মাহির অবাক হল, “তুই যাবি না?”
টিটি আবার সেই শ্যাওলা-ধরা দাঁত দেখিয়ে বলল, “যাব, আগে আমার কাজটা শেষ করি।”
কথাটা শেষ করে নকুর দিকে হাত বাড়াল টিটি। বলল, “দে। রিফার করে রেখেছিস তো?”
নকু হাত বাড়িয়ে একটা প্যাকেট দিল টিটিকে। মাহির মাথা নাড়ল শুধু। গাঁজা ভরা সিগারেট। আর সিগারেটের মাথাটা পাকানো। টিটি নেশা করেই একদিন শেষ হবে!
নকু বাইকটা স্টার্ট করে তাকাল মাহিরের দিকে। বলল, “বোসো দাদা।”
মাহির বলল, “হেলমেট?”
“আরে দূর! ওসবের দরকার নেই। বোসো,” নকু বাইকের হাতল ঘুরিয়ে ভ্রুম ভ্রুম শব্দ তুলে রেস দিল।
মাহির ব্যাগটা সামলে বসল।
টিটি বলল, “মুখটা অমন ক্যালানের মতো করে রাখিস না। হাস। শালা, তোকে কেউ ফাঁসি দিতে নিয়ে যাচ্ছে না! কত ছেলে রিতুদার সঙ্গে চিপকাবার জন্য লাইন দিয়ে পড়ে আছে। সেখানে রিতুদা নিজে তোকে ডাকছে, আর তুই পোঁদ দোলাচ্ছিস! তোর হেবি তেল! যা। ভাল করে কথা বল। কাজ শুরু করে দে। বুঝলি?”
পার্টি অফিসের সামনে বাইকটা থামিয়ে পেছন ফিরে নকু বলল, “মাহিরদা, এই যে। তুমি সোজা ভেতরে চলে যাও। কোনও চাপ নেই!”
মাহির বাইক থেকে নেমে হাসল। তারপর এগিয়ে গেল সামনের দিকে। প্রতাপাদিত্য রোডের উপর একটা নতুন তৈরি মাল্টিস্টোরেডের নীচের তলায় পার্টি-অফিস।
সামনে চওড়া ফুটপাথ। সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বেশ কিছু লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে। তাদের মুখে একটা ‘মার দিয়া’ টাইপের ভাব। এদের মুখ চেনে মাহির। সবক’টাই রিতুদার ল্যাংবোট। সকাল-সন্ধে এখানে বসে থাকে। চা খায়। হ্যা হ্যা করে। রিতুদার সঙ্গে এদিক-ওদিক যায়। আর পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে শেষ মন্তব্যটা করে! দেখলেই জুতো খুলে পেটাতে ইচ্ছে করে মাহিরের। তেল দেওয়াটাও এখন একটা কাজ হিসেবে নিয়ে নিয়েছে বাঙালি! বুদ্ধিজীবী থেকে দুর্বুদ্ধিজীবী সবাই ব্যাপক হারে এটা দিয়ে চলেছে! স্যার বলতেন, “এরা ঘুণপোকা! দেশটাকে এরাই ভেতর থেকে শেষ করছে।” স্যারের কথাগুলো আজও মনে আছে মাহিরের।
মাহির এগিয়ে গেল অফিসের দরজার সামনে। দুটো ছেলে বসে মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছিল। ওর দিকে তাকাল। তারপর চিনতে পেরে হাসল। একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ও এসে গেছ! যাও ভেতরে। দাদা বলেছেন তুমি আসবে।”
অফিসের দরজাটা আসলে একটা রোলিং শাটার। ফলে সামনেটা গোটাটাই খোলা! কিন্তু ভিতরে একটা পার্টিশান দিয়ে তৈরি করা ঘর রয়েছে। রিতুদার চেম্বার!
অফিসের ভিতরে পা দিয়েই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মাহির! আচমকা সামনের ওই চেম্বারটার দরজা খুলে ঝড়ের মতো বেরিয়ে এল একটা মেয়ে। একটা স্লিভলেস কুর্তি, সঙ্গে জিন্স পরা। গলায় একটা স্কার্ফ। মেয়েটার ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে মেয়েটা।
উত্তেজনার বশে মেয়েটা দেখতে পায়নি, চেম্বারের বাইরে একটা পাপোশ রয়েছে। তাতে নিমেষে পা জড়িয়ে গেল মেয়েটার। সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা টেবিল ধরে টাল সামলাল। তবে হাতের ফাইলগুলো ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। মেয়েটা থমকে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
মাহির এগিয়ে গেল। তারপর ধীরে-ধীরে ফাইলগুলো গুছিয়ে তুলে দিল মেয়েটার হাতে। মেয়েটা এখনও ফুঁসছে! কিন্তু ফাইলগুলো পেয়ে সামান্য থমকাল। তারপর চোয়াল শক্ত করে দেখল মাহিরকে।
“থ্যাঙ্কস,” মেয়েটা ছোট্ট করে বলল।
“ইটস অলরাইট!” মাহির মাথা নাড়ল।
মেয়েটা থমকে গেল যেন। চোখে কি সামান্য বিস্ময়! ওকে দেখে কি মনে হয়নি যে, এটুকু ইংরেজি ও জানবে! মনের ভিতরের আত্মসম্মানের ঘরটা ক্রমশ ছোট হয়ে গিয়েছে মাহিরের। জীবনের চাপে পড়েই যেন কীরকম হাওয়া-কমা বেলুনের মতো দিনদিন চুপসে যাচ্ছে সেটা। কিন্তু সেটাতেও একটা ছোট্ট লাল পিঁপড়ে কামড়াল। মেয়েটার চোখ থেকে ছিটকে আসা বিস্ময়ের ভিতরের একটা হুল এসে বিঁধে রইল ওই ঘরে। মাহির মনে মনে ভাবল, মেয়েটা তো জানে না, ইলেভেন থেকে টুয়েল্ভে ওঠার পরীক্ষায় একশোয় ও বিরাশি পেয়েছিল ইংরেজিতে। স্যার বলেছিলেন, “মন দিয়ে পড়! তোর হবে!”
কিছু হয়নি মাহিরের। কিচ্ছু হয়নি! রেশমি আচমকা চলে গিয়ে ওকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। আর সেই নিকষ কালোয় হারিয়ে গিয়েছিল ওর সবটুকু! কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতর নিভে আসা, ছোট হয়ে আসা একটা ঘর এখনও যে রয়ে গিয়েছে, সেটা এই হুলটা না বিঁধলে জানতেই পারত না মাহির!
ও পিছন ফিরে দেখল। মেয়েটা বেরিয়ে যাচ্ছে অফিস থেকে। বাইরে আলতো একটা ধোঁয়াশা! স্ট্রিট লাইটের আলোর ভিতর ভেসে আছে দুধের সরের মতো ধূলিকণা। মেয়েটার ফরসা পিঠের পাশ দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে ব্রেসিয়ারের কালো স্ট্র্যাপ। যেন একটা দাগ! একটা রেখা! যার ওই দিকে দাঁড়িয়ে মেয়েটা এখনও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে মাহিরের দিকে। সেই মাহির! যে একদিন একশোতে বিরাশি পেয়েছিল ইংরেজিতে!
.
০৩. আইকা
এই শহরটাকে পিঁপড়ের বাসার মতো মনে হয় আইকার। এই দশতলার উপর থেকে রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয়, সার বেঁধে পিঁপড়েরা বেরিয়েছে খাবার খুঁজতে। কোনওদিকে যেন নজর নেই! আগ্রহ নেই! শুধু পেটের চুম্বক যেন তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক বিন্দু থেকে আর-এক বিন্দুতে।
