“আর্জি মানে?” কাজু ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
সুদর্শন সামনে রাখা গেলাস থেকে হালকা সরষের তেলের রঙের মদে চুমুক দিয়ে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। সামান্য হেসে বলেছিল, “আরে মিস্টার ট্রেড ইউনিয়ন! এমন রাগ করলে চলে! নাও, কাজু খাও,” সামনে রাখা তিন-চার রকমের খাবার থেকে কাজুর প্লেটটা ওর দিকে ঠেলে এগিয়ে দিয়েছিল সুদর্শন।
“আমি আপনার সঙ্গে দরকারি কথা বলতে এসেছি। আপনার ফ্যাক্টরি নিয়ে।”
“সন্ধেবেলা বসে একটু রিল্যাক্স করব, সেটাও করতে দেবে না! সারাক্ষণ কি কাজের কথা ভাল লাগে!” সুদর্শন মাথা নেড়েছিল। বোঝাতে চাইছিল যে, বিরক্ত হচ্ছে।
“এটা ভাললাগা বা মন্দলাগা নয়। এটা অনেক মানুষের জীবন। আপনি নাকি বলেছেন মালের কোয়ালিটি খারাপ হলে, পার্টি যদি পেনাল্টি করে, তা হলে সেই টাকার একটা ভাগ আপনি শ্রমিকদের কাছ থেকে কেটে নেবেন!”
“আমার ফ্যাক্টরির ব্যাপার তোমায় কেন বলব?” সুদর্শন এবার গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।
“কারণ, আমায় না বললে আপনার ফ্যাক্টরিতে গন্ডগোল হবে! বুঝলেন?” লোকটার ঔদ্ধত্য দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি কাজু, “শ্রমিকের ঘাম আর রক্ত পিষে আপনার পকেট ভরে, তারা যদি উঠে দাঁড়ায় কী হবে জানেন?”
“আরে! তাই! ওভাবে আমার পকেট ভরে!” সুদর্শন হেসেছিল শব্দ করে, “এমন হট হেড নিয়ে তুমি প্রেম করো কী করে? তবে শুনেছি তুমিই আমার বউমার পেছনে ঘোরো। ও তোমায় পাত্তা দেয় না। সত্যি?”
কাজু চোয়াল শক্ত করে সামলেছিল নিজেকে। তারপর বলেছিল, “আমি যেটা বলছি সেটা বলুন। আপনি কি জানেন যে, আপনার ছেলে সুজিত ইনফিরিয়র কোয়ালিটির র-মেটিরিয়াল দিয়ে জিনিস বানাচ্ছে! সেটা ফেল করার চান্স নাইনটি পারসেন্ট! আপনাদের বাজে জিনিসের দায় শ্রমিকরা নেবে কেন?”
সুদর্শন হেসেছিল। কিন্তু হাসির পেছনে যে বিষ লুকিয়ে আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি কাজুর।
সুদর্শন বলেছিল, “আমার ছেলে! আমার ফ্যাক্টরি! তুমিই বলছ যে সবটা আমার, আর তারপর এটা বলতে চাইছ যে, আমি কিছু জানি না! তুমি কে হে ছোকরা? টিপে ধরলে মরে যাবে! বয়স কত? আমায় জ্ঞান দিতে এসেছ? তোমাদের বিমল জানে যে, তুমি এসেছ আমার কাছে? গোপেন জানে? শোনো, আমার ফ্যাক্টরি এটা। আমার বাপ-ঠাকুরদার রক্ত-জল-করা পরিশ্রম আছে এতে! সেটা নিয়ে তোমার মতো নো ওয়ান-এর জ্ঞান আমি শুনব না। দাড়ি রাখলেই বুঝি ইন্টেলেকচুয়াল হয়ে ঢপের জ্ঞান দেওয়া যায়! শ্রমিক স্বার্থ! কোনওদিন এক পয়সা রোজগার করে দেখেছ? বিদেশ থেকে কাজ আনতে কী করতে হয় জানো? এতগুলো লোকের মাস মাইনে কোথা থেকে আসে জানো? সবাই কাজে ঢোকার সময় তাদের কন্ট্র্যাক্ট লেটার দেখে নিয়েছিল কি না জানো? আমি কি কাউকে পায়ে দড়ি দিয়ে রেখেছি? ইচ্ছে না হলে চাকরি ছেড়ে দিক! শালা, খালি বক্তৃতা! বাতেলাবাজি! আর চটি পরে এই ক্লাবে ঢুকেছ? ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার আগে কেটে পড়ো। আর-একটা কথা, দীপমালার সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে হবে। সুজিত যা চায় আমি ওকে সেটা দিই। দীপমালাকে ও চেয়েছে। আমার ফ্যাক্টরি বা দীপমালা দুটোর পেছনেই ঘুরঘুর করা বন্ধ করো। না হলে তোমাদের গোটা গুষ্টিকে পাছায় লাথি মেরে বের করে দেব জোনাক-বাড়ি থেকে। আর বিশেষ করে তোমায় খুঁজে পাওয়া যাবে না! মনে থাকবে?”
গোটা কথাটা চোয়াল শক্ত করে শুনেছিল কাজু। তারপর বলেছিল, “যা করতে পারেন করে নিন! কিন্তু জানবেন যদি স্ট্রাইক হয়, তা হলে মালও কিন্তু ডেলিভারি হবে না। পড়ে থাকবে ফ্যাক্টরিতে। ডেলিভারি না হলে পয়সাও পাবেন না। মাসের পর মাস টাকা ঝুলে থাকবে। লেট ক্লজ়ে পড়ে বড় পেনাল্টি খাবেন। আর পড়ে থাকতে থাকতে ব্যাচ খারাপ হয়ে যাবে। তা হলে পার্টি তো আর সেই খারাপ মাল নেবে না। তখন পুরো লস! আর মনে রাখবেন, আমরা এও জানি যে, পার্টির এই মাল আর্জেন্টলি দরকার বলে অন্য কোনও অজুহাত বা ক্যালামিটি ক্লজ় অর্ডারে নেই বা তারা মানবেও না। ফলে সাবধান। ভাববেন না আমায় ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে!”
“তুই যাবি না ঘাড় ধরে তোকে বের করব শুয়োরের বাচ্চা!” আচমকা টেবিল থাবড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল সুদর্শন।
কাজু দেখেছিল আশপাশে যারা যা কাজ করছিল, সব থামিয়ে চুপ করে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
কাজুও উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার। তারপর বলেছিল, “জাত চিনিয়ে দিলেন তো নিজের! যা বললাম মাথায় থাকে যেন। শ্রমিকদের কোনও ক্ষতি হবে না সেটা ইন রাইটিং দেবেন আপনি সাত দিনের মধ্যে। না হলে শ্রমিকদের রক্ত জল করে বের করা পয়সায় ফুটানি করা বের করে দেব।”
“কাজু, কী রে, কী কথা হল? বললি না?” যাদবকাকার মুখটা এই আলো-আঁধারিতে কেমন অদ্ভুত লাগছে! আলোটা নড়ছে হাওয়ায়। মুখের ওপরে পড়া ছায়াটাও কেমন নড়ছে!
কাজু বলল, “আমি আলটিমেটাম দিয়ে এসেছি। সাত দিন। তিন দিন কেটে গেছে। আরও চার দিন বাকি। তারপর আমরা স্ট্রাইকে যাব।”
“স্ট্রাইক!” যাদবকাকা কেমন যেন ঘাবড়ে গেল, “এ বাবু, ইয়ে তো গড়বড় হয়ে যাবে!”
“কিছু গড়বড় হবে না। ডেলিভারি ডেটের দু’মাস পরে আর মাল নেবে না পার্টি। আমি ইউনিয়ন রুমে অর্ডারের ডুপ্লিকেট কপি দেখেছি। কারণ, পার্টিকেও তো ব্যাবসা চালাতে হবে! কতদিন আর ওরা বসে থাকবে মাল ডেলিভারি না পেয়ে! শোনো, তোমরা ভয় পাবে না। দু’মাস ধরে রাখবে স্ট্রাইক। মালিক কী, মালিকের ঘাড় মাথা নোয়াবে! এত টাকার অর্ডার! ও শুধু লিখে দেবে যে, মালের ডিফেক্টের জন্য যদি পেনাল্টি কাটে, তা হলে তোমাদের মাইনে বা ওভারটাইমে হাত পড়বে না। ব্যস! চাকরির প্রাথমিক শর্ত তো এটাই ছিল। সেটাই ওরা মানছে না। তাই দাওয়াই হিসেবে স্ট্রাইক। দু’মাস শুধু ধরে রেখো। এক মাসের মধ্যে দেখবে লেজ গুটিয়ে সুদর্শন মালিক আসছে সমঝোতা করতে। মাল ক্যানসেল হয়ে গেলে বাজার থেকে যে-টাকা উঠিয়েছে, সেটা দেবে কী করে? তোমরা একদম ভয় পাবে না।”
