধের অন্ধকারে, হাওয়ায় কোথায় যেন ভেসে, তলিয়ে গেল কাজু! মনে হল ওর ভেতর থেকে কে যেন সত্যিকারের কাজুকে ছিঁড়ে, খুলে নিয়ে গেছে! আর যেন কোনও জোর নেই ওর। শরীরে কোনও শক্তি অবশিষ্ট নেই। কাজু বিহ্বল হয়ে একবার নিঃশেষ অন্ধকারের দিকে তাকাল, তারপর হাঁটু ভাঁজ করে সিমেন্টের মেঝেতে মুখে গুঁজে শব্দ করে কেঁদে উঠল।
